ক্যানলারের মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। বলল, তুমি যখন সবই জান তখন তুমি যাই ভাব, তোমাকে আমার চাই।
জেন ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
পরের দিন বিয়ে না করেই ট্রেনে চড়ে ইউসকনসিন স্টেশনে চলে গেল জেন। স্টেশনে ফিলান্ডার আর ক্লেটন একটা বড় গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিল তাদের জন্য।
পরের দিন সকালে ক্যানলার শহরে চলে গেল। সেদিন সকাল থেকে পূর্ব দিকের বনে ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু বাতাসটা উল্টো দিক হতে বইতে থাকায় ধোয়াটা আসছিল না। দুপুরের দিকে জেন। একাই একবার বের হলো। ক্লেটন তার সঙ্গে যেতে চাইলে সে তাকে সঙ্গে নিল না।
জেন বড় রাস্তাটা ফেলে রেখে পূর্ব দিকের জঙ্গলে কোথায় আগুন লেগেছে তা দেখার জন্য আনমনে এগিয়ে যেতে লাগল। তার মনে তখন ছিল এক চিন্তা। ক্যানলারের কবল থেকে পরিত্রাণ পাবার আর কোন উপায় নেই।
এমন সময় জেনের হঠাৎ নজর পড়ল তার চারদিকেই আগুন জ্বলছে। বড় আস্তাটায় যাবার কোন উপায় নেই। সে তখন বিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল। একটা দিকে কিছু গাছপালা ছিল। সেদিকটায় আগুন কিছুটা কম। কিন্তু সেদিক থেকেও ধোয়া আসছিল। হঠাৎ গাছের উপর থেকে দৈত্যাকার এক শ্বেতাঙ্গ যুবক লাফিয়ে পড়ে জেনকে গাছের উপর তুলে নিল। তারপর গাছে গাছে বাঁদরের মত লাফিয়ে তাকে এক নিরাপদ জায়গায় নিয়ে গেল। জেনের মনে পড়ল আফ্রিকার জঙ্গলের সেই বনবাসী লোকটি একদিন এইভাবেই তাকে এক বদর-গোরিলার কবল থেকে উদ্ধার করে।
লোকটি নিরাপদ জায়গায় গিয়ে জেনকে বলল, রাস্তায় আমার গাড়ি আছে।
জেন বলল, তুমি কে?
লোকটি বলল, আমি সেই বাঁদর-দলের টারজান।
জেন আশ্চর্য হয়ে বলল, তুমি এখানে কি করে এলে?
টারজান বলল, দার্ণৎকে আমি উদ্ধার করি। সে-ই আমাকে এখানে আসার পথ বলে দেয়। তোমরা আসার সময় আমাকে যে চিঠি লিখে রেখে এসেছিলে কেবিনে তার একটিতে তোমাদের বাড়ির ঠিকানা ছিল।
এখন এস, আমার গাড়িতে গিয়ে চাপবে। তোমার বাবা এখন হয়ত খামারের কাছে অপেক্ষা করছেন তোমার জন্য। আমি তোমাদের শহরের বাড়িতে ও পরে খামারবাড়িতে গিয়েছিলাম। কিন্তু ক্লেটন আমাকে চিনতে পারেনি।
গাড়িতে যেতে যেতে টারজান বলল, তুমি তোমার চিঠিতে লিখেছিলে তুমি অন্য একজনকে ভালবাস। তুমি হয়ত আমার কথাই বলেছিলে?
জেন বলল, হয়ত তাই।
টারজান বলল, কিন্তু বাল্টিমোরে আমি যখন তোমাদের খোঁজ করছিলাম তখন সেখানকার লোকেরা বলল, তোমার এখানে বিয়ে হবে।
হ্যাঁ।
তুমি তাকে ভালবাস?
না।
ওরা দু’জনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। রাস্তাটা সমতল না হলেও ডানদিকের আগুনটা বেড়ে যাওয়ায় গাড়ির গতিটা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছিল টারজান।
ক্রমে বিপদসীমাটা পার হয়ে গাড়ির গতিটা কমিয়ে দিল টারজান। বলল, আমি যদি ক্যানলারকে তোমার জন্য বলি?
জেন বলল, অপরিচিত ব্যক্তির কথা শুনবে না, বিশেষ করে যে ব্যক্তি আমাকে চায়।
কিছুক্ষণ আবার ওরা চুপ করে রইল। টারজান প্রথমে কথা বলল। বলল, তুমি আমাকে বিয়ে করবে?
সঙ্গে সঙ্গে কথাটার উত্তর দিতে পারল না জেন। সে ভাবতে লাগল, যে অদ্ভুত লোকটি তার পাশে বসে রয়েছে সে কে? কি তার পরিচয়? সে নিজেই বা তার নিজের সম্বন্ধে কতটুকু জানে? তার পিতামাতাই বা কে? কি তার পরিচয়?
টারজান এবার শান্তভাবে বলল, আমি বুঝতে পেরেছি। আর তোমাকে চাপ দেব না। আমি তোমার সুখটাকেই বড় করে দেখতে চাই। বুঝেছি একটা বাঁদরের সঙ্গে সুখী হতে পার না।
গাড়িটা ক্লেটনের কাছে এসে পৌঁছতে জেনকে দেখতে পেয়ে সকলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। অধ্যাপক পোর্টার জেনকে দেখতে পেয়েই জড়িয়ে ধরলেন। প্রথমে টারজানকে কেউ দেখতে পায়নি। পরে ক্লেটন তাকে গাড়ির ভিতর বসে থাকতে দেখে হাত বাড়িয়ে অভ্যর্থনা জানিয়ে বলল, কি বলে ধন্যবাদ দেব তোমায়? তুমি আমাদের সকলকে উদ্ধার করলে। তুমি খামারবাড়িতে গিয়ে আমার নাম ধরে ডেকেছিলে, কিন্তু আমি তোমাকে চিনতে পারিনি। তাছাড়া তোমাকে এ বেশে দেখে চেনাই যায় না।
টারজান হেসে বলল, ঠিক বলেছ মঁসিয়ে ক্লেটন।
ক্লেটন বলল, কিন্তু তুমি কে?
আমি বাঁদর-দলের সেই টারজান।
কথাটা শুনে চমকে উঠল ক্লেটন।
তাদের পুরনো জঙ্গলের বন্ধুকে এবার চিনতে পেরে অধ্যাপক পোর্টার ও ফিলান্ডারও এগিয়ে এসে ধন্যবাদ দিল টারজানকে।
তারা সকলে এবার খামারবাড়িতে গিয়ে উঠল। ক্লেটন তাদের সকলের আপ্যায়নের ব্যবস্থা করল। এমন সময় একটা মোটর গাড়ির আওয়াজ শুনে চমকে উঠল তারা।
এমন সময় ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকল ক্যানলার। বলল, আমি কি ভয়ই না করেছিলাম। আমি ত একবার আসতে আসতে আগুনে পথ না পেয়ে শহরে ফিরে গিয়েছিলাম। এখানে পৌঁছতে পারব ভাবতেই পারিনি।
কেউ তার কথাটা গ্রাহ্য করল না। টারজান একবার ক্যানলারের দিকে তাকাল, সিংহী যেমন তার শিকারের দিকে তাকায়।
জেন ক্যানলারকে বলল, ইনি হচ্ছেন আমাদের পুরনো বন্ধু মঁসিয়ে টারজান।
ক্যানলার তার হাতটা বাড়িয়ে দিল। কিন্তু টারজান শুধু ভদ্রতার খাতিরে মাথাটা নোয়াল। ক্যানলারের হাতটা ধরল না।
ক্যানলার আবার বলল, আমাদের বিয়েটা এখনি সেরে ফেলতে হবে জেন্ন, যাতে আমরা মধ্য রাতের ট্রেনটা ধরতে পারি।
টারজন এবার ব্যাপারটা বুঝতে পারল। সে শুধু একবার জেনের দিকে তাকাল।
