কিন্তু টারজান শুনল না সে কথা। সে জঙ্গলের মধ্যে চলে গেল। দশজন লোক সেখান থেকে ফিরে এসে কেবিনের বারান্দায় পায়চারি করতে লাগল।
এদিকে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকেই গাছের উপর চড়ে ডালে ডালে এগিয়ে চলল সিংহের সন্ধানে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই বাতাসে একটা সিংহের গন্ধ পেল টারজান। তারপর সিংহটা গাছের তলায় আসতেই সে ফাঁসটা ঝুলিয়ে দিতেই সেটা সিংহের গলায় আটকে গেল। এবার সে গাছের ডালে দড়িটা বেঁধে রেখে দিলে সিংহটা মুক্ত হবার জন্য যখন ছটফট করছিল তখন টারজান তার ঘাড়ের উপর লাফিয়ে পড়ল। তারপর ছুরিটা তার পিঠের উপর বারবার আমূল বসিয়ে দিতে লাগল। অবশেষে সিংহটা মরে গেলে তার মৃতদেহের উপর দাঁড়িয়ে বিজয়ী বাঁদর-গোরিলার মতো গর্জন করে উঠল টারজান।
এদিকে সেই দশজন লোক আবার হোটেল থেকে বনের সেই প্রান্তে এসে দাঁড়াল। তারা টারজনের সেই গর্জন শুনতে পেয়েছিল। তা শুনে দার্ণতের আশা হয়। এমন সময় হঠাৎ টারজান বনের মধ্যে থেকে মৃত সিংহটা নিয়ে ফিরে এলে তাদের বিস্ময় চরমে ওঠে। তারা এক বাক্যে তার শক্তি ও বীরত্বের প্রশংসা করতে থাকে।
কিন্তু টারজনের এতে প্রশংসা করার কিছুই নেই। কোন গরু মারার জন্য যেমন একটা কসাইকে বাহবা দেবার কিছু নেই তেমনি তার এই সিংহ শিকারের জন্যও তার প্রশংসা করার কিছু নেই, কারণ আগে সে এমন বহু সিংহ বধ করেছে।
যাই হোক, লোকটা তার কথামত দশ হাজার ফ্ৰা দিল। দার্ণৎ টারজানকে বলল, টাকাটা রেখে দাও।
কিন্তু টারজান জোর করে অর্ধেক টাকা দার্ণকে দিয়ে দিল।
পরদিন সকালেই দার্ণ একটা নৌকা ভাড়া করল। ওরা সমুদ্রের ধার ঘেঁষে নৌকায় করে রওনা হয়ে। পরদিন সকালেই সেই কেবিনের কাছে উপকূলভাগে পৌঁছল। টারজান একটা কোদাল নিয়ে একা সিন্দুকটা আনতে চলে গেল। পরদিন সে সিন্দুকটা একাই ঘাড়ে করে ফিরে এল। তাদের নিয়ে নৌকা আবার উত্তর দিকে যাত্রা শুরু করল সেই শহরের দিকে।
তখন থেকে তিন সপ্তার মধ্যেই একটা ফরাসী জাহাজে করে দার্ণৎ টারজানকে সঙ্গে করে প্যারিসের পথে যাত্রা করল।
প্যারিসে দার্ণতের অতিথি হিসাবে রয়ে গেল টারজান। এখান থেকে সে আমেরিকা যাবে। কিন্তু তার আগে একদিন দার্ণৎ তার আঙ্গুলের ছাপ পরীক্ষার অন্য এক পুলিশ অফিসারের কাছে নিয়ে গেল। এইভাবে সে টারজনের জন্মরহস্যের সমাধান করতে চায়। কিন্তু টারজানকে প্রথমে সেকথা বলল না। সে আগে নিজের আঙ্গুলগুলোর ছাপ দেবার পর টারজানকেও তার আঙ্গুলের ছাপ দিতে বলল।
পুলিশ অফিসার বলল, মানুষের আঙ্গুলের ছাপ বয়সের ব্যবধানে পাল্টায় না, শুধু আকারে বড় হয়। সুতরাং ছোট বয়সের কারো আঙ্গুলের ছাপ বড় বয়সের আঙ্গুলের ছাপের সঙ্গে মিলিয়ে দেখে তাকে চেনা যায়।
দার্ণৎ বলল, কোন আঙ্গুলের ছাপ দেখে নিগ্রো বা শ্বেতাঙ্গ লোকের ছাপ কিনা তা জানা যায়?
পুলিশ অফিসার বলল, তা ঠিক যায় না, তবে সাধারণত নিগ্রোদের হাতের ছাপে জালের মত অনেক জটিল চিহ্ন দেখা যায়।
ক্লেটনের ডায়েরীর যে পাতায় তার ছয় মাসের ছেলের আঙ্গুলের ছাপ ছিল সেটা অফিসারকে দেখাল দার্ণৎ।
অফিসার একটা কাঁচ দিয়ে ভাল করে দুটো ছাপ খুঁটিয়ে দেখে মিল দেখে আশ্চর্য হয়ে হাসল।
টারজান এবার সব ব্যাপারটা বুঝতে পারল। বুঝল দার্ণৎ তার জন্মরহস্য ভেদ করতে চায়।
পুলিশ অফিসার বলল, ঠিক আছে। তবু আমাদের বিশেষজ্ঞ দেসকার্ককে দেখিয়ে তার মতামত নেওয়া উচিত।
দার্ণৎ বলল, তিনি ত এখন নেই। কিন্তু মঁসিয়ে টারজান আগামীকালই আমেরিকা চলে যাচ্ছেন।
অফিসার বলল, তাহলে দেসকার্ক ফিরে এলে ব্যাপারটা জেনে ওঁকে টেলিগ্রাম করে সপ্তা দুইয়েকের মধ্যেই জানিয়ে দেবেন।
বাল্টিমোর শহরের শেষ প্রান্তে একটি পুরনো আমলের বাড়ির সামনে একদিন একটি ট্যাক্সি এসে থামল। চল্লিশ বছরের বলিষ্ঠ ও সুগঠিত চেহারার একটি লোক ট্যাক্সি থেকে বেরিয়ে এসে ড্রাইভারকে ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে তাকে বিদায় দিল।
বৃদ্ধ অধ্যাপক পোর্টার এগিয়ে গিয়ে বলল, ও মিস্টার ক্যানলার।
আগন্তুক লোকটি হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, শুভ সন্ধ্যা অধ্যাপক।
ক্যানলার বলল, ক্লেটন নামে এক যুবক মাসের পর মাস অপেক্ষা করে রয়েছে। জেন অবশ্য তাকে গ্রাহ্য করে না। কিন্তু সে নাকি তার বাবার তরফ থেকে মোটা রকমের সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত তার পক্ষে জেনকে লাভ করা খুব একটা অসম্ভব নয়।
অধ্যাপক বললেন, সে বলছিল এখনি কাউকে বিয়ে করতে সে রাজী নয়। উত্তর ইউসকনসিনে তার মা তাকে যে একটা খামারবাড়ি দিয়ে গেছে সেইখানে গিয়ে বাস করার কথা বলছে। পরের সপ্তার প্রথম দিকেই আমরা সেখানে যাব। ফিলান্ডার আর ক্লেটন সেখানে সব ব্যবস্থা করার জন্য চলে গেছে।
ক্যানলার কি বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু জেন সহসা এসে পড়ায় সে থেমে গেল।
জেন বলল, ও আপনি? মাফ করবেন। আমি ভেবেছিলাম, বাবা একা আছেন।
অধ্যাপক পোর্টার তখনি বেরিয়ে গেলেন। ক্যানলার জেনকে বলল, এভাবে আর কত দিন চলবে জেন?
জেন বলল, আপনি কি বুঝতে পারছেন না আপনি কিছু ডলারের বিনিময়ে আমাকে কিনছেন? আপনি যখন বাবাকে গুপ্তধন উদ্ধারের জন্য টাকা ধার দিয়েছিলেন শুধু হাতে তখন কোন উদ্দেশ্যেই। দিয়েছিলেন। কোন না কোন একটা লাভের আশাতেই দিয়েছিলেন।
