কথায় কথায় টারজান বলল, আমার মা হচ্ছে কালা নামে এক মেয়ে বাঁদার-গোরিলা।
দার্ণৎ বলল, তোমার বাবা কে?
টারজান বলল, আমার মা কালা বলত আমার বাবা একজন সাদা বদর যার গায়ে লোম নেই। অনেকটা আমারই মত।
দার্ণং বলল, তোমার মা কখনই বাঁদর হতে পারে না। আচ্ছা, কেবিনের মধ্যে কোন লেখা পাওনি যাতে তোমার জন্ম সম্বন্ধে কোন হদিস পাওয়া যেতে পারে?
টারজান তার তূণের তলা থেকে সেই ডায়েরীটা বার করে দার্ণতের হাতে দিল। বলল, এটা হয়ত তুমি পড়তে পারবে। ভাষাটা ইংরেজি নয় বলে পড়তে পারিনি।
দার্ণৎ জোরে পড়তে লাগল ডায়েরীটা আর মাঝে মাঝে টারজনের দিকে তাকাতে লাগল। একজায়গায় লেখা ছিল, আজ আমাদের ছোট্ট পুত্র সন্তানটি ছ’মাসে পড়ল। আমি যে টেবিলে লিখছি তার পাশে এ্যালিসের কোলে সে বসে আছে। হাসিখুশিতে ভরা সুন্দর স্বাস্থ্যবান ছেলে। আমি চাই সে বড়। হয়ে উঠুক, জগতের মধ্যে মাথা তুলে দাঁড়াক, হয়ে উঠুক দ্বিতীয় ক্লেটন, গ্রেস্টোক বংশের গৌরব বৃদ্ধি করুক। সে আবার আমার কলমটা হাত থেকে ধরে আমার ডায়েরীতে হিজিবিজি কাটছে, তার ছোট ছোট আঙ্গুলগুলোর ক’টা ছাপও ফেলেছে।
পড়া শেষ করে দার্ণৎ টারজানকে বলল, বুঝতে পারছ না তুমিই লর্ড গ্রেস্টোক?
টারজান মাথা নেড়ে বলল, না ওঁদের একটামাত্র সন্তানের কথা লিখেছেন কিন্তু কেবিনের মধ্যে ওঁদের কঙ্কালের সঙ্গে একটি শিশুর কঙ্কালও পাওয়া যায়। অধ্যাপক পোর্টাররা কেবিনে সেই কঙ্কালগুলোকে সমাহিত করেন। আমিও প্রথমে এই কেবিনটাকে আমার জন্মস্থান ভাবতাম। পরে বুঝেছি এটা ভুল।
দার্ণৎ তবু একথা মেনে নিতে পারল না। তার বিশ্বাস টারজানই জন ক্লেটনের ছেলে।
পথ চলতেচলতে ওরা বনের ধারে একটা গাঁয়ের প্রান্তে এসে দাঁড়াল। একজন নিগ্রো তাদের দেখে ছুটে গিয়ে গায়ের লোকদের খবর দিল। সবাই ছোটাছুটি করে বেড়াতে লাগল। এমন সময় একজন শ্বেতাঙ্গ একটা রাইফেল হাতে করে এগিয়ে এল। দার্ণৎ চীৎকার করে তাকে জানাল, তারা তাদের শত্রু নয়, মিত্র।
তখন সেই শ্বেতাঙ্গ বলল, তাহলে দাঁড়াও।
দার্ণৎ টারজানকে বলল, থাম টারজান। উনি ভাবছেন, আমরা শত্রু।
এবার তারা দু’জনে শ্বেতাঙ্গের দিকে এগিয়ে গেল। তারা কাছে এলে শ্বেতাঙ্গ ফরাসী ভাষায় বলল, কোন জাতীয় মানুষ তোমরা?
দার্ণৎ বলল, আমরা শ্বেতাঙ্গ। জঙ্গলে পথ হারিয়ে ফেলেছি।
শ্বেতাঙ্গ লোকটি তার রাইফেলটি নামিয়ে তার হাত বাড়িয়ে অভ্যর্থনা জানাল। তারপর বলল, আমি হচ্ছি ফরাসী মিশনের ফাদার কনস্তানতাইন।
দার্ণৎ বলল, ইনি মঁসিয়ে টারজান আর আমি পল দার্ণৎ, ফরাসী নৌবাহিনীতে কাজ করি।
টারজান তার হাতটা ফাদারের দিকে বাড়িয়ে দিল। এইভাবে জীবনে সর্বপ্রথম সভ্য জগতের সংস্পর্শে এল টারজান। ওরা এক সপ্তা সেই গায়েই ফাদার কনস্তানতাইনের কাছে রয়ে গেল।
সেখান থেকে আবার যাত্রা শুরু করে পরের মাসে ওরা একটা বড় নদীর মুখের কাছে একটা শহরে এসে হাজির হলো। শহরটাতে অনেক বড় বড় বাড়ি ছিল। নদীটার মুখে অনেক নৌকা বাঁধা ছিল। টারজান এখন দার্ণতের মত সাদা ধবধবে পোশাক পরে ভদ্র হয়ে উঠেছে। সে এখন কাঁটা চামচের সাহায্যে ভদ্রভাবে রান্না করা খাদ্য খেতে শিখেছে।
নদীর তীরবর্তী সেই শহরটাতে পৌঁছেই দার্ণৎ তাদের দেশের সরকারি কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দিল, সে নিরাপদে আছে এবং সেই সঙ্গে তিন মাসের ছুটি চাইল। ছুটি সঙ্গে সঙ্গে মঞ্জুরও হলো। এরপর সে তার দেশের ব্যাঙ্কে কিছু টাকা চেয়ে পাঠাল। কারণ সিন্দুকটা আনার জন্য নৌকা ভাড়া করতে হবে।
এদিকে শহরের যে অঞ্চলের একটা হোটেলে টারজানরা ছিল সে অঞ্চলের শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণকায় নিগ্রো অধিবাসীদের সঙ্গে তাদের পরিচয় হয়ে গেল। ক্রমে তারা টারজনের শৌর্যবীর্যের পরিচয়ও পেল। একদিন একটি হোটেলে টারজানরা যখন বসেছিল তখন এক নিগ্রো মাতাল হঠাৎ পাগলের মত একটা ছুরি নিয়ে চারজন লোককে তাড়া করে। তারা তখন ছুটে পালিয়ে গেলে সে টারজানকে ছুরি মারতে যায়। কিন্তু টারজান শুধু একটা হাত বাড়িয়ে তার ছুরিধরা হাতটা ধরে সেটা এমনভাবে মুচড়ে দেয় যে তার হাড় ভেঙ্গে যায়। মাতালটা যন্ত্রণায় আর্তনাদ করতে করতে তার গায়ে পালিয়ে যায়।
আর একদিন রাত্রিতে সেই হোটেলে সিংহ নিয়ে কয়েকজনের সঙ্গে তর্ক হচ্ছিল। একজন বলল, সিংহ পশুরাজ হলেও আসলে ভীরু, গুলির আওয়াজে পালিয়ে যায়।
টারজান বলল, সব মানুষ যেমন সাহসের দিক থেকে সমান নয় তেমনি সিংহদের মধ্যেও স্বভাবের তারতম্য আছে। একটা সিংহ হয়তো পালিয়ে যেতে পারে তোমার ভয়ে আবার অন্য সিংহের দ্বারা তুমি প্রাণ হারাতে পার।
তখন একজন বলল, যদি তুমি নগ্নদেহে একটা মাত্র ছুরি নিয়ে একটা সিংহ শিকার করতে পার তাহলে আমি তোমাকে পাঁচ হাজার ফ্ৰা দেব।
টারজান বলল, ঠিক আছে, একটা দড়ি চাই।
দার্ণৎ বলল, দশ হাজার ফ্রা চাই।
লোকটি বলল, তাই দেব।
টারজান সেই মুহূর্তে তার ঘর থেকে একটা দড়ি আর ছুরি নিয়ে এল। শহরের শেষ প্রান্তে বনের ধারে গিয়ে টারজান তার পোশাক খুলে রেখে যাবার জন্য প্রস্তুত হলো। তখন সেই লোকটি বলল, তোমাকে যেতে হবে না, আমি তোমাকে দশ হাজার ফ্রা দেব। শুধু শুধু প্রাণ দিয়ে লাভ নেই।
