প্রধান সন্ন্যাসী আবছা চোখে চারদিকে তাকাল।
গাটো মুঙ্গু বিনীত গলায় বলল, বন্দীকে তাহলে ভাল করে বেঁধে মন্দিরের পিছনেই রেখে আসি?
ইমিগেগ বলল, তাই যাও। এমন করে বেঁধে যেন পালাতে না পারে।
মাটিতে শুয়েই শ্বেতকায় দানব চোখ মেলে তাকাল। দেখল, ওরান্ডো ও তার সৈনিকরা দাঁড়িয়ে আছে। কি যেন মনে পড়ায় হঠাৎ লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল।
বানরদের ভাষায় বলল, নকিমা! নকিমা! কোথায় তুমি নকিমা? টারজান এখানে।
ছোট বানরটি এক লাফে গাছ থেকে নেমে ছুটে এসে সাদা মানুষটির কাঁধে চড়ে বসল; তার গলা জড়িয়ে ধরে মনিবের গালে গাল রেখে আনন্দে কিচির-মিচির করতে লাগল।
ওরান্ডো সঙ্গীদের বলল, দেখছ তো মুজিমো মরে নি।
সাদা মানুষটি ওরান্ডের দিকে ফিরে বলল, আমি মুজিমো নই; আমি অরণ্যরাজ টারজান। বানরটিকে ছুঁয়ে বলল, এও নিয়ামওয়েগির আত্মা নয়; এ হল নকিমা। এখন আমার সব কথা মনে পড়ছে। অনেকদিন থেকে মনে করার চেষ্টা করছি, কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারি নি-যেমনি একটা গাছের নিচে চাপা পড়েছিলাম সেদিন থেকেই সব কিছু ভুলে ছিলাম।
সারাদিন বসে বসে অনেক কথাই টারজনের মনে পড়তে লাগলঃ কেন সে এ দেশে এসেছিল, কেমন করে একটা দুর্ঘটনার ফলে বাঞ্ছিত পথ ধরে সেই দেশেই সে এসে পড়েছে, আর যে দেশের মন্দিরের সন্ধানে সে একদা পথে নেমেছিল তার সন্ধানও সে পেয়ে গেছে। এ জন্যই সেই দুর্ঘটনার কাছে সে চিরকৃতজ্ঞ।
সন্ধ্যার পরে রাতের খাবার খেতে বসে হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল চিতা-দেবতার মন্দিরে দেখা সাদা মানুষ ও সাদা মেয়েটির কথা। ওরান্ডোকে তাদের কথা জিজ্ঞাসা করলে সেও কিছুই বলতে পারল না।
টারজান অনেকক্ষণ ধরে কি যেন ভাবল। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে নকিমাকে ডাকল।
কোথায় চললে? ওরান্ডো শুধাল।
চিতা-দেবতার মন্দিরে, টারজান জবাব দিল।
হাত-পা বাঁধা অবস্থায় বুড়ো টাইমার সারাদিন সেখানে পড়ে রইল। না খাবার, না পানীয়। মাঝে মাঝে মন্দির-কক্ষ থেকে ভেসে আসছে মন্ত্রের শব্দ, প্রধান সন্ন্যাসীর কর্কশ কণ্ঠস্বর আর চিতাবাঘের গর্জন।
মশাল হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকল এক সন্ন্যাসী। শয়তানের মত দেখতে এক বুড়ো; মুখে রং মাখানোর ফলে আরও বীভৎস দেখাচ্ছে। লোকটি টুম্বাই গ্রামের ওঝা সোবিটো। উপুর হয়ে সে বুড়ো টাইমারের পায়ের বাঁধন খুলতে লাগল।
আমাকে নিয়ে তোমরা কি করবে? বুড়ো টাইমার প্রশ্ন করল।
ঠোঁট চাটতে চাটতে সোবিটো বলল, প্রথমে তোমার হাত পা ভেঙ্গে দেয়া হবে; তারপর জলাভূমির উপর থেকে তোমাকে এমনভাবে হেঁট মুণ্ডে ঝুলিয়ে রাখা হবে যাতে তোমার নাক-মুখ জলের নিচে গিয়ে দমবন্ধ হয়ে তোমার মৃত্যু না ঘটে। এইভাবে তোমাকে তিন দিন রাখা হবে, আর তাতেই তোমার মাংস হবে নরম, সুস্বাদু।
বুড়ো টাইমার শিউরে উঠল। তিন তিন! হা ভগবান, এও কপালে ছিল!
বুড়ো টাইমারকে একটা লাথি মেরে বলল, আমার সঙ্গে এস।
অন্ধকার বারান্দা পার হয়ে তারা সেই বড় ঘরটায় হাজির হল। বন্দীকে দেখামাত্রই দেড়শ’ কণ্ঠ একযোগে চীৎকার করে উঠল, চিতাবাঘ গর্জে উঠল, প্রধান সন্ন্যাসী উপরের বেদীতে নাচতে লাগল, বীভৎস-দর্শন সন্ন্যাসিনীরা তার স্বরে চেঁচাতে চেঁচাতে এমনভাবে লাফিয়ে এল বুঝি সাদা মানুষটাকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলবে।
সোবিটো এক ধাক্কায় বন্দীকে নিচু বেদীর উপর ফেলে দিয়ে টানতে টানতে প্রধান সন্ন্যাসীর সামনে নিয়ে এসে বলল, বলি এনেছি!
চিতা-দেবতাকে উদ্দেশ্য করে ইমিগেগ বলল, বলি এসে গেছে! চিতা-সন্তানদের হে পরম পিতা, এবার বল তোমার কি আদেশ?
ইমিগেগের হাতের ধারালো লাঠির খোঁচা খেয়ে পশুটার দাঁত বের করা মুখ থেকেই বেরিয়ে এল আদেশ। ওর হাত-পা ভেঙে দেয়া হোক, আর তৃতীয় রাতে একটা ভোজের আয়োজন করা হোক!
আর বোবোলো ও সাদা সন্ন্যাসিনীর কি হবে? ইমিগেগ প্রশ্ন করল।
তাদের মন্দিরে নিয়ে আসতে সৈনিক পাঠাও। আরেকটা ভোজের জন্য তার হাত-পা ভেঙ্গে দাও। আর সাদা মেয়েটিকে পাবে প্রধান সন্ন্যাসী ইমিগেগ। তারপর সেও ভোজে লাগবে।
ইমিগেগ চেঁচিয়ে বলল, চিতা-দেবতার বাণী শোনা হল। তার হুকুম মতই কাজ হবে।
সঙ্গে সঙ্গে আটজন সন্ন্যাসী লাফিয়ে পড়ে বন্দীকে চেপে ধরল, তাকে বেদীর উপর ছুঁড়ে ফেলল, হাত-পা ছড়িয়ে তাকে চিৎ করে ধরে রাখল, আর চারজন সন্ন্যাসিনী ছুটে এল ভারী মুগুর হাতে নিয়ে।
মেঝেতে চিৎ করে ধরে রাখা বুড়ো টাইমারকে লক্ষ্য করে সন্ন্যাসিনীদের হাতের মুগুরগুলো একসঙ্গে উদ্যত হওয়া মাত্রই একটি ক্রদ্ধ কণ্ঠস্বর ঘরের মৃত্যুস্তব্ধতাকে ভেঙ্গে খান খান করে দিল।
সঙ্গে সঙ্গে প্রায়-নগ্নদেহ সেই দৈত্যাকার সাদা মানুষটি বানরের মত স্বচ্ছন্দ গতিতে মন্দিরের একটা। থাম বেয়ে নিচে নেমে এল। এক লাফে নিচু বেদীটার উপর গিয়ে দাঁড়াল। ভয়ে ও বিস্ময়ে লোকগুলো যেন হতভম্ব হয়ে পড়ল। সোবিটোর মুখেও কথা নেই। পা কাঁপছে। সে ঘোর কাটিয়ে আর্তনাদ করতে করতে বেদীর উপর থেকে সে ছুটে নিচে গেল সৈনিকদের পাশে।
বুড়ো টাইমারও অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। বিচিত্র মানুষটি সোবিটোকে ধরবার চেষ্টা না করে তার কাছেই এগিয়ে এল। বলল, আমাকে অনুসরণ কর। মন্দিরের পিছন দিক দিয়ে আমি বেরিয়া যাব। পিছনের দরজা দিয়ে দু’জনই অদৃশ্য হয়ে গেল।
