তবু পরের দিন সকালে তার দলের সকলে কেবিন থেকে বেরিয়ে নৌকায় গিয়ে উঠলেও বিভিন্ন তুচ্ছ অজুহাতে কেবিন থেকে বের হতে দেরি করল সে। তারই অনুরোধে কেবিনে ব্যবহারযোগ্য কিছু জিনিসপত্র রেখে যাওয়া হয় দার্ণৎ আর কেবিন মালিক টারজুনের জন্য। যাবার সময় ঈশ্বরের কাছে তার সেই বনদেবতার জন্য প্রার্থনা করে জেন।
কেবিনের দরজাটা ফাঁক করে একটা লোক ঢুকতে গেলেই তাকে লক্ষ্য করে রাইফেল থেকে একটা গুলি করল দার্ণৎ। সঙ্গে সঙ্গে হুমড়ি খেয়ে ঘরের মেঝের মধ্যে পড়ে গেল লোকটা। দৰ্ণাৎ আবার একটা গুলি করতে যাচ্ছিল। কিন্তু প্রথম সন্ধ্যার পাতলা অন্ধকারে দার্ণৎ দেখল লোকটা শ্বেতাঙ্গ। পরমুহূর্তেই জানল সে তার পরম বন্ধু এবং রক্ষাকর্তা টারজানকে গুলি করেছে।
সঙ্গে সঙ্গে একটা বেদনার্ত চীৎকার করে নতজানু হয়ে বসে টারজনের মাথাটা কোলের উপর তুলে নিল দার্ণৎ। তার বুকে কান পেতে দেখল হৃদস্পন্দন ঠিক আছে। একটা আলো জ্বেলে দেখল টারজনের মাথার একটা দিকের মাংস ছিঁড়ে দিয়েছে গুলিটা। মাথার খুলির হাড় ভাঙ্গেনি। সে তখন জল দিয়ে টারজনের ক্ষতটা ধুয়ে দিল। আঘাতটা গুরুতর হয়নি। ঠাণ্ডা জলের স্পর্শে চোখ মেলে তাকাল টারজান। চোখ খুলেই দার্ণৎকে দেখতে পেল। একটা কাপড় ছিঁড়ে তাই দিয়ে মাথাটাকে বেঁধে দিল দার্ণৎ। তারপর কাগজ কলম নিয়ে টারজানকে লিখে জানাল সে না জেনে টারজানকে গুলি করে চরম ভুল করেছে এবং আঘাতটা মারাত্মক হয়নি দেখে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানাচ্ছে।
লেখাটা পড়ে টারজান হেসে ফরাসী ভাষায় বলল, এটা এমন কিছু না।
দার্ণৎ এবার ক্লেটন আর জেনের লেখা চিঠি দুটি তার হাতে দিল। ক্লেটনের চিঠিটা পড়ার পর মুখে একটা বিষাদ ফুটে উঠল তার। দার্ণ খামটা খুলে দিলে টারজান পড়তে লাগল।
জেন লিখেছে, ক্লেটনের সঙ্গে আমিও এই কেবিনটা আমাদের ব্যবহার করতে দেওয়ার জন্য অশেষ ধন্যবাদ জানাচ্ছি তোমায়। তবে জেনে রেখো আমি তোমার চিরদিনের বন্ধু।
চিঠিটা পড়ে বিষণ্ণভাবে মাটির দিকে তাকিয়ে প্রায় এক ঘণ্টা বসে রইল টারজান। ভাবল সবচেয়ে দুঃখের কথা, আমি আর বাঁদরদলের টারজান একই ব্যক্তি তা জেন জানে না।
আর কথা না বলে জেনের ঘাসের বিছানাটাতেই শুয়ে পড়ল টারজান। দার্ণ আলোটা নিভিয়ে দিয়ে খাটের উপর শুয়ে পড়ল।
সেই থেকে কেবিনেই দু’জনে রয়ে গেল। দার্ণ এক সপ্তাহ ধরে টারজানকে ফরাসী ভাষা শেখাল। তারপর টারজান ফরাসী ভাষায় তার সঙ্গে ভালভাবেই কথাবার্তা বলতে লাগল। একদিন রাত্রিবেলায় বিছানায় শুয়ে টারজান হঠাৎ জিজ্ঞাসা করল, আমেরিকা কোথায়?
দার্ণৎ বলল, এখান থেকে উত্তর-পশ্চিম দিকে সমুদ্রের ওপারে হাজার হাজার মাইল দূরে।
টারজান তৎক্ষণাৎ আলমারি থেকে একটা মানচিত্র এনে দার্ণকে বলল, আমাকে কোথায় কি আছে বুঝিয়ে দাও। আমি এসব কিছু বুঝি না।
দার্ণৎ তাকে দেখিয়ে দিল তারা আজে আফ্রিকা মহাদেশের মধ্যে আর জেনের দেশ আমেরিকা সেখান থেকে কত দূরে। টারজান কিন্তু বুঝতে পারছিল না মানচিত্রে যেটা এত কাছে আসলে সেটা এত দূরে কেন। দার্ণৎ অনেক কষ্টে বুঝিয়ে দিল তাকে মানচিত্রে কোন জায়গার দূরতু কিভাবে মাপতে হয়।
টারজান এবার জিজ্ঞাসা করল, আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গ বস্তি আছে?
দার্ণৎ উত্তর দিকে দেখিয়ে বলল, হ্যাঁ আছে।
টারজান আবার জিজ্ঞাসা করল, সমুদ্র পার হবার মত কোন নৌকা বা জাহাজ তাদের আছে?
দার্ণৎ বলল, হ্যাঁ আছে।
টারজান বলল, তাহলে কালই আমরা সেখানে যাব।
দার্ণৎ হেসে বলল, সেখানে আমরা পায়ে হেঁটে যেতে গেলে সেখানে পৌঁছবার আগেই আমরা মরে যাব।
টারজান বলল, তাহলে তুমি এখানেই চিরকাল থাকবে?
দার্ণৎ বলল, না।
টারজান বলল, তাহলে কাল আমরা দুজনেই রওনা হব। এখানে থাকলে আমি মরে যাব।
দার্ণৎ বলল, আমারও এখানে থাকতে আর ভাল লাগছে না। আমিও মরে যাব এখানে বেশি দিন থাকলে।
দার্ণং বলল, যাবার টাকা পাবে কোথায়?
টাকা কি টারজান জানে না। দার্ণৎ অনেক করে বোঝাল টাকা কিভাবে রোজগার করতে হয়।
টারজান বলল, আমিও টাকার জন্য খাটব। খেটে রোজগার করব।
দার্ণৎ বলল, ওখানে আমাদের দুজনের যাবার জন্য যা টাকা লাগবে সে টাকা আমার আছে।
পরদিন সকালেই দু’জনে রওনা হলো। দু’জনে একটা করে বিছানা, একটা করে রাইফেল, বেশ কিছু গুলি, কিছু খাবার আর রান্নার বাসনপত্র সঙ্গে নিল। টারজান বাসনপত্রগুলো ফেলে দিল।
ওরা সমুদ্রের উপকূল বরাবর এগিয়ে যেতে লাগল উত্তর দিকে। পথে কোন বাধা পেল না। যেতে যেতে সভ্য জগৎ সম্বন্ধে দার্ণতের কাছ থেকে অনেক কিছু জেনে নিল টারজান। দার্ণৎ তাকে কাঁটা চামচ দিয়ে কিভাবে খেতে হয় তা দেখিয়ে দিল। বলল, সভ্য জগতে দ্রভাবে খেতে হবে।
কথায় কথায় টারজান লোহার সিন্দুকটার কথা বলল। বলল সে সেটা তুলে নিয়ে বনের সেই ফাঁকা জায়গাটায় পুঁতে রেখে দিয়েছে।
দার্ণৎ বলল, সেখান থেকে আমরা তিন সপ্তার পথ হেঁটে এসেছি। সেখানে গিয়ে ফিরে আসতে এক মাসের উপর লেগে যাবে। তাছাড়া যে সিন্দুকটা চারজন নাবিক বইত তা আমরা কি করে নিয়ে পথ চলব? তার চেয়ে কোন জনপদে গিয়ে আমরা একটা নৌকা ভাড়া করে সেখানে গিয়ে সহজেই সেটা নিয়ে আসব।
টারজান বলল, ঠিক আছে, খুব ভাল কথা। আমি সিন্দুকটা একা গিয়ে নিয়ে আসতে পারতাম একপক্ষ-কালের মধ্যেই। কিন্তু তোমাকে একা রেখে যেতে পারছি না।
