দার্ণৎ দেখল লোকটি ইংরেজি জানে। সে মুখে বলল হ্যাঁ, আমি ইংরেজি বলতে ও লিখতে পারি। এবার আমরা তাহলে কথা বলে আলাপ করতে পারি। প্রথমে তুমি আমার জন্য যা করেছ তার জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি তোমায়।
দার্ণৎ ছালটার উপর পেন্সিল দিয়ে লিখল, আমার নাম দার্ণ। আমি ফরাসী সেনাবাহিনীর একজন লেফটন্যান্ট। তুমি আমাকে বাঁচিয়েছ। তুমি আমার জন্য যা যা করেছ তার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ। আমার যা কিছু আছে তা তোমার। তবে কেন তুমি ইংরেজিতে কথা বলতে পার না তা জানতে পারি কি?
টারজান তার উত্তরে লিখল, আমি যে কাৰ্চাকের বাঁদরদলের মধ্যে ছিলাম তাদের ভাষা আর কিছু বন্য জীবজন্তুর ভাষা ছাড়া আর কোন ভাষা বুঝতে পারি না। আমি কোন মানুষের সঙ্গে কখনো কথা বলিনি। একমাত্র আমেরিকান মেয়ে জেন পোর্টারের সঙ্গে ইশারায় কিছু কথা বলেছিলাম। জেনকে একটা বাঁদর গোরিলা ধরে নিয়ে পালিয়ে যায়।
দার্ণৎ আবার লিখে জানতে চাইল, জেন পোর্টার কোথায়? অন্ধকারের মধ্যে যেন একটা আলো খুঁজে পেল দার্ণ।
টারজান লিখল, এখন সে কেবিনে তার সঙ্গীদের কাছে আছে।
দার্ণৎ আবার জানতে চাইল, সে তাহলে মরেনি? কোথায় সে ছিল? কি কি ঘটেছিল?
টারজান জানাল, সে মরেনি। টারজ নামে একটা বাঁদর-গোরিলা তাকে তার বউ করার জন্য ধরে নিয়ে যাচ্ছিল। তারপর টারজান টারককে হত্যা করে তাকে উদ্ধার করে। এই বনের কেউ টারজনের সঙ্গে লড়াই করে পেরে ওঠে না। আমিই হচ্ছি সেই বিরাট যোদ্ধা ও শিকারী বাঁদরদলের টারজান।
দু’দিন পর দার্ণৎ একটু সুস্থ হলো। সে সেই ফাঁকা জায়গাটায় একটু হাঁটতে লাগল। সে যাতে পড়ে যায় তার জন্য টারজান তাকে ধরে রইল। এবার কিছু কথাবার্তা বলার জন্য টারজান তাকে পেন্সিল আর গাছের ছাল দিল। দার্ণৎ লিখল, তুমি আমার জন্য অনেক কিছু করেছ, আমি কিভাবে তোমার ঋণ শোধ করতে পারি।
টারজান লিখল, তুমি আমাকে সেই ভাষা শিখিয়ে দাও যার মাধ্যমে আমি মানুষের সঙ্গে কথা বলতে পারি।
সেই দিন থেকেই টারজানকে ফরাসী ভাষায় কথা বলতে শেখাতে শুরু করে দিল দার্ণ। কারণ সে। ভাবল এটা তার নিজের মাতৃভাষা এবং এই ভাষাটা শেখানো সহজ হবে তার পক্ষে।
প্রথমে শব্দ ও তারপর দুদিনের মধ্যে ছোট ছোট বাক্য উচ্চারণ করতে শিখল টারজান। এইভাবে তিন দিন শেখার পর টারজান দার্ণকে লিখে জানতে চাইল সে এখন বেশ সুস্থ বোধ করছে কি না এবং সে তাকে কেবিনের কাছে বয়ে নিয়ে গেলে তার কোন কষ্ট হবে কি না। দার্ণতেরও যাবার খুব ইচ্ছা হচ্ছিল। তবু সে লিখল, কিন্তু এই এতখানি পথ বনের মধ্য দিয়ে কিভাবে আমাকে বয়ে নিয়ে যাবে?
টারজান হাসল।
দার্ণৎকে কাঁধে করে রওনা হয়ে পড়ল টারজান।
ভর দুপুরে তারা কেবিনের সামনে সেই ফাঁকা জায়গাটার কাছে এসে পৌঁছল। গাছ থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গে টারজনের অন্তরটা লাফিয়ে উঠল। জেনকে দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠল সে।
কিন্তু তারা দেখল কেবিনে কোন লোক নেই। দার্ণৎ দেখল দুটো জাহাজের কোনটাই নেই। এক নির্জন নীরবতা নিঃসীম শূন্যতায় খাঁ খাঁ করছে সমস্ত উপকূলভাগ জুড়ে।
কেউ কোন কথা বলল না। টারজানই প্রথমে কেবিনের দরজা খুলল। ভিতরে কেই নেই দু’জনেই দুজনের পানে তাকাল। দার্ণৎ ভাবল তার দলের লোকেরা ভেবেছে সে মারা গেছে।
টারজান যখন কেবিনের মধ্যে দাঁড়িয়ে তখন দার্ণ ঘরে ঢুকল। দেখল অনেক কিছু নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র তার জন্য রেখে গেছে তারা। বেশ কিছু খাবার, রান্নার বাসনপত্র, একটা খাট, দুটো চেয়ার, একটা রাইফেল, অনেকগুলো আর পত্রপত্রিকা।
টেবিলের দিকে এগিয়ে দার্ণৎ তার উপর দুটো চিঠি দেখতে পেল। দুটো চিঠিই বদরদলের টারজানকে লেখা। একটা চিঠি পুরুষের লেখা এবং সেটার মুখ খোলা, আর একটা চিঠি মেয়ে মানুষের হাতে লেখা এবং সেটির মুখ আঁটা। দার্ণৎ দরজার দিকে এগিয়ে টারজানকে বলল, তোমার দুটো চিঠি আছে। কিন্তু দেখল টারজান নেই, কোথায় চলে গেছে।
দার্ণৎ বাইরে বেরিয়ে গিয়ে দেখল টারজান কোথাও নেই। সে তাহলে তাকে এখানে একা ফেলে রেখে বনে চলে গেল। কেবিনটা শূন্য দেখার সঙ্গে সঙ্গে টারজনের মুখে আহত হরিণীর মত এক সকরুণ ভাব ফুটে উঠতে দেখে দার্ণৎ।
তাহলে ওরা আর কোনদিন ফিরে আসবে না। চিঠিখানা পড়েই হতাশ হয়ে খাটটার উপর বসে পড়ল দার্ণৎ। এক ঘণ্টা পরে দরজায় কিসের শব্দ শুনে চমকে উঠল সে। কে যেন দরজা দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করছে। তখন সন্ধ্যে হয়ে গেছে। কেবিনের ভিতরটা অন্ধকার। দাৎ দেখল খিলটা খুলে গেল এবং দরজাটার মধ্যে একটু ফাঁক হলো। মনে হলো একটা মানুষ যেন দাঁড়িয়ে রয়েছে বাইরে। রাইফেলটা হাতে নিয়ে ঘোড়াটা টিপে দিল দার্ণৎ।
সেদিন দার্ণৎকে না পেয়ে শার্পেন্তিয়ের ও ক্লেটন ফিরে এলে ফরাসী যুদ্ধ জাহাজের ক্যাপ্টেন দাফ্রেন জাহাজ ছেড়ে দেওয়ার মনস্থ করল। ঐ জাহাজে ক্লেটনরাও যাবে। কিন্তু একমাত্র জেন ছাড়া আর সকলেই রাজী হল কথাটায়। এখানে শুধু শুধু বসে থাকার কোন যুক্তি খুঁজে পেল না কেউ।
এরপর দু’দিন গত হতেই ক্যাপ্টেন দানে ঘোষণা করল, পরের দিন সকালেই জাহাজ ছাড়বে। আর অপেক্ষা করে লাভ নেই।
এবার আর কোন আপত্তি করল না জেন। কিন্তু সে একটা চিঠি লিখে খামটা এঁটে রেখে গেল টারজনের জন্য।
