জেন আবার জোর দিয়ে বলল, একথা আমি বিশ্বাস করি না। দেখো, নিশ্চয় সে ফিরে এসে প্রমাণ করে দেবে তোমার ধারণা ভুল। আমি বলছি সে একজন ভদ্রলোক।
পরদিন সকালে দুশো ফরাসী সৈন্যের এক সশস্ত্র দল আবার দার্ণতের খোঁজে রওনা হলো। ওরা সরাসরি মবঙ্গাদের গায়ে গিয়ে গাটাকে আক্রমণ করবে। দার্ণৎকে নিগ্রোরা সেই গায়েই নিয়ে যায়। লেক্টন্যান্ট শার্পেন্তিয়ের গেল দলের নেতা হিসেবে। ‘
দুপুর হতেই তারা সেই জায়গাটায় গিয়ে পৌঁছল যেখানে নিগ্রোদের সঙ্গে তাদের লড়াই হয়। পথটা তাদের চেনা বলে পৌঁছতে কষ্ট হলো না। সেখান থেকে সোজা গায়ের কাছে মাঠের ধারে জঙ্গলের শেষ প্রান্তে গিয়ে থামল। শার্পেন্তিয়ের একদল সৈন্যকে বনের পাশ দিয়ে কাঁটার পিছন দিকে পাঠিয়ে দিল। তারা প্রথম গুলি করে আক্রমণ শুরু করলেই ওরাও আক্রমণ শুরু করবে।
প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে শার্পেন্তিয়ের তার সেনাদল নিয়ে ঘন জঙ্গলে গা-ঢাকা দিয়ে রইল। মাঠে তখন কিছু লোক কাজ করছিল। গাঁয়ের পথে অনেক লোক ঘোরাঘুরি করছিল। অবশেষে গুলির শব্দ শুনেই শার্পেন্তিয়ের তার দল নিয়ে গুলি করতে করতে গেটের কাছে এগিয়ে যেতে লাগল। মাঠ থেকে লোকেরা ছুটে গাঁয়ের ভিতর পালিয়ে গেল। গাঁয়ের লোকেরা অস্ত্র হাতে বেরিয়ে গায়ের পথে পথে লড়াই করতে লাগল।
অতর্কিতে আক্রমণের জন্য গ্রামবাসীরা প্রস্তুত না থাকায় খুব একটা বাধা দিতে পারল না ফরাসী সৈন্যদের। বেশ কিছু ফরাসী সেনা আহত ও নিহত হলেও অনেক নিগ্রো যোদ্ধা গুলি খেয়ে মারা গেল। অনেক বন্দী হলো। কিছুক্ষণের মধ্যে গোটা গাঁটা ওরা দখল করে ফেলল। নারী ও শিশুদের তারা অব্যাহতি দিল। অবশ্য কোন নারী তাদের আক্রমণ করলে আত্মরক্ষার খাতিরে মারতে হচ্ছিল।
এবার দার্ণৎ সম্বন্ধে বন্দীদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে দিল শার্পেন্তিয়ের। কয়েকজন গ্রামবাসীর পরনে দার্ণতের পোশাকের কিছু কিছু অংশ দেখে তার সন্দেহ গাঢ় হলো। ওরা হয়তো দার্ণৎকে হত্যা করে তার মাংস খেয়েছে। কিন্তু ওদের কথা নিগ্রো গ্রামবাসীদের কেউ বুঝতে পারল না। তারা শুধু ভয়ে অদ্ভুত রকমের অঙ্গভঙ্গি করে কি সব বোঝাতে চাইল।
অবশেষে দার্ণতের কোন খোঁজ না পেয়ে হতাশ হয়ে রাত্রির মত গায়ের মধ্যেই শিবির স্থাপন করল শার্পেন্তিয়ের। রাতটা শিবিরে কাটিয়ে প্রত্যাবর্তনের সময় ওরা গাঁটা পুড়িয়ে দেবার মনস্থ করল। কিন্তু বন্দী গ্রামবাসীরা কান্নাকাটি করতে থাকায় তা করল না। তাহলে ওদের মাথা গোঁজার মত কোন ঠাই থাকবে না।
ক্লেটন আর শার্পেন্তিয়ের সেনাদলের আগে আগে যেতে লাগল। সবশেষে আহতদের নিয়ে ঠেলাগাড়িগুলো আসছিল। শার্পেন্তিয়ের দুঃখে সান্ত্বনা দেবার মত কোন ভাষা খুঁজে পাচ্ছিল না ক্লেটন। শার্পেন্তিয়ের খুবই দুঃখ পেয়েছে, কারণ দার্ণৎ ছিল তার ছেলেবেলাকার বন্ধু এবং সহকর্মী। শার্পেন্তিয়েরের দুঃখটা আরো বেশি করে বোধ করছিল এই কারণে যে দার্ণৎ বৃথাই বর্বর আদিবাসীদের হাতে প্রাণ দিল এবং সে প্রাণ দেবার আগেই জেন উদ্ধার পেয়ে ফিরে আসে।
আহত ও মৃতদের নৌকায় করে জাহাজে নিয়ে যাওয়া হলো। ক্লেটন কয়েকদিন ধরে জঙ্গলে ঘুরে বেড়িয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। সে কেবিনে গিয়ে শুয়ে পড়ল। কেবিনে ঢুকতে যাবার সময় জেনের সঙ্গে তার দেখা হয়ে গেল। জেন দুঃখের সঙ্গে বলল, আহা বেচারা লেফটন্যান্টের কোন খোঁজই পেলে না।
ক্লেটনও দুঃখের সঙ্গে জানাল, আমাদের যেতে দেরী হয়ে গেছে মিস পোর্টার।
জেন আবার জিজ্ঞাসা করল, ওরা তাকে খুব পীড়ন করেছিল?
ক্লেটন উত্তর করল, তাকে হত্যা করার আগে কি করেছিল তা আমরা জানতে পারিনি।
জেন বলল, তাকে হত্যা করার আগে এই কথাটা কেন বললে?
ক্লেটন বলল, হ্যাঁ মিস পোর্টার, ওরা নরখাদক।
এমন সময় টারজনের প্রতি তার ঈর্ষাটা নতুন করে জেগে উঠল, বলল, তোমার বনদেবতা তোমার কাছ থেকে গিয়ে নিশ্চয় ওদের ভোজসভায় যোগদান করে।
দার্ণৎ জ্ঞান ফিরে পেয়ে দেখল সে বনের মধ্যে একটা পুরু ঘাসের বিছানার উপর শুয়ে রয়েছে। তার চারদিকে দুর্ভেদ্য জঙ্গলের প্রাচীর।
পূর্ণ চেতনা ফিরে পাবার পর দার্ণৎ অসংখ্য আঘাতে আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত দেহটায় সর্বত্র ব্যথা অনুভব করতে লাগল। সে বুঝল পায়ের উপর ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াবার বা হাঁটা চলার ক্ষমতা তার নেই। বুঝতে পারছিল না সে কোথায় আছে- শত্রুদের না মিত্রদের কবলে।
চেতনা হারাবার আগে যা যা ঘটেছিল তা সব একে একে মনে করার চেষ্টা করতে লাগল দার্ণৎ। তখন সেই দৈত্যাকার শ্বেতঙ্গের কথা মনে পড়ে গেল তার। মনে পড়ে গেল তারই কোলের মধ্যে চেতনা হারিয়ে ফেলে। সে জানে না তার ভবিষ্যৎ কি, তার ভাগ্যে কি আছে। বনের অসংখ্য পোকামাকড় আর ঝিঁঝির ডাক, পাখি আর বাঁদরদের কিচিরমিচির, গাছের পাতা নড়ার শব্দ, সব মিলিয়ে এ এক আশ্চর্য জগৎ। লোকালয় বা মানুষের সমাজ থেকে কত দূরে। দার্ণৎ আবার ঘুমিয়ে পড়ল।
বিকেলে ঘুম ভাঙ্গলে দার্ণৎ দেখল তার পায়ের কাছে তার দিকে পিছন ফিরে একজন দৈত্যাকার লোক বসে আছে। তার পিঠটা দেখতে তামাটে রঙের হলেও সে শ্বেতাঙ্গ।
দার্ণৎ তাকে ক্ষীণ কণ্ঠে ডাকল। লোকটি তার পাশ দিয়ে মাথার কাছে এসে তার কপালে তার ঠাণ্ডা হাতটা রাখল। দার্ণৎ তাকে ফরাসী ভাষায় কি বলল।
