কুড়িজন সৈন্যের মধ্যে চারজন ঘটনাস্থলে মারা যায়, প্রায় বারোজন আহত হয় এবং দার্ণৎ নিখোঁজ হয়।
শার্পেন্তিয়ের তখন একটা ফাঁকা জায়গা দেখে শিবির স্থাপনের হুকুম দিল। শিবিরের সামনে আগুন জ্বেলে পালা করে প্রহরা দিয়ে রাতটা কাটাল ওরা।
এদিকে দার্ণৎকে নিয়ে একজন নিগ্রো একেবারে গাঁয়ের মধ্যে চলে গেল। এক শ্বেতাঙ্গ বন্দীকে দেখতে পেয়ে গায়ের সব নারী পুরুষেরা ছুটে এল। আফ্রিকার একদল মানুষখেকো আদিম অধিবাসীদের মধ্যে একজন শ্বেতাঙ্গ বন্দী হিসেবে এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হলো দার্ণৎ। প্রথমে মেয়েরা লাঠি দিয়ে ও পাথর ছুঁড়ে মারতে লাগল দার্ণকে।
দার্ণাৎ তখন অর্ধচেতন হয়ে পড়েছিল। এমন সময় কয়েকটা বর্শা তার গায়ের কয়েকটা জায়গা বিদ্ধ করল। তার গা থেকে তাজা গরম রক্ত ঝরতে লাগল।
এদিকে টারজান জেনের কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে গুলির শব্দ শুনে মবঙ্গাদের গায়ের দিকে ছুটে যেতে থাকে। মবঙ্গাদের গায়ের দিকে গুলির আওয়াজ পেয়ে বিপদের আভাস পায় সে।
অবশেষে গায়ের কাছে গিয়ে একটা গাছ থেকে টারজান দেখল একজন শ্বেতাঙ্গ বন্দী খুঁটিটায় বাঁধা আছে আর তার গায়ে খোঁচা মারা হচ্ছে। তবে তার মৃত্যু ঘটেনি তখনো।
এমন সময় এক দুর্ধর্ষ পুরুষ গোরিলার মত গাছের উপর গর্জন করে উঠল টারজান। মুহূর্তে টারজান তার ফঁসের দড়িটা ছুঁড়ে দিয়ে একজন নিগ্রোকে টেনে তুলে নিল গাছের উপরে। নিগ্রোরা তাদের চোখের সামনে দেখল তাদেরই একজনের দেহটা গলায় ফাসবদ্ধ অবস্থায় শুন্যে ঝুলতে ঝুলতে একটা গাছের উপর ঘন পাতার মধ্যে অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গেল কোথায়। তারা ভয়ে বিস্ময়ে হতবুদ্ধি ও অভিভূত হয়ে প্রথমে দাঁড়িয়ে রইল। কয়েক মুহূর্ত। তারপর উধ্বশ্বাসে ছুটতে ছুটতে যে যার ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল।
দার্ণৎ একা সেখানে দাঁড়িয়ে রইল। সে দেখল গাছের উপর পাতার মধ্যে দেহটা কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল। তার পরমুহূর্তেই সেই কৃষ্ণকায় দেহটা গাছের তলায় মাটির উপর সশব্দে পড়ে গেল। নিথর নিস্পন্দ দেহটা পড়ে রইল মাটিতে। এবার দেখল গাছ থেকে এক দৈত্যাকার শ্বেতাঙ্গ সোজা নেমে এসে তার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল।
দার্ণৎ ভাবল লোকটা হয়তো তাকে নতুনভাবে পীড়ন করে হত্যা করার জন্য আসছে। কিন্তু তার মুখে নিষ্ঠুরতার কোন চিহ্ন খুঁজে পেল না। লোকটা এসেই তার বাঁধন কেটে দিয়ে তাকে মুক্ত করে দিল। দার্ণৎ তখন দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না। তার ক্ষত-বিক্ষত দেহটা কাঁপছিল। কিন্তু টারজান তাকে ধরে ফেলে কাঁধের উপর তুলে নিল। দার্ণৎ এবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলল।
এদিকে ফরাসী সৈন্যদের শিবিরে সকাল হতেই লেফটন্যান্ট শার্পেন্তিয়ের কেবিনে ফিরে যাবে ঠিক করল।
ওরা যখন কেবিনে গিয়ে পৌঁছল তখন বিকেল হয়ে গেছে। শোকে দুঃখে ওদের অন্তরগুলো ভারী হয়ে থাকলেও কেবিনে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে সব শোক, দুঃখ দূর হয়ে গেল মুহূর্তে। যে জেনের জন্য এত কাণ্ড সেই জেন কেবিনের সামনে দাঁড়িয়েছিল। জঙ্গল থেকে বেরিয়েই জেনকে দেখতে পেলেন অধ্যাপক পোর্টার আর ক্লেটন। জেন ছুটে এসে তার বাবার গলাটাকে দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল। তার চোখ থেকে জল ঝরে পড়ছিল। অধ্যাপক জেনের কাঁধের উপর মুখটা রেখে শিশুর মত ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন।
জেন তার বাবাকে হাত ধরে কেবিনে নিয়ে গেল। ফরাসী সৈন্যরা শার্পেন্তিয়েরের সঙ্গে বেলাভূমি থেকে নৌকায় করে জাহাজে চলে গেল। ক্লেটনও প্রথমে ওদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে গিয়ে কেবিনে। ফিরে এসে জেনের সঙ্গে দেখা করল।
জেনকে দেখেই ক্লেটন আবেগের সঙ্গে বলে উঠল, জেন. ঈশ্বরের কি অসীম দয়া, তিনি তোমাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন আমাদের। কিন্তু কেমন করে উদ্ধার পেলে?
জেন কিছুটা গম্ভীর হয়ে বলল, মিস্টার ক্লেটন, আমি আপনাকে আমার বাবার প্রতি বীরোচিত শ্রদ্ধা ও আনুগত্য দেখে ধন্যবাদ না দিয়ে পারছি না।
একটা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা না করে পারল না। বলল, যে তোমাদের রক্ষা করেছিল সেই বনের মানুষটির খবর কি? সে আর আসেনি?
ক্লেটন বলল, কার কথা বলছ বুঝছি না।
জেন বলল, যে তোমাকে এবং আমাকে ও আমাদের প্রায় প্রত্যেককেই মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেছে।
ক্লেটন বিস্মিত হয়ে বলল,ও বুঝেছি এবার। তোমাকেও তাহলে সে-ই উদ্ধার করে? তুমি এখনো কিন্তু সে সব কথার কিছুই বলনি। বল সে কথা।
জেন বলল, সে আমাকে গতকাল কেবিনের কাছে ফাঁকা জায়গাটায় পৌঁছে দিয়ে জঙ্গলের ভিতর গুলির শব্দ শুনেই ছুটে চলে গেল। তারপর থেকে তাকে দেখতে পাইনি। আমার মনে হয় সে তোমাদের সাহায্যেই ছুটে যায়।
শান্ত কণ্ঠে ক্লেটন বলল, তার দেখা আমরা পাইনি। সে হয়তো উপজাতিদের দলেই যোগ দিয়েছে।
সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফারিত চোখে ক্লেটনের দিকে তাকিয়ে জেন বলল, না, কখনই তা হতে পারে না। উপজাতিরা নিগ্রো আর সে শ্বেতাঙ্গ এবং ভদ্র।
ক্লেটন প্রথমে হতবুদ্ধি হয়ে গেল। পরে বলল, সে একজন বন্য অর্ধবর্বর লোক মিস জেন। আমি তার বিষয়ে কিছুই জানি না। সে কোন উইরোপীয় ভাষাই জানে না। তাছাড়া তার গায়ের গয়নাগুলোও পশ্চিম আফ্রিকার আদিম অধিবাসীদের মত। এখান থেকে শত শত মাইলের মধ্যে কোন ভদ্র ও সভ্য মানুষ নেই। সেও হয়ত উপজাতিদেরই একজন এবং সেও একজন মানুষখেকো।
