টারজান এবার বন পথ ছেড়ে গাছের উপর দিয়ে যেতে লাগল। জেন বুঝল এই ভীষণ অরণ্যে টারজনের কোলে সে সবচেয়ে নিরাপদ।
তখন সবেমাত্র বিকেল হয়েছে। ভাবতে ভাবতে কয়েক মাইল পথ অতিক্রম করে অবশেষে সেই দমদম নাচের উৎসবের ফাঁকা জায়গাটার কাছে এসে পড়েছে তারা। গাছের পাতার ফাঁকে ফাঁকে বিকেলের রোদ এসে লুটোপুটি খেলছিল সেই ফাঁকা জায়গাটায়।
টারজান গাছ থেকে নেমে নরম ঘাসে ঢাকা একটা জায়গায় নামিয়ে দিল জেনকে। এক শান্ত স্বপ্নবেশে মনটা আচ্ছন্ন হয়ে উঠল জেনের। তার সামনে টারজনের দৈত্যাকার চেহারাটা দেখে তার নিরাপত্তাবোধ গম্ভীর হয়ে উঠল আরো।
টারজান এক সময় ফাঁকা জায়গাটা পার হয়ে বনের ভিতরে চলে গেল।
কিন্তু হঠাৎ কোথা থেকে টারজান তার পিছনে এসে দাঁড়াল। টারজনের পায়ের শব্দে ভয় পেয়ে পিছনে ফিরতে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাচ্ছিল জেন। টারজান তাকে ধরে ফেলল।
একবার হাসতে হাসতে জেন বলল, তুমি ইংরেজিতে কথা বললে ভাল হত।
টারজান নীরবে মাথা নাড়ল। জেন তখন ফরাসী ও জার্মান ভাষায় কথা বলল। কিন্তু তাও বুঝতে পারল না টারজান।
এক সময় টারজনের গলায় সোনার চেন দিয়ে ঝোলানো হীরের লকেটটার দিকে তাকিয়ে সেটার দিকে হাত বাড়াল জেন। টারজান সেটা গলা থেকে খুলে জেনের হাতে দিল।
জেন এবার টারজনের দিকে তাকিয়ে ভাল করে দেখল। দেখে মনে হলো মূর্তির পুরুষটি হয় টারজনের ভাই অথবা বাবা। টারজানও লকেটের ভিতরকার মূর্তি দুটো অপার বিস্ময়ের সঙ্গে দেখতে লাগল। সে কখনো এই মূর্তি দুটো দেখেনি। লকেটটা যে ভোলা যায় এবং তার মধ্যে এই দুটো মূর্তি আছে তা সে ভাবতেও পারেনি।
জেন ভেবে পেল না এই হীরের লকেটটা এই সুদূর আফ্রিকার জঙ্গলে এল কি করে।
টারজান এবার তার পিঠের তৃণ থেকে তীরগুলো সরিয়ে তার তলা থেকে একটা ফটো বার করে জেনের হাতে দিল। ফটোটি লকেটপড়িহিত সেই পুরুষ মূর্তিটির। জেন মূর্তি দুটোর পানে টারজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। কিন্তু টারজান মাথা নেড়ে কি বোঝাতে চাইল। তারপর ফটোটা জেনের হাত থেকে নিয়ে আবার সেটা তূণের ভিতরে পুরে রাখল।
জেন লকেটের পুরুষটার দিকে তখনো তাকিয়ে ভাবতে লাগল। পরে সে এই রহস্যের একটা সমাধান খুঁজে পেল। সে ভাবল এই লকেটটা আসলে লর্ড গ্রেস্টোকের। পরে তাঁর কেবিন থেকে টারজান সেটা ঘটনাক্রমে পেয়ে যায়। আর ঐ নারীমূর্তিটা লেডী এ্যালিসের। কিন্তু টারজনের চেহারা ও চোখ মুখের সঙ্গে ঐ মূর্তির সাদৃশ্যের কারণ কি তা বুঝতে পারল না অনেক ভেবেও।
টারজান এবার লকেটসমেত চেনটা জেনের কাছ থেকে নিয়ে আবার জেনের গলাতেই পরিয়ে দিল। জেনকে এতে অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে উঠতে দেখে হাসতে লাগল।
দেখতে দেখতে সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে আসতে তারা আবার কিছু ফল খেল। তারপর টারজান জেনকে নিয়ে তার বিছানায় দিয়ে এল। তার নিজের ছুরিটা তার হাতে দিল। তারপর ডালপালার বেড়া দিয়ে ঘেরা তার বিছানাটা হতে বেরিয়ে এসে সেটার বাইরে ঘাস দিয়ে নিজের জন্য একটা বিছানা তৈরি করে শুয়ে পড়ল।
সকালে ঘুম ভাঙতে জেন দেখল তখন রোদ উঠে গেছে।
ফল দিয়ে প্রাতরাশ করার পর টারজান ইশারায় অনুসরণ করতে বলল জেনকে। তারপর জেনকে কাঁধে নিয়ে গাছের উপর উঠে পড়ল। জেন বুঝল টারজান তাকে কেবিনে নিয়ে যাচ্ছে।
পথে যেতে যেতে মাঝখানে একবার একটা নদীর ধারে নেমে কিছু ফল আর জল খেয়ে নিল ওরা। কেবিনের কাছাকাছি এসে একটা লম্বা গাছের তলায় এসে টারজান হাত বাড়িয়ে কেবিনটা দেখিয়ে দিল জেনকে।
কেবিনের পথে পা চালিয়ে দিল জেন। তখন গোধূলির অন্ধকার হয়ে উঠেছিল বেশ। ফিলান্ডার কেবিনের বাইরে ছিল। এসমারাল্ডা ছিল কেবিনের ভিতরে। ফিলান্ডারের দৃষ্টিশক্তিটা ছিল বড় ক্ষীণ। দূরের জিনিস নজর যায় না।
হঠাৎ সামনে জেনকে দেখতে পেয়ে ফিলান্ডার আশ্চার্য হয়ে বলল, জেন তুমি! কোথা থেকে আসছ? কোথায় ছিলে?
জেন হেসে বলল, দয়া করুন মিস্টার ফিলান্ডার, কি করে এক সঙ্গে এত প্রশ্নের উত্তর দেব?
ফিলান্ডার বলল, তোমাকে নিরাপদ দেখে একই সঙ্গে এতদূর আনন্দিত ও বিস্মিত হয়েছি যে কি করছিলাম তা আমি নিজেই জানি না। এখন ভিতরে এস, যা যা ঘটেছিল সব বলবে আমায়।
জেনের খোঁজে লেটন্যান্ট দার্ণ আর লেক্টন্যান্ট শার্পেন্তিয়েরের নেতৃত্বে সশস্ত্র দলটি বনের মধ্যে এগিয়ে যেতে যেতে বুঝল তাদের কাজটা ক্রমশই কঠিন হয়ে উঠছে। কিন্তু অধ্যাপক পোর্টার আর ক্লেটনের হতাশ মুখ দুটোর পানে তাকিয়ে ফিরে যেতে পারছিল না তারা। তাছাড়া দার্ণৎ ভাবছিল জেন আর বেঁচে নেই। এতক্ষণ তাকে কোন বন্যজন্তু খেয়ে ফেলেছে। এবং তার কঙ্কালটাই হয়তো পড়ে আছে। কোথাও।
হঠাৎ প্রায় পঞ্চাশ জন নিগ্রো যোদ্ধা দার্ণকে ঘিরে ফেলতেই সে চীৎকার করে উঠল। সে তার রিভলবার থেকে গুলি করার আগেই তাকে তুলে নিয়ে পালাল জনকতক নিগ্রো। বাকিগুলো পথের ধারে ঝোপেঝাড়ে লুকিয়ে রইল।
দার্ণতের চীৎকার শুনতে পেয়ে সৈন্যরা ছুটে গিয়ে রাইফেল থেকে গুলি করতে লাগল। এমন সময় বনের ভিতর থেকে একটা বর্শা এসে একজনের বুকে বিদ্ধ করতে সে সঙ্গে সঙ্গে মারা গেল। অনেকগুলো তীর এসেও তাদের জনাকতকের গায়ে লাগল। ওরা তখন বন লক্ষ্য করে এগিয়ে গিয়ে নিগ্রোদের দেখতে পেয়ে জোর গুলি চালাতে লাগল। নিগারা তখন ভয়ে পালিয়ে গেল।
