টারজান দল থেকে চলে যাবার পর টারজ সেই দলের অধিপতি হয়। কিন্তু তারপর থেকে দলের মধ্যে ঝগড়া বিবাদ বেড়ে যায়। তখন টারজনের উপদেশের কথা স্মরণ করে একদিন টারজকে চার পাঁচজন মিলে আক্রমণ করে। টারজ পালিয়ে যায়।
কয়েকদিন ধরে টারজ একা একা ঘুরে বেড়িয়ে তার দলের বাঁদরদের উপর প্রতিশোধ নেবার কথা ভাবতে থাকে। ঘুরতে ঘুরতে একদিন সে দুটো মেয়েকে বনের মধ্যে দেখতে পায়। দলপতি হিসাবে তার যে সব স্ত্রী ছিল দলের লোকেরা তাদের আটকে রেখে দিয়েছে তাকে তাড়িয়ে দিয়ে। তাই টারজ তার স্ত্রী করার জন্য এক নতুন মেয়ে বাঁদর-গোরিলার খোঁজ করছিল। জেনকে দেখে লোমহীন এক সাদা মেয়ে-বাঁদর ভেবে তাকে কাঁধে চাপিয়ে নিয়ে গাছের উপর দিয়ে জঙ্গলের গভীরে পালাতে থাকে সে।
এদিকে টারজান জেনের প্রথম চীৎকার শুনে ছুটে এসমারা যেখানে পড়ে ছিল সেখানে এসে হাজির হলো। তারপর গাছের উপর উঠে জেনের খোঁজ করতে লাগল। এসমারাল্ডাকে পড়ে থাকতে দেখে সে বেশ বুঝতে পারল তার সঙ্গিনী জেনকে কোন কিছুতে নিশ্চয় ধরে নিয়ে গেছে। তার তীক্ষ্ণ ঘ্রাণশক্তির সাহায্যে বাতাসে গন্ধ শুঁকে শুঁকে এগিয়ে যেতে লাগল গাছের উপর দিয়ে। বাদরদলের কাছ থেকে এক পশুসুলভ ঘ্রাণশক্তির অধিকারী হয় টারজান। তাই দিয়ে সে বুঝল কোন বাঁধর-গোরিলা গাছের উপর দিয়ে ধরে নিয়ে গেছে জেনকে কিছুক্ষণ আগে।
ওদিকে টারকজও বুঝতে পেরেছিল তার পিছনে কেউ তাকে অনুসরণ করছে। এই ভেবে তার গতিবেগ বাড়িয়ে দিল। কিন্তু যখন দেখল অনুসরণকারী অনেক কাছে এসে পড়েছে তখন সে গাছ থেকে নেমে পড়ে জেনকে ধরে রইল। সে ভাবল তার প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়াই করবে দরকার হলে, সে পালিয়ে যাবে না। এইভাবে তিন মাইল গাছে গাছে যাবার পর টারজান টারকজের সামনে চিতা বাঘের মত লাফিয়ে পড়ল।
টারকজ যখন টারজানকে দেখল তখন ভাবল এই মেয়েটা টারজনের। তখন তার পুরনো শত্রুতা। এবং ঘৃণা আবার জেগে উঠল নতুন করে। তখন সে জেনকে ছেড়ে দিয়ে টারজনের সঙ্গে লড়াই করার জন্য প্রস্তুত হলো। টারজানও তার ছুরিটা শক্ত করে ধরে ঝাঁপিয়ে পড়ল তার উপর। টারজ তার ধারাল দাঁত বার করে টারজনের গায়ে কামড় দেবার আগেই টারজান বার বার তার ধারাল ছুরিটা বসিয়ে দিতে লাগল টারকজের বুকে। অবশেষে টারকজের রক্তাক্ত দেহটা নিষ্প্রাণ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়তেই জেন। দু’হাত বাড়িয়ে টারজানকে জড়িয়ে ধরল।
টারজানকে দেখে জেনও বুঝতে পেরেছিল এই লোকই তার বাবা ও ক্লেটনকে উদ্ধার করে এবং তাকে উদ্ধার করার জন্য সে এগিয়ে এসেছে। কিন্তু মানুষ হয়ে টারকজের মত এক ভয়ঙ্কর বাঁদর গোরিলার সঙ্গে কিভাবে পেরে উঠবে সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ ছিল তার। অবশেষে বাঁদর- গোরিলাটার মৃত্যু ঘটতে সে টারজনের শক্তিতে আশ্চর্য হয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে।
কিন্তু সে প্রেমের আবেগটা কেটে যেতেই হুঁস হয় তার। সে টারজানকে সরিয়ে দেয় দু’হাত দিয়ে। টারজান আবার তার কাছে সরে আসতে এবারও সে তাকে সরিয়ে দেয়। তার প্রতি জেনের এই প্রবল। ঘৃণা দেখে তার মন বদলে গেল। সে জেনকে দুহাত দিয়ে ধরে জঙ্গলের গভীরে নিয়ে গেল।
পরদিন সকালে কেবিন থেকে কামানের গোলার একটা শব্দ শুনে কেবিন থেকে বেরিয়ে এল ক্লেটন। দেখল সমুদ্রের উপর দুটো জাহাজ উপকূলের খুব কাছাকাছি এসে ইতস্তত ঘোরাঘুরি করছে। জাহাজ দুটোর মধ্যে একটা এ্যারো আর একটা ফরাসী যুদ্ধ জাহাজ। সে ফরাসী জাহাজটার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য সেই উঁচু জায়গাটায় স্তূপাকৃত কাঠে আগুন ধরিয়ে দিয়ে তার একটা শার্ট ধরে নাড়াতে লাগল। তা দেখে ফরাসী যুদ্ধ জাহাজটা এগিয়ে এসে একটা নৌকা নামিয়ে দিল। এক যুবক অফিসার কয়েক জন সৈন্য নিয়ে নৌকায় করে বেলাভূমিতে এসে নামল।
যুবক অফিসারটি এগিয়ে এসে ক্লেটনকে বলল, আপনিই মঁসিয়ে ক্লেটন না?
ক্লেটন বলল, অবশেষে তুমি এসেছ? ঈশ্বরকে ধন্যবাদ। খুব একটা দেরী হয়ে যায়নি।
যুবক অফিসার বলল, এ কথার কি মানে উঁসিয়ে?
ক্লেটন তখন তাকে জেনের অপহরণের কথা সব বলল। বলল, এখন তার অনুসন্ধানের জন্য সশস্ত্র লোকের দরকার।
অফিসার বলল, হা ভগবান! গতকাল? তাহলে এখনো সময় আছে। খুবই ভয়ঙ্কর কথা।
কিভাবে তারা এখানে এসে হাজির হয় এ বিষয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে যুদ্ধ জাহাজের কমান্ডার ক্যাপ্টেন দানে জানাল কয়েক সপ্তাহ আগে ‘এ্যারো’ জাহাজটা দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে তাদের জাহাজ থেকে সরে যাওয়ার পর তার খোঁজ করতে থাকে তারা। তারপর কয়েকদিন আগে দেখে সেটা সমুদ্রের বুকে ভেসে চলেছে। দূর থেকে মনে হলো জাহাজে যেন কোন লোক নেই। শুধু একজন লোক রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে তাদের কাছে যাবার জন্য ডাকছে।
অবশেষে এমনি ঘুরতে ঘুরতে এখানে এসে পড়ি আমরা। আমরা গতকাল সন্ধ্যার সময় এসেই একটা কামান দাগি। কিন্তু তা আপনারা শুনতে পাননি। তারপর আজ সকালে আবার একটা কামান দাগি।
গত সন্ধ্যায় ওরা বনের মধ্যে জেনের খোঁজে ব্যস্ত থাকায় কামানের গোলার শব্দ শুনতে পায়নি।
এদিকে ততক্ষণে জাহাজ থেকে রসদ ও অস্ত্রশস্ত্র এসে পড়ায় অধ্যাপক পোর্টার আর ক্লেটনের সঙ্গে ফরাসী সেনাদের একটি দল ততক্ষণাৎ রওনা হয়ে গেল জেনের খোঁজে।
