ক্যানলার তার টাকার জন্য কোন সুদ বা নিরাপত্তাসূচক কোন বন্ধকী জিনিস চায়নি। কিন্তু বাবা সে টাকা শোধ দিতে না পারলে আমার ভাগ্যে কি ঘটবে তা আমি জানি। লোকটাকে আমি সত্যিই দারুণ ঘৃণা করি।
দীর্ঘ কাহিনীটাকে এবার সংক্ষিপ্ত করা যাক। আমরা মানচিত্রে নির্দিষ্ট দ্বীপ আর বহু আকাঙ্ক্ষিত ধনরত্ন ভরা সিন্দুকটা পেয়ে যাই যথাসময়ে। লোহার সিন্দুকটা অনেকগুলো পালের কাপড় দিয়ে জড়ানো ছিল। সেটাকে দেখে মনে হচ্ছিল যে দু’ হাজার বছর ধরে মাটির ভিতর পোঁতা আছে সেটা। সিন্দুকটা ছিল শুধু অসংখ্য স্বর্ণমুদ্রায় ভরা এবং এত ভারী যে চারজন লোকে সেটা বয়ে নিয়ে যেতে পারে না। এত ধনরত্নে ভরা সিন্দুকটা সত্যিই কি ভয়ঙ্কর বস্তু। এ সিন্দুক যখন যেখানেই যায় সেখানেই এসে জোটে যত দুর্ভাগ্য আর হানাহানির ব্যাপার।
তুমি হয়তো ক্লেটনকে জান। সে লর্ড গ্রেস্টোকের একমাত্র পুত্র। ভবিষ্যতে সেই একদিন পিতার সব ভূ-সম্পত্তি আর সম্মানের উত্তরাধিকারী হবে। তাছাড়া ওর নিজেরও প্রচুর ধনসম্পত্তি আছে।
এখানে অবতরণ করার পর থেকেই কত সব অদ্ভুত অদ্ভুত অভিজ্ঞতা লাভ করছি আমরা।
কিন্তু সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো এক আশ্চর্য ব্যক্তির আবির্ভাব যে আমাদের সকলকে সব বিপদ থেকে উদ্ধার করে একে একে। আমি তাকে এখনো দেখিনি। কিন্তু বাবা, ফিলান্ডার আর ক্লেটন তাকে দেখেছে।
এখন আমি খুবই ক্লান্ত। ক্লেটনের আনা একরাশ ঘাস দিয়ে তৈরি এক অদ্ভুত বিছানায় শুতে যাচ্ছি। আমি। এরপর আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যা যা ঘটে তা সব জানাব।–ইতি জেন পোর্টার।
চিঠিখানা পড়ে একমনে ভাবতে লাগল টারজান। এ চিঠিতে এত সব কথা আছে যে কথা ভাবতে গিয়ে তার মাথা ঘুরছিল। একটা জিনিস এর থেকে বুঝল টারজান। টারজান আর সাইনবোর্ডে স্বাক্ষরকারী বাদরদলের টারজান যে একই ব্যক্তি তা ওরা জানে না। একথাটাই সে তাদের অবশ্যই বলবে।
টারজনের কাছে একটা পেন্সিল ছিল। তাই দিয়ে সে জেনের স্বাক্ষরের তলায় চিঠিটার উপর ‘আমিই হচ্ছি বাঁদরদলের টারজান।’ এই কথাগুলো লিখে দিল।
টারজান ভাবল তাদের মন থেকে সন্দেহ দূর করার পক্ষে এটাই যথেষ্ট। পরে জেনের এই চিঠিটা কেবিনে ফিরিয়ে দিয়ে আসবে এক সময়। তারপর ভাবল খাদ্য সম্বন্ধে তাদের দুশ্চিন্তার কোন কারণ। নেই। যে তাদের মাংস জুগিয়ে দেবে।
পরের দিন সকালে জেন তার দুদিন আগে হারানো চিঠিটা ঠিক সেই জায়গাতেই পেয়ে গেল। টেবিলটার যেখানে সে রেখেছিল সেটাকে। আশর্য হয়ে গেল সে। কিন্তু চিঠিটার তলায় টারজনের স্বাক্ষরটা দেখতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হিমশীতল একটা রোমাঞ্চ খেলে গেলে তার গোটা মেরুদণ্ডটা জুড়ে। সে চিঠিটা দেখাল ক্লেটনকে।
জেন বলল, মনে হলো সেই ভূতুড়ে মানুষটা আমি চিঠি লেখার সময় সর্বক্ষণ আমাকে দেখছিল। একথা ভাবতেও ভয়ের একটা শিহরণ জাগে আমার সর্বাঙ্গে।
ক্লেটন তাকে আশ্বাস দিয়ে বলল, সে কিন্তু আমাদের বন্ধু।
তারপর থেকে রোজই কোন একটা মরা জীব জন্তু বা ফলমাকড় তাদের দরজার সামনে রাতের অন্ধকারে রেখে যেত টারজান। কোনদিন হরিণ, কোনদিন শুয়োর বা চিতাবাঘ, আবার কোনদিন পাশের গাঁ থেকে চুরি করে আনা কিছু রান্না খাবার বা চালডোর পিঠে তাদের জন্য রেখে দিয়ে যেত সে। একদিন একটা সিংহের মৃতদেহও রেখে দিয়ে যায়।
এইভাবে একটি মাস কেটে গেল। একদিন বিকেলবেলায় ওদের সঙ্গে দেখা করার জন্য কেবিনে চলে গেল টারজান। গিয়ে দেখল ওরা তখন কেউ কেবিনে নেই।
টারজান যখন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল জেনের জন্য তখন তার অপরিচিত একটা শব্দ শুনে চমকে উঠল সে। বুঝল একটা বাঁদর-গোরিলা এইমাত্র একটা গাছে উঠল একটা শব্দ করে। আর ঠিক সেই সঙ্গে টারজান স্পষ্ট শুনতে পেল এক নারী কণ্ঠের ভয়ার্ত চীৎকার।
ক্লেটন, অধ্যাপক পোর্টার ও ফিলান্ডার এই চীৎকার একই সঙ্গে শুনতে পায়। শুনতে পেয়েই তাড়াতাড়ি কেবিনের কাছে চলে আসে সকলে। কিন্তু এসে দেখে জেন বা এসমারাল্ট কেবিনের মধ্যে কেউ নেই।
সঙ্গে সঙ্গে তারা তিনজনে জঙ্গলে গিয়ে জেনের নাম ধরে ডাকতে লাগল। কিন্তু ওদের দুজনেরই কোন সাড়াশব্দ শুনতে পেল না। হঠাৎ ঘুরতে ঘুরতে ক্লেটন এক জায়গায় দেখতে পেল এসমারাল্ডা মূর্হিত অবস্থায় পড়ে আছে।
ক্লেটন দেখল এসমারান্ডা ভয়ে শুধু অচৈতন্য হয়ে পড়েছে।
অধ্যাপক পোর্টার বললেন, আমি কি করব ক্লেটন বলতে পার? ঈশ্বর এমন নিষ্ঠুরভাবে আমার মেয়েটাকে ছিনিয়ে নিয়ে গেলেন?
ক্লেটন বলল, দাঁড়ান, আগে এসমারাল্ডাকে জাগিয়ে দেখি, কি ঘটেছে ওর কাছ থেকে শুনি।
এসমারাল্ডাকে জোর নাড়া দিয়ে জাগাল ক্লেটন। বলল, কি ঘটেছে বল। মিস পোর্টার কোথায়?
এসমারান্ডা উঠে বসে বলল, হা ভগবান, আমি মরতে চাই। জেন এখানে নেই? তাহলে তাকে নিয়ে গেছে।
ক্লেটন বলল, কে তাকে নিয়ে গেছে।
এসমারান্ডা বলল, সারা দেহে লোমে ঢাকা দৈত্যের মত একটা জন্তু।
মিস্টার ফিলান্ডার বলল, একটা গোরিলা?
গোরিলার নাম করতেই সকলে ভয়ে স্তব্ধ হয়ে গেল।
ক্লেটন একবার চারদিকে তাকিয়ে দেখল। কিন্তু চারদিকে ঘন জঙ্গলের মধ্যে কিছুই দেখতে পেল না। কিছুই বুঝতে পারল না।
তখন বিকেল গড়িয়ে গেছে। ওরা হতাশ হয়ে কেবিনে ফিরল। কেবিনের মধ্যে ওরা চুপচাপ বসে রইল।
