তারপর তারা সকলে মিলে মাটি খুঁড়ে অনেকটা খাল করে সিন্দুকটা বসিয়ে তার উপর স্লাইপের মৃতদেহটা শুইয়ে দিল। স্নাইপর কাছে যেসব অস্ত্র, পোশাক আর লোভনীয় জিনিস ছিল তা সব তারা নিয়ে নিল।
কাজ সেরে নাবিকরা সবাই নৌকায় করে জাহাজে গিয়ে জাহাজ ছেড়ে দিল। জাহাজটা ধীর গতিতে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে এগিয়ে যেতে লাগল।
গাছ থেকে নেমে পড়ল টারজন্। দেখল একটা কোদাল পাশের ঝোপের মধ্যে ফেলে রেখে গেছে নাবিকরা। সেই কোদালটা দিয়ে সে কবরটার নরম মাটিগুলো আবার খুঁড়তে লাগল। তারপর সিন্দুকটা বার করে স্লাইপের মৃতদেহটা তার মধ্যে রেখে আবার মাটি চাপা দিয়ে দিল। তারপর কোদালটা দড়ি দিয়ে বেঁধে পিঠে ঝুলিয়ে সিন্দুকটা অনায়াসে কাঁধে নিয়ে উত্তর-পূর্ব দিকে পায়ে হেঁটে এগিয়ে চলল। জঙ্গলের গভীরে সে এমন একটা ফাঁকা জায়গা খুঁজল যেখানে সে এটা পুঁতে রাখতে পারবে। লোহার সিন্দুকটায় ভারী তালা লাগানো থাকায় সে এটা বুঝতে পেরেছে যে এর মধ্যে নিশ্চয় কোন মূল্যবান বস্তু আছে।
কয়েক ঘণ্টা পথ চলার পর একদিন সেখানে তার দলের বাঁদর-গোরিলারা দমদম নাচের উৎসব করেছিল সেখানে গিয়ে হাজির হলো সে। তারপর সেই ফাঁকা জায়গাটায় কোদাল দিয়ে মাটি খুঁড়ে অনেকটা খাল করে সিন্দুকটা পুঁতে রাখল। অবশেষে কাজ সেরে গাছের উপর দিয়ে যখন কেবিনের কাছটায় গিয়ে পৌঁছল তখন প্রায় সন্ধ্যে হয়ে গেছে।
কেবিনের কাছে গিয়ে টারজান দেখল ভিতরে আলো জ্বলছে। জেন টেবিলের উপর কাগজ রেখে কি লিখছিল আর এসমারাল্ডা পুরু ঘাস বিছিয়ে তার উপর বিছানা পেতে ঘুমোচ্ছিল।
টারজান দেখল ঘরটা হঠাৎ অন্ধকার হয়ে গেল। সে তখন জানালা দিয়ে একটা হাত বাড়িয়ে জেনের পাণ্ডুলিপিটা তুলে নিয়ে সে তার তুণের মধ্যে ভরে রেখে বনের মধ্যে চলে গেল।
পরের দিন সকালে উঠেই টারজান কুড়ি মিনিট ধরে ক্রমাগত চেষ্টা করে যেতে লাগল লেখাগুলো পড়ার জন্য। অবশেষে দুই একটা শব্দ এখানে ওখানে বুঝতে পারল। তার অন্তরটা আনন্দে লাফিয়ে উঠল। আরো এক ঘণ্টা চেষ্টা করার পর সে সব লেখাগুলো পড়তে পারল। কাগজটাতে লেখা ছিলঃ
আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল, ১০° দক্ষিণ অক্ষাংশ।
ফেব্রুয়ারি ৩, ১৭০৯।
প্রিয় হেজেল,
নির্বোধের মত এ চিঠি লিখছি তোমায়, কারণ এ চিঠি তুমি কোনদিন পাবে কি না তা জানি না। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এ্যারো জাহাজে করে ইউরোপ থেকে রওনা হবার পর থেকে যে সব ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা লাভ করেছি সেই সব অভিজ্ঞতার কথা কাউকে না বলে পারছি না। যদি আমরা সভ্য জগতে আর না। ফিরি এবং তারই সম্ভাবনা বেশি, তাহলে যে সব ঘটনাবলী আমাদের সকরুণ পরিণতির দিকে নিয়ে যায় তার একটা সংক্ষিপ্ত বিবরণ অন্তত এই চিঠির মধ্যে পাওয়া যাবে।
তুমি জান, আমরা এক বৈজ্ঞানিক অভিযানে ইউরোপ থেকে কঙ্গো প্রদেশের পথে রওনা হই। আমার বাবার বিশ্বাস এক অতি প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন কঙ্গো উপত্যকার গর্ভে নিহিত আছে। কিন্তু সমুদ্র। পথে আসার সময় এক আসল সত্যের সন্ধান পাই আমরা।
বাল্টিমোরের এক বইপোকা পাঠক একখানা বই ঘাটতে ঘাটতে ১৫৫০ সালে স্প্যানিশ ভাষায় লেখা একটি চিঠি আবিষ্কার করেন। তাতে লেখা ছিল স্পেন থেকে দক্ষিণ আমেরিকাগামী একটি স্প্যানিশ জাহাজের বিদ্রোহী একদল নাবিক প্রচুর ধনরত্নের অধিকারী হয়। তবে যতদূর মনে হয় জলদস্যু হিসাবেই এই ধনরত্ন অধিকার করে তারা।
পত্র লেখক এই প্রসঙ্গে আরও লেখে স্পেন থেকে একটি জাহাজে করে রওনা হবার এক সপ্তাহ পরেই সে জাহাজের নাবিকরা বিদ্রোহী হয়ে উঠে জাহাজের সব অফিসার ও সুযোগ্য নাবিকদের হত্যা করে। ফলে এতে তাদেরই ক্ষতি হয়। কারণ জাহাজ চালাবার মত কোন সুযোগ্য নাবিক আর কেউ ছিল না। তাদের মধ্যে।
কোন না কোনভাবে উদ্ধার হবার আশায় তিন বছর সেখানে বাস করে ঐ দশজন নাবিক। পরে নানারকম রোগে ভুগতে ভুগতে মাত্র একজন ছাড়া সকলেই মারা যায় একে একে। এই জীবিত নাবিকটিই চিঠিখানি লেখে।
সৌভাগ্যক্রমে সে উত্তর দিকেই যাচ্ছিল এবং সপ্তাহখানেকের মধ্যেই স্পেন দেশীয় এক পণ্যবাহী জাহাজের সঙ্গে পথে দেখা হয়ে যায় তার সঙ্গে। জাহাজটি তখন পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ থেকে স্পেনে। যাচ্ছিল। জাহাজটি তাকে সেই নৌকা থেকে তুলে নিয় তাকে বাড়ি পৌঁছে দেয়। সেই জাহাজের ক্যাপ্টেন তার সব কথা শুনে তাকে বলে যে দ্বীপে সে ছিল এবং যে দ্বীপ থেকে এসেছে সে দ্বীপটি হল ১৬ বা ১৭° উত্তর অক্ষাংশে অবস্থিত আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলের অন্তর্গত কেপ ভার্দে ছাড়া আর কিছু নয়।
পত্র লেখক সেই দ্বীপটি এবং যে জায়গায় ধনরত্ন ভরা সিন্দুকটি পুঁতে রাখা হয় তার কথা বিস্তারিতভাবে লেখে এবং তার সঙ্গে জায়গাটার একটা মানচিত্রও জুড়ে দেয়।
৩৭ প্রথমে আমি ভেবেছিলাম আমরা এক বৈজ্ঞানিক গবেষণার কাজে যাচ্ছি। কিন্তু বাবা যখন তাঁর আসল উদ্দেশ্যের কথা আমাকে বললেন তখন আমি দমে গেলাম। যখন শুনলাম তিনি এই সন্ধানকার্যের জন্য রবার্ট ক্যানলারের কাছ থেকে আরও দশ হাজার ডলার ঋণ নিয়েছেন তখন বুঝলাম আরও তিনি ঠকবেন। এই ঋণের ব্যাপারে আমার দুঃখ ও উদ্বেগ আরো বেড়ে গেল। বাবা সেই চিঠি আর মানচিত্রটার জন্য ঐ দশ হাজার ডলারই খরচ করেন।
