এইভাবে টারজনের সঙ্গে অনেকক্ষণ যাওয়ার পর ওরা ওদের সামনের কেবিনটাকে দেখতে পেল। কেবিনের কাছে এসে ওদের গলা থেকে দড়ির বাঁধনটা খুলে দিয়ে জঙ্গলের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল টারজান।
অধ্যাপক পোর্টার তখন বললেন, এখন দেখছ ফিলান্ডার, আমি যা বলেছিলাম তাই ঠিক। তোমার গোঁড়ামির জন্য কত বিপদে পড়তে হলো আমাদের।
এরপর কেবিনে গিয়ে সকলের সঙ্গে মিলিত হয়ে সকাল পর্যন্ত তারা তাদের ভয়ঙ্কর কত সব অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করতে লাগল।
সব শুনে এসমারাল্ডা বলল, ও মানুষ নয় যেন এক দেবদূত। ঈশ্বর একে আমাদের উদ্ধারের জন্য পাঠিয়ে দিয়েছেন।
ক্লেটন রসিকতার সুরে হেসে বলল, যদি তুমি মরা সিংহের কাঁচা মাংস খেতে স্বচক্ষে দেখতে এসমারাল্ডা তাহলে বলতে ও এই মর্ত্যেরই দেবদূত।
গতকাল সকাল থেকে ওদের কারো কিছু খাওয়া হয়নি। তাই এবার ওরা খাবার তৈরির কথা ভাবল। নাবিকরা ওদের এখানে নামিয়ে দেবার সময় ওদের পাঁচজনের জন্য কিছু শুকনো মাংস, ময়দা, শাকসজি, বিস্কুট, চা, কফি প্রভৃতি দিয়ে যায়। কিন্তু তাতে ওদের ক্ষিদে মিটবে না।
কিন্তু যা হোক কিছু খাওয়ার পরই ওদের এই কেবিনটাকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে তাকে বসবাসযোগ্য করে তুলতে হবে। তবে ঠিক হলো প্রথমেই ঘর থেকে কঙ্কালগুলো সরাতে হবে। অর্থাৎ মাটি খুঁড়ে কবর দিতে হবে।
অধ্যাপক পোর্টার কঙ্কালগুলো পরীক্ষা করে বললেন, বড় কঙ্কাল দুটো কোন এক শ্বেতাঙ্গ পুরুষ আর এক শ্বেতাঙ্গ নারীর। ছোট কঙ্কালটা অবশ্যই এই হতভাগ্য দম্পতির ছেলের। ক্লেটন পুরুষ কঙ্কালটার হাতের আঙ্গুলে একটা আংটি দেখতে পেল। আশ্চর্য হয়ে সে দেখল আংটিটাতে তাদের গ্রেস্টোক পরিবারের চিহ্ন রয়েছে।
এমন সময় জেন একটা বই খুলে তার প্রথম পাতাতেই দেখল, ‘জন ক্লেটন, লন্ডন’ এই কথাগুলো লেখা রয়েছে। আর একটা বইয়ে শুধু গ্রেস্টোক এই নামটা লেখা আছে।
জেন আশ্চর্য হয়ে ক্লেটনকে বলল, এর মানে কি মাস্টার ক্লেটন? এখানে তোমাদের পরিবারের লোকজনের নাম এল কোথা থেকে?
ক্লেটন গম্ভীরভাবে উত্তর করল, আমার কাকা জন ক্লেটন নিখোঁজ হবার পর গ্রেস্টোক পরিবারের এই আংটিটা পাওয়া যাচ্ছিল না। আমরা জানতাম আমার কাকা সমুদ্রে ডুবে যান।
জেন আবার বলল, কিন্তু এই আফ্রিকার জঙ্গলে কি করে এলেন তাঁরা?
হয়ত সমুদ্রে জাহাজ ডুবিতে তাদের মৃত্যু ঘটেনি, এই কেবিনেই তাদের মৃত্যু হয়। মেঝের উপর পড়ে থাকা তার ঐ কঙ্কালই তার প্রমাণ।
জেন বলল, তাহলে ঐ কঙ্কালটা হলো তাঁর স্ত্রী লেডী গ্রেস্টোকের।
ক্লেটন বলল, সুন্দরী লেডী এ্যালিসের রূপগুণের কত কথাই না বাবা মার কাছ থেকে ছোটবেলায় শুনেছি। হায় হতভাগিনী মহিলা।
যথাযোগ্য শ্রদ্ধা ও মর্যাদার সঙ্গে কঙ্কালগুলোকে সমাহিত করল ওরা কেবিনের পাশে। দুটো কবরের মাঝখানে একটা ছোট কবরে সমাহিত করা হলো কালার মৃত শিশুর কঙ্কালটাকে। এই শিশুর কঙ্কালটাকে কবরের ভিতর রাখতে গিয়ে ফিলান্ডার আশ্চর্য হয়ে একবার অধ্যাপক পোর্টারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল, কারণ এতবড় লম্বা চওড়া কোন মানবশিশু সে কখনো দেখেনি।
টারজান দূর থেকে একটা গাছের উপর থেকে সমস্ত ব্যাপারটা দেখতে লাগল।
কবরে মাটি চাপা দেওয়ার কাজটা হয়ে গেলেই কেবিনের মধ্যে ফিরে এল ওরা।
হঠাৎ সমুদ্রের উপর চোখ পড়তেই চমকে উঠল এসমারাল্ডা। ঐ দেখ, এ্যারো নামে জাহাজটা আমাদের এখানে ফেলে রেখে চলে যাচ্ছে।
ক্লেটন বলল, ওরা বলেছিল আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে যাবে আমাদের হাতে।
জেন বলল, এটা হচ্ছে স্নাইপ নামে সেই পাজী লোকটার কাজ। কিং নামে যে লোকটাকে ওরা মেরে ফেলল সে থাকলে আমাদের আত্মরক্ষার জন্য উপযুক্ত অস্ত্র দিয়ে যেত।
অধ্যাপক পোর্টার বললেন, যাবার আগে আমাদের সঙ্গে দেখা না করে ওরা চলে যাওয়ায় আমি দুঃখিত। আমি ভেবেছিলাম আমার ধনরত্ন যা আছে ওদের কাছে তা আমাদের দিয়ে যেতে বলব। তা না হলে আমার সর্বনাশ হয়ে যাবে।
জেন তার বাবার পানে বিষণ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। তারপর বলল, ওদের সেকথা বললেও তাতে কোন ফল হত না বাবা। কারণ ঐ ধন-রত্নের জন্যই ওরা অফিসারকে খুন করে আমাদের এখানে ফেলে রেখে গেছে।
অধ্যাপক পোর্টার হাত দুটো জড়ো করে পিছনে কোমরের উপর রেখে জঙ্গলের দিকে একাই চলে গেলেন।
জাহাজটার গতিবিধি লক্ষ্য করে সমুদ্রের ধারে গাছের উপর দিয়ে এগিয়ে চলল টারজান।
টারজান দেখল জাহাজটা মৃদুমন্দ বাতাসে ধীর গতিতে কূলের দিকে আবার এগিয়ে আসছে। একটা নৌকা জাহাজ থেকে নামানো হলো। তাতে একটা বড় সিন্দুক চাপানো হলো। নৌকাটা কূলে এসে, ভিড়তেই কয়েকজন লোক সিন্দুকটা কূলের উপর নামাল।
এবার স্নাইপ নামে সেই ইঁদুরমুখো নাবিকটা নৌকা থেকে অন্য সব লোকজনদের ডাকতেই তারা কোদাল গাঁইতি প্রভৃতি নিয়ে মাটি খোঁড়ার জন্য এগিয়ে এল।
স্নাইপ প্রভুত্বের সুরে তাদের হুকুম করতে একজন নাবিক বলে উঠল, তুমি কি করবে?
স্নাইপ বলল, আমি এখন ক্যাপ্টেন। ক্যাপ্টেন হয়ে আমি তোমাদের সঙ্গে মাটি খুঁড়ব, এটা নিশ্চয় তোমরা চাও না?
স্নাইপ তাদের রিভলবারের ভয় দেখাতে টারান্ট নামে একজন নাবিক কুড়াল দিয়ে অতর্কিতে স্লাইপের। মাথায় আঘাত করল। সঙ্গে সঙ্গে শ্লাইপের মাথাটা দু’ফাঁক হয়ে গেল এবং সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
