টারজান ক্লেটনকে বলল তার পিঠের তূণ থেকে একটা বিষাক্ত তীর আর কোমর থেকে ছুরিটা বার করে সেগুলো সিংহটার পিঠের উপর যেন সে বসিয়ে দেয়। কিন্তু ক্লেটন তার কথা বুঝতে পারল না। এদিকে টারজান সিংহটাকে ছাড়তেও পারছিল না।
ওদিকে জেন চেতনা ফিরে পেয়ে যখন দেখল সিংহটা এবার ঘরে ঢুকবেই এবং তাদের দুজনের জীবন্ত দেহ থেকে মাংস ছিঁড়ে খাবে। তখন সে ঘরের মেঝে থেকে রিভলবারটা তুলে নিয়ে গুলি করে তাদের দুজনকেই হত্যা করার কথা ভাবছিল যাতে সিংহটা তাদের জীবন্ত ধরতে না পারে। এমন নময় সে দেখল বাইরে থেকে দু’জন লোক সিংহটাকে টেনে জানালা থেকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
ক্লেটন এবার কেবিনের মধ্যে তাড়াতাড়ি ছুটে গিয়ে জেনকে দরজা খুলতে বলল। জেনও তাড়াতাড়ি দরজা খুলে ক্লেটনকে ভিতরে ঢুকিয়ে নিল। বলল, ঐ বিকট চীৎকারটা কিসের।
ক্লেটন বলল, যে ব্যক্তিটি সিংহীটাকে মেরে তোমার প্রাণ বাঁচিয়েছে এ চীৎকার তারই।
এবার ক্লেটনের সঙ্গে বাইরে গিয়ে মরা সিংহীটাকে একবার নিজের চোখে দেখল জেন। কিন্তু টারজানকে দেখতে পেল না ওরা। তার আগেই অদৃশ্য হয়ে গেছে সে কোথায়। ওরা আবার ঘরের মধ্যে এসে দরজা বন্ধ করে দিল। জেন বলল, কী বিকট চীৎকার! এ চীঙ্কার কোন মানুষের হতে পারে না।
ক্লেটন বলল, হ্যাঁ মিস পোর্টার। আমি দেখেছি। তবে সে হয় মানুষ অথবা কোন বনদেবতা।
এরপর বনের মধ্যে যা যা ঘটেছিল, টারজান কিভাবে তার প্রাণ বাঁচায় তার সব কথা একে একে বলল জেনকে। সেই সঙ্গে বাদামী রঙের চামড়া, সুন্দর মুখ, অমিত আশ্চর্য শক্তি আর অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিসম্পন্ন সেই মানুষটার প্রতি শ্রদ্ধা জানাল ওরা দুজনেই।
ক্লেটন বলল, প্রথমে ভেবেছিলাম ঐ লোকটাই হলো টারজান। কিন্তু পরে দেখলাম ও ইংরেজি ভাষা বোঝে না, কথা বলতেও পারে না। সুতরাং ও কখনই টারজান নয়।
জেন বলল, ও যেই হোক, ওর কাছে আমরা আমাদের জীবনের জন্য ঋণী। ঈশ্বর ওর মঙ্গল করুন। ওর জঙ্গলজীবন নিরাপদ করুন।
কেবিন থেকে কয়েক মাইল দূরে বালুকাময় এক বেলাভূমির উপর দু’জন বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে ছিল। দু’জনে কোন একটা বিষয় নিয়ে তর্ক করছিল।
প্রায় প্রতি মুহূর্তেই বন্য জীবজন্তুর গর্জন শোনা যাচ্ছিল। কেবিনটাতে ফিরে যাবার জন্য অনেক চেষ্টা করেছে তারা। মাইলের পর মাইল ধরে বহু বনপথ পার হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই ভুল পথে এগিয়ে গেছে।
এখান তাদের সামনে একমাত্র সমস্যা কিভাবে তাদের শিবিরে ফিরে যাবে। কোন পথে গেলে কেবিনটাকে খুঁজে পাবে। এরই উপর নির্ভর করছে তাদের জীবনমৃত্যু।
ফিলান্ডার ঝোপের দিকে তাকিয়ে বলল, ঈশ্বরের নামে বলছি অধ্যাপক, বোধ হয় একটা সিংহ।
অধ্যাপক পোর্টার বললেন, হ্যাঁ, খারাপ ভাষায় যদি বল তাহলে ওটা সিংহ। কিন্তু আমি বলছিলাম
সিংহটা আমাদের অনুসরণ করছে। এই বলে ফিলান্ডার ছুটতে লাগল।
অধ্যাপক পোর্টার তখন বললেন, থাম থাম ফিলান্ডার। এইভাবে ছোটাটা আমাদের মত শিক্ষিত লোকের কখনো শোভা পায় না।
কিন্তু এবার অধ্যাপক নিজে পিছনে ফিরে তাকিয়ে সিংহটার হলুদ চোখদুটো আর আধ খোলা মুখের দাঁতগুলো দেখে ফিলান্ডারের পিছু পিছু তিনিও ছুটতে লাগলেন।
অদূরে একটা গাছ থেকে একজোড়া চোখ তাদের সবকিছু লক্ষ্য করছিল। সে চোখ হচ্ছে টারজনের। টারজান তাদেরই খোঁজ করতে করতে এখানে এসে পড়ে।
টারজান যখন দেখল ফিলান্ডার ছুটতে ছুটতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে তখন যে গাছে সে বসেছিল সেই গাছের নিচু ডালটা থেকে তার জামার কলার ধরে গাছের উপরে উঠিয়ে নিল তাকে। তারপর অধ্যাপক পোর্টার সেই গাছের তলায় এলে তাকেও তুলে নিল টারজান। নুমা বা সিংহটা তখন তার শিকার হাতছাড়া হয়ে যেতে হতবুদ্ধি হয়ে একটা লাফ দিয়ে গর্জন করে উঠল একবার।
এদিকে টারজনের গর্জন শুনে হঠাৎ চমকে উঠে ফিলান্ডার পড়ে যাচ্ছিল গাছের ডাল থেকে। তার উপর অধ্যাপক পোর্টার ঢলে পড়ায় সে টাল সামলাতে না পারায় দু’জনেই দু’জনকে জড়াজড়ি করে পড়ে গেল গাছ থেকে।
কিছুক্ষণ তারা দুজনেই চুপ করে মরার মত শুয়ে রইল। ভাবল তাদের হাত পা হয়ত ভেঙ্গে গেছে।
কিছুক্ষণ পর প্রথমে দু’হাতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন অধ্যাপক পোর্টার।
ফিলান্ডার এবার ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। দেখল তারও হাত পা ভাঙ্গেনি এবং দেহের সব অঙ্গ প্রত্যঙ্গই অক্ষত আছে। এমন সময় নগ্নদেহ টারজনের দৈত্যাকার মূর্তিটা দেখে অধ্যাপক পোর্টারের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। অধ্যাপক পোর্টার দেখল সত্যিই তাদের সামনে একটা কৌপীন আর কতকগুলো ধাতুর গয়না পরা একটা নগ্নদেহ দৈত্য দাঁড়িয়ে আছে।
অধ্যাপক টারজানকে অভিবাদন করে বলল, শুভ সন্ধ্যা স্যার।
তার উত্তরে টারজান তাকে অনুসরণ করার জন্য ইশারা করল।
ফিলান্ডার বলল, আমার মনে হয় ওকে অনুসরণ করাই আমাদের উচিত।
অধ্যাপক পোর্টার বললেন, কিছু আগে তুমি আমাকে বুঝিয়েছিলে আমাদের শিবিরটা দক্ষিণ দিকে অবস্থিত এবং সেই মত আমরা এগোচ্ছিলাম। সুতরাং আমাদের দক্ষিণ দিকেই যেতে হবে।
কিন্তু এ বিষয়ে ওদের তর্কবিতর্ককে আর এগোতে দিল না টারজান। সে তার দড়িটা দিয়ে ওদের দু’জনের ঘাড় দুটোকে বেঁধে ওদের টেনে নিয়ে যেতে লাগল। তখন দু’জনেই আর বাধা না দিয়ে স্বেচ্ছায় অনুসরণ করতে লাগল টারজানকে। যেতে যেতে অধ্যাপক পোর্টার একবার ফিলান্ডারকে বললেন, থাম থাম ফিলান্ডার, এই সব জোর জবরদস্তিমূলক কৌশলের কাছে আমাদের আত্মসমর্পণ করা উচিত নয়। কিন্তু সে বাধা টেকেনি।
