প্রধান সন্ন্যাসী ও চিতা-দেবতার সঙ্গে পরামর্শ করতে তারা অনেকেই মন্দিরে চলে গেছে। আমরাও সেখানে গেলাম। কিন্তু এত বেশি পরিমাণ দেশী চোলাই তারা গিলল যে কিছু জানতেই পারল না। তাই তো তোমাকে বলতে এলাম, তাদের গ্রাম এখন প্রায় ফাঁকা; নারী, শিশু ও সামান্য কিছু সৈনিকমাত্র আছে। সে গ্রাম আক্রমণ করার এই উপযুক্ত সময়।
ঠিক বলেছ। ঘুমন্ত সৈনিকদের জাগিয়ে তুলতে ওরান্ডো হাততালি দিল।
বনের আঁকাবাঁকা পথ ধরে ওরান্ডোর সৈন্যদলকে সে নিয়ে চলল গাটো মুঙ্গুর গ্রামের দিকে। কনের শেষে ফসলের মাঠে পৌঁছে তারা একটু থামল, তারপর নিঃশব্দে হামাগুড়ি দিয়ে নদীর দিকে গেল। এতক্ষণে মুজিমো বুঝতে পারল যে চিতা-মানুষেরা মন্দির থেকে ফেরে নি। মুজিমোর কথামত সৈন্যদের নদীর ধারে ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে রেখে ওরান্ডো প্রতিটি সৈনিককে নির্দেশ দিল, সংকেত পেলেই যেন তারা সাহসের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করে। ডোঙ্গার শব্দ কানে আসছে–ছলাৎ ছলাৎ, ছলাৎ। উটেঙ্গারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষমান। একে একে বিশটা ডোঙ্গা এসে ভিড়ল সৈনিক ডোঙ্গা থেকে নেমে সারিবদ্ধভাবে গ্রামের দিকে এগিয়ে চলল। আর দেরী নয়। ওরান্ডো সংকেত করল। সঙ্গে সঙ্গে নববইটি উটেঙ্গা সৈনিকের কণ্ঠে ধ্বনিত হল রণহুংকার; তাদের বর্শা ও তীর বৃষ্টিধারার মত ঝরে পড়তে লাগল চিতা মানুষদের উপর।
চিতা-মানুষদের লম্বা সারি তচনচু হয়ে গেল। অতর্কিত আক্রমণের ফলে পলায়ন ছাড়া অন্য কোন চিন্তাই তাদের মাথায় এল না। নদীর তীরে যারা পড়েছিল তারা আবার ডোঙ্গা ভাসাবার চেষ্টা করল; যারা তখনও তীরে নামে নি তারা ডোঙ্গার মুখ ঘুরিয়ে দিল মন্দিরের দিকে। বাকিরা পালাতে লাগল গ্রামের দিকে। তাদের পিছু ধাওয়া করল উটেঙ্গা সৈনিকরা। গ্রামের ফটক বন্ধ; ভিতরের রক্ষীরা ফটক খুলতে সাহস করল না। তুমুল যুদ্ধ হল সেখানেই। নদীর তীরে যারা পড়েছিল উটেঙ্গা সৈনিকদের হাতে তারা একেবারে কচুকাটা হয়ে গেল। আর অনেকক্ষণ যুদ্ধের পরে ভিতরের রক্ষীরা যখন ফটক খুলে দিল বাইরে তখন তাদের দলের আর কেউ অবশিষ্ট নেই, হয় মরেছে, না হয় তো পালিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে উটেঙ্গা সৈন্যরা হৈ-হৈ করতে করতে ভিতরে ঢুকে গেল। তাদের হাতের জ্বলন্ত মশালের আগুনে গাটো মুঙ্গুর গ্রামের খড়ের ঘরগুলো দাউ দাউ করে জ্বলতে লাগল। জয় সম্পূর্ণ হল।
ওরান্ডো তখন সেই ঘর-পোড়া আলোয় খুঁজে খুঁজে নিজের ক্ষয়-ক্ষতির হিসেবে করতে লাগল। ওরান্ডো দেখল, হতাহত সৈনিকদের পাশে একদলা কাদার মত চিৎ হয়ে পড়ে আছে মুজিমো।
সে দৃশ্য দেখে সর্দারের ছেলে বিস্মিত হল, শোকাহত হল; তার অনুচররাও মর্মাহত। তাদের ধারণা ছিল, মুজিমো প্রেতলোকের জীব, কাজেই তার মৃত্যু নেই। কিন্তু সেও তো মানুষের মতই মরণশীল। এতদিন লোকটা তাদের ধোকা দিয়েছে।
ওরান্ডো বলল, মানুষই তোক আর প্রেতই হোক, আমার প্রতি সে বিশ্বস্ত ছিল; তোমরাই তো চোখে দেখলে, সে যুদ্ধ করেছে অসীম সাহসিকতার সঙ্গে।
সকলেই সে কথা মেনে নিল।
ওদিকে শেষ ডোঙ্গাটাতে চেপে বুড়ো টাইমার প্রাণপণে বৈঠা চালিয়ে যাচ্ছে ছোট খালের জলে। কালি বাওয়ানা বসে আছে ডোঙ্গার মধ্যে। অসভ্য লোকদের পরানো মাথার ঢাকনা খুলে ফেলেছে; ছিঁড়ে ফেলেছে গলার দাঁতের হার।
মনের সুখে ডোঙ্গা বাইছে বুড়ো টাইমার। হঠাৎ বৈঠার ছপছপাৎ শব্দ তার কানে এল। টাইমারের বুকের ভিতরটা ধড়াস করে উঠল। তাড়াতাড়ি ডোঙ্গার মুখ দক্ষিণ তীরের দিকে ঘুরিয়ে দিল। সেখানে গাছপালার ছায়ার মধ্যে লুকিয়ে পড়ল।
ঠিক তখনই আর একটা ডোঙ্গা পিছনে এসে হাজির হল। বোবোলোর গলা চিনতে বুড়ো টাইমারে ভুল হবার কথা নয়। কয়েকজন সৈনিক লাফিয়ে তাদের ডোঙ্গায় চড়ে তার মাথায় আঘাত করল, টেনে হিঁচড়ে তাকে ফেলে দিল। আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলল।
আবার বোবোলোর গলা। জলদি কর। ওরা আমাদের পিছু নিয়েছে। উটেঙ্গারা আসছে।
অনেকগুলো শক্ত হাত ডোঙ্গার বৈঠা চেপে ধরল। বিদ্যুৎ কেগে ডোঙ্গাটা ছুটে চলল মন্দিরের দিকে। সাদা মানুষটির মুখ শুকিয়ে গেল। মেয়েটাকে প্রায় উদ্ধার করে এনেছিল। এমন সুযোগ আর আসবে না।
মেয়েটিকে ডাকল। কোন সাড়া এল না।
বোবোলোর ডোঙ্গা যখন বুড়ো টাইমার ও মেয়েটির ডোঙ্গার কাছাকাছি চলছিল তখন সাদা চামড়া ও নীল চুল দেখে বোবোলো মেয়েটিকে চিনতে পেরে অন্ধকারেই সবল হাত বাড়িয়ে তাকে নিয়ে এসেছিল তার নিজের ডোঙ্গায়। বোবোলোর হুকুমেই ডোঙ্গাটা বিদ্যুৎগতিতে গ্রামের দিকে ছুটে গিয়েছিল।
ঘটনার আকস্মিকতায় মেয়েটি তখন একেবাইে কিংকর্তব্যবিমূঢ়। একমাত্র যে মানুষটির উপর এতক্ষণ পর্যন্ত সে ভরসা করে ছিল এবার সেও হারিয়ে গেল।
হাত-পা বাঁধা অবস্থায় বুড়ো টাইমার ফিরে চলল মন্দিরের দিকে। সকলে তাকে টানতে টানতে মন্দিরে নিয়ে গের। মাতাল সন্ন্যাসী ও সন্ন্যাসিনীরা ইতস্তত পড়ে আছে মন্দিরের মেঝেতে। গণ্ডগোল কানে যেতে প্রধান সন্ন্যাসী ইমিগেগ ঘুম থেকে জেগে উঠল। দুই হাতে চোখ মুছতে মুছতে বলল, কি হয়েছে?
ততক্ষণে গাটো মুঙ্গু ঢুকেছে মন্দিরে। সেই জবাব দিল, অনেক কিছু ঘটেছে। তোমরা সকলে যখন মাতাল হয়ে পড়েছিল, এই সাদা মানুষটা তখন পালিয়েছিল। উটেঙ্গারা আমার সৈনিকদের হত্যা করেছে, আমার গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে।
