ক্লেটন তা শুনে চমকে উঠল ভয়ঙ্করভাবে। তার গায়ের রক্ত হিম হয়ে গেল। এমন বিকট চীৎকার জীবনে সে কখনো শোনেনি।
প্রথমে ক্লেটন বুঝে উঠতে পারল না এমন অবস্থায় কি সে করবে।
কিন্তু টারজান বুঝল ক্লেটন ভুল পথে যাচ্ছে। এই পথে গেলে মবঙ্গাদের গায়ে গিয়ে উঠবে সে। বুঝল ক্লেটনের মত একজন শ্বেতাঙ্গ সামান্য একটা বর্শা হাতে নিয়ে সেখানে গেলে মৃত্যু তার অবধারিত।
টারজান এবার কি করবে তা ভেবে পেল না। যদি সে তাকে কেবিনে যাবার সঠিক পথ দেখিয়ে না দেয় তাহলে এই জঙ্গলে মৃত্যু তা অনিবার্য। তাছাড়া তার ডান দিকে অল্প কিছু দূরেই একটা নুমা বা সিংহ তার উপর ঝাঁপ দেবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। সিংহটা গর্জন করতেও শুরু করে দিয়েছে এবং তা শুনে ভয়ে সচকিত হয়ে বর্শাটা উঁচু করে ধরে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ক্লেটন।
হঠাৎ তার মাথার উপর একটা অদ্ভুত চীৎকার শুনতে পেল ক্লেটন। একটু আগে সে এই চীৎকারই শুনেছিল। সঙ্গে সঙ্গে ক্লেটন দেখল গাছের উপর থেকে একটা তীর এসে সিংহের গাটাকে বিদ্ধ করল। ক্লেটন একটু সরে গেল। সিংহটা তখন আবার তাকে আক্রমণ করার জন্য লাফ দিল। এবার ক্লেটন আশ্চর্য হয়ে দেখল দৈত্যাকার এক নগ্নদেহ মানুষ গাছ থেকে সিংহটার ঘাড়ের উপর লাফিয়ে পড়ল। এরপর যে দৃশ্য ক্লেটন দেখল তা সে জীবনে ভুলতে পারবে না কখনো। দৈত্যাকার সেই শ্বেতাঙ্গ মানুষটা সিংহটার কেশর ধরে খানিকটা উপর দিকে তুলে ডান হাত দিয়ে সিংহের ঘাড়টা জড়িয়ে ধরে ছুরিটা বা দিকের ঘাড়ের উপর বারবার আমূল বসিয়ে দিতে লাগল। টারজান এই আক্রমণের কাজটা এত দ্রুত সেরে ফেলল যে সিংহটা প্রতিআক্রমণের কোন সুযোগ পেল না।
এবার তার সামনে সেই অদ্ভুতদর্শন দৈত্যাকার মানুষটাকে দেখতে লাগল ক্লেটন। কোমরে একটা পশুর চামড়া ছাড়া গায়ে আর কোন পোশাক-আশাক বলতে কিছুই নেই। গায়ে ও পায়ে রয়েছে আদিম অধিবাসীদের মত কতকগুলো গয়না। গলায় হীরকের লকেটওয়ালা একটা সোনার হার। গায়ের রংটা তারই মত আর বয়সে সে তারই মত যুবক।
টারজান এবার শিকারের ছুরিটা খাপের মধ্যে ঢুকিয়ে তার ফেলে দেয়া তীর ধনুকটা কুড়িয়ে নিল। ক্লেটন ইংরেজি ভাষায় তাকে ধন্যবাদ দিল তার জীবন রক্ষার জন্য। কিন্তু টারজান লিখতে জানলেও উচ্চারণ না জানায় কোন কথা বলতে পারল না। এরপর ছুরি দিয়ে সিংহের মৃতদেহটা থেকে কিছুটা মাংস কেটে খাবার সময় ক্লেটনকেও ডাকল। কিন্তু ক্লেটন কাঁচা মাংস খেতে পারে না বলে তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
খাওয়া হয়ে গেলে টারজান ইশারায় ক্লেটনকে অনুসরণ করার জন্য অনুরোধ করল। কিন্তু ক্লেটন ভাবল লোকটা হয়ত তাকে জঙ্গলের গভীরে নিয়ে যাবে। সেজন্য সে তার সঙ্গে যেতে চাইল না। ক্লেটন একবার ভাবল এই হচ্ছে বাদরদলের টারজান। কিন্তু নাবিকের কাগজে ইংরেজি লেখা দেখে ভেবেছিল টারজান যে-ই হোক ইংরেজি জানে। কিন্তু এই লোকটা ইংরেজিতে কথা বলতে না পারায় সে বিষয়ে নিশ্চিন্ত হতে পারল না ক্লেটন।
এদিকে সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। টারজান তাকে পথ দেখিয়ে কেবিনে নিয়ে যাবে একথা ইশারায় ক্লেটন বললেও ক্লেটন তার সঙ্গে যেতে না চাওয়ায় তার জামার কলার ধরে তাকে টেনে নিয়ে যেতে লাগল টারজান।
এদিকে কেবিনের মধ্যে সেই বেঞ্চটায় বসে এসমারাল্ডা ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। জেন তার পাশেই বসে ছিল। তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। জানা অজানা কত সব জন্তু জানোয়ারের ডাক শোনা যাচ্ছে। অথচ তাদের তিনজন লোকই জঙ্গলের কোথায় কি করছে তার কিছুই ঠিক নেই।
সহসা দরজার বাইরে কিসের একটা শব্দ শুনতে পেয়ে চমকে উঠল জেন।
তার মনে হলো কোন একটা জন্তু তার ভারী দেহটা দিয়ে দরজায় চাপ দিচ্ছে। তার কিছু পরেই কেবিনের জানালার গরাদের ফাঁক দিয়ে বাইরে একটা সিংহকে দেখতে পেল। সিংহটা এবার জানালার গরাদের ভিতর দিয়ে মুখটা ঢোকাবার চেষ্টা করতে লাগল। তখন আকাশে চাঁদ থাকায় চাঁদের আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল সিংহটাকে।
সিংহের মুখটা দেখে আর তার ডাক শুনে এমারাল্ডা মূৰ্ছিত হয়ে পড়ে গেল মেঝের উপর।
হঠাৎ জেনের মনে পড়ল ক্লেটন তাকে একটা রিভলবার দিয়ে গেছে। এবার সে সিংহের মুখের কাছে রিভলবার নিয়ে গিয়ে একটা গুলি করল। সঙ্গে সঙ্গে সিংহটাও নেমে গেল জানালার গরাদ থেকে।
সিংহটা মরেনি। গুলি তার ঘাড়ের কাছে একটু লেগে যায়। গুলির কর্ণবিদারক শব্দে আর চোখ ধাঁধানো ঝলকানিতে ভয় পেয়ে কিছুটা সরে যায় সিংহটা। পর মুহূর্তেই সে নতুন উদ্যমে ও প্রচণ্ড রাগে আবার জানালার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু এবার ঘরের দু’জন বাসিন্দাই নীরব হয়ে শুয়ে আছে। আর কোন বাধা না পেয়ে এবার সে গরাদের ফাঁক দিয়ে তার মুখ আর কাঁধ দুটো একটু একটু করে ঢোকাতে লাগল। আর একটু হলেই সে তার গোটা দেহটা ঢুকিয়ে দেবে।
জেন সহসা চোখ মেলে এই দৃশ্যই দেখতে পেল।
পথ চলতে চলতে ক্লেটন একটা গুলির শব্দ শুনে ভয় পেয়ে যায়। জেনের জন্য শঙ্কা বেড়ে যায় তার।
অবশেষে তারা উপকূলের কাছে ফাঁকা জায়গাটায় এসে পড়ল। টারজান ক্লেটনকে নিয়ে একশো ফুট উঁচু একটা গাছের উপর থেকে নেমে পড়ল। ওরা মাটিতে নেমেই দেখল কেবিনের জানালার উপর একটা সিংহ দাঁড়িয়ে গরাদের ভিতর দিয়ে ভিতরে মুখটা ঢুকিয়ে ঢুকবার চেষ্টা করছে। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে টারজান দ্রুত গতিতে সেখানে গিয়ে সিংহটার পিছনের পা দুটো ধরে টানতে লাগল। ক্লেটনও গিয়ে তাকে সাহায্য করার চেষ্টা করতে লাগল।
