ইঁদুরমুখো নাবিকটা যখন তার রিভলবারটা অর্ধেক বার করে গুলি করতে যায় এবং যখন অন্যান্য নাবিকরা তার পানে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তখনি অকস্মাৎ ঘটে যায় ঘটনাটা। বর্শার তীক্ষ্ণ ফলকের আঘাতে নাবিকটা পড়ে যায় মাটিতে।
অধ্যাপক পোর্টার তখন তাঁর সহকারী সম্পাদক স্যামুয়েল ফিলান্ডারকে নিয়ে বনের ভিতরে ঘুরতে চলে গেছেন। নিগ্রো মহিলা এসমারাণ্ডা তখন কেবিনের ভিতর মালপত্রগুলো গুছিয়ে রাখছিল। নাবিকটা ক্লেটনের পিঠ লক্ষ্য করে গুলি করতে গেলে মিস পোর্টার ভয়ে চীৎকার করে ওঠে। এমন সময় টারজনের বর্শাটা নাবিকটার ডান কাঁধটাকে বিদ্ধ করতে সে পড়ে যায়। তার রিভলবার থেকে তখন গুলিটা বেরিয়ে পড়ে। কিন্তু কারো গায়ে লাগেনি।
সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য নাবিকরা এসে তার চারদিকে ভিড় করে দাঁড়ায়। অনেকে অস্ত্র হাতে বনের যেদিক থেকে বর্শাটা নিক্ষিপ্ত হয় সেদিকে তাকায়। কিন্তু কাউকে দেখতে না পেয়ে ভয় পেয়ে যায়। ক্লেটনও তখন ভিড়ের মাঝে এসে নাবিকের হাত থেকে পড়ে যাওয়া রিভলবারটা সকলের অলক্ষ্যে তুলে নিয়ে পকেটে রাখে।
জেন পোর্টার নামে তরুণীটি তখন বলে ওঠে, কে বর্শা ছুঁড়ল?
ক্লেটনও বিস্ময়ে হতবাক হয়ে বনের দিকে তাকাল। তারপর বলল, আমি জোর গলায় বলতে পারি বাদরদলের রাজা টারজান আমাদের লক্ষ্য করছে। বুঝেছি কাকে লক্ষ্য করে সে বর্শাটা ছোড়ে। তা যদি হয় তাহলে বুঝতে হবে সে আমাদের বন্ধু। কিন্তু তোমার বাবা ও ফিলান্ডার কোথায়? যেই হোক, জঙ্গলের মধ্যে সশস্ত্র একজন কেউ আছে।
অধ্যাপক পোর্টার ও ফিলান্ডারের নাম ধরে জোরে ডাকতে লাগল ক্লেটন। কিন্তু কোন সাড়াশব্দ পেল না। তখন উদ্বেগে বিহ্বল হয়ে ক্লেটন বলল, এখন কি করা উচিত মিস পোর্টার? আমি তোমাকে এই সব গলাকাটা লোকগুলোর কাছে একা রেখে যেতে পারি না। জঙ্গলেও আমার সঙ্গে যেতে পারবে না। অথচ তোমার বাবার অবশ্যই খোঁজ করা উচিৎ। এই গভীর জঙ্গলে আমাদের সকলেরই জীবন বিপন্ন। কিছু মনে করো না, তোমার বাবা ফিরে এলে আমাদের বিপদাপন্ন অবস্থার কথাটা বুঝিয়ে দিতে হবে তাঁকে।
জেন পোর্টার বলল, আমি মোটেই কিছু মনে করব না। এ বিষয়ে আমি তোমার সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত।
ক্লেটন আবার জেনকে বলল, তুমি রিভলবার ব্যবহার করতে পার? আমার কাছে একটা আছে। এইটা নিয়ে তুমি আর এসমারান্ডা কেবিনের মধ্যে অপেক্ষাকৃত নিরাপদে থাকতে পারবে। আমি ততক্ষণে ওঁদের খোঁজ করে আসি।
ক্লেটনের কথামত কেবিনের মধ্যে চলে গেল জেন। ক্লেটন তখন নাবিকদের কাছে গিয়ে একটা রিভলবার চাইল। সে বনের ভিতরে যাবে। আহত নাবিকটা তখনো মরে নি। সে তার সঙ্গীদের বলল, ওকে অস্ত্র দিও না। সেই দীর্ঘদেহী শ্বেতাঙ্গ অফিসারকে খুন করার পর এই নাবিকটাই এখন তাদের ক্যাপ্টেন আর নাবিকদলের নেতা হয়েছে। অন্যান্য নাবিকরা তার বিরোধিতা করতে সাহস পায় নি।
রিভলবারটা না পেয়ে মাটির উপর পড়ে থাকা বর্শাটা হাতে নিয়ে জঙ্গলের ভিতর চলে গেল ক্লেটন। এদিকে জেন আর এসমারাল্ডা কেবিনের দরজা বন্ধ করে ভিতরটা খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। হঠাৎ ঘরের মধ্যে নিটে নরকঙ্কাল দেখতে পেয়ে ভয়ে চীৎকার করে উঠল এসমারাল্ডা।
জেন ভাবতে লাগল এই কঙ্কালগুলো কাদের, কিভাবেই বা তারা এখানে আসে এবং কোন্ অজ্ঞাত আততায়ীর হাতে এরা নিহত হয়।
ক্লেটন জঙ্গলের মধ্যে চলে গেলে ‘এ্যারো’ নামে অপেক্ষমান জাহাজের বিদ্রোহী নাবিকরা সকলে সেই দুটো নৌকায় করে জাহাজে চলে গেল।
আর টারজান জীবনে এক নতুন অভিজ্ঞতা লাভ করেছে। আজ সে অল্প সময়ে এতকিছু দেখেছে যে তার মাথা ঘুরছিল। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যজনক যে বস্তু সে দেখেছে তা হলো সুন্দরী তরুণী জেন পোর্টারের মুখখানা। টারজান বুঝল এই দলের মধ্যে যে সব শ্বেতাঙ্গরা রয়েছে তারা তারই মত মানুষ। তাছাড়া তাদের হাতে কোন অস্ত্র নেই; সুতরাং এর থেকে বোঝা যায় তারা কাউকে খুন করেনি। এবং নাবিকগুলোর মত তারা অন্তত নিষ্ঠুর নয়। অবশ্য সে যদিও দেখেছে যুবকটি তার হাত থেকে রিভলবারটা তরুণীটিকে দিয়েছে তবু তার যুবকটিকে ভাল লেগেছে এবং নিগ্রো মহিলাটি সুন্দরী তরুণীর সঙ্গিনী বলে তাকেও তার ভাল লাগছে।
টারজান যখন দেখল দুবৃত্ত নাবিকগুলো জাহাজে চলে গেছে এবং জেনরা তার কেবিনের মধ্যে নিরাপদে আছে তখন যুবকের অনুসরণ করতে লাগল সে। যুবক কি জন্য বনের মধ্যে গেছে, বৃদ্ধ দু’জনই বা কেন গেছে তা সে কিছুই জানে না। তবু তারা বিপদে পড়তে পারে এই ভেবে গাছের উপর উঠে তাদের খোঁজ করতে গেল।
গাছের ডালে ডালে এগিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই ক্লেটনের দেখা পেল টারজান। দেখল একটা গাছের গায়ে ঠেস দিয়ে ক্লান্ত হয়ে মুখের ঘাম মুছছে ক্লেটন। আর তার অদূরে শীতা বা একটা চিতাবাঘ তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। চিতাবাঘটাকে দেখতে পায়নি ক্লেটন। মাঝে মাঝে সে দু’জন লোকের নাম ধরে চীৎকার করে ডাকছিল। টারজান বুঝল সে সেই দু’জন বৃদ্ধের খোঁজ করছে। চিতা বাঘটাকে দেখতে না পেলে টারজান নিজেই সেই বৃদ্ধের খোঁজ করতে চলে যেত।
শীতা বা চিতাবাঘটা ক্লেটনের উপর ঝাঁপ দেবার জন্য লাফ দিতে না দিতে বাঁদর-গোরিলাদের মত ভয়ঙ্কর একটা চীৎকার করে উঠল টারজান। সেই গর্জন শুনে চিতাবাঘটা লেজ গুটিয়ে একটা ঝোপের মধ্যে ঢুকে পড়ল।
