সেদিন কেবিনে ফিরে এসে সমুদ্রের ধারে অদ্ভুত এক দৃশ্য দেখল টারজান। দেখল স্থল দিয়ে তিন দিকে ঘেরা এক প্রাকৃতিক পোতাশ্রয়ের মত জায়গাটায় সমুদ্রের শান্ত জলের উপর একটা বড় জাহাজ দাঁড়িয়ে আছে। আর বেলাভূমির কাছে দাঁড়িয়ে আছে একটা নৌকা। সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা হলো এই যে একদল শ্বেতাঙ্গ বেলাভূমি আর তার কেবিনটার মাঝখানে ঘোরাফেরা করছে। টারজান একটা গাছের উপর উঠে পাতার আড়াল থেকে লক্ষ্য করতে লাগল ওদের।
শ্বেতাঙ্গ লোকগুলো সংখ্যায় দশজন।
রিভলবারের গুলির আওয়াজ জীবনে প্রথম শুনে আশ্চার্য হয়ে গেল টারজান। কিন্তু কোনরকম ভয় পেল না।
টারজান দেখল, দৈত্যাকার লোকটা একজনের গুলিতে মরে যাবার পর বাকি লোকগুলো নৌকায় করে সেই জাহাজটায় গিয়ে উঠল। জাহাজের ডেকেও আরো কতকগুলো লোক ঘোরাফেরা করছিল।
এই অবসরে টারজান গাছ থেকে নেমে কেবিনে গিয়ে দেখল কারা তার ভিতরে ঢুকে সব জিনিসপত্র তচনচ করে দিয়ে গেছে। তার হঠাৎ কি মনে পড়তেই ছুটে গিয়ে আলমারিটা খুলে দেখল টিনের বাক্সটা ঠিকই আছে। সেই ছোট টিনের বাক্সটাতে ক্লেটনের একটা ফটো আর তার ডায়েরী ছিল যে ডায়েরীর লেখাগুলো সে পড়ে বুঝতে পারেনি।
টারজান কেবিনের জানালা দিয়ে দেখল জাহাজ থেকে একটা নৌকা নামিয়ে আর একদল লোককে চাপানো হচ্ছে তার উপর।
টারজান বুঝতে পারল ওরা নিশ্চয় তীরে এসেই এই কেবিনটায় আশ্রয় নেবে। হঠাৎ সে একটা কাগজ আর পেন্সিল দিয়ে একটা নোটিশের মত লিখে দরজার উপর টাঙ্গিয়ে দিল। তারপর সেই টিনের বাক্সটা, অনেকগুলো তীর আর কাটা নিয়ে বেরিয়ে গেল কেবিন থেকে।
দুটো নৌকায় করে কুড়িজন লোক মালপত্র নিয়ে বেলাভূমির রূপালি বালির স্তূপের উপর নামল। ওদের মধ্যে পনেরজন ছিল নাবিক। তাদের মুখগুলো ছিল শয়তানের মত দেখতে। বেশ বোঝা যাচ্ছিল তারা নোংরা প্রকৃতির আর রক্তপিপাসু। বাকি পাঁচজন ভিন্ন প্রকৃতির মানুষ। এই পাঁচজনের মধ্যে একজন ছিল বয়োবৃদ্ধ। তার মাথার চুলগুলো ছিল সাদা ধবধবে। বৃদ্ধের পিছনে ছিল লম্বা চেহারার এক যুবক, তার পরনে ছিল সাদা পোশাক। আর পিছনে ছিল আর একজন বয়োপ্রবীণ লোক। তার কপালটা খুব উঁচু এবং তার চালচলনের মধ্যে একটা উত্তেজনার ভাব ছিল। ওদের পিছনে ছিল একজন মোটাসোটা চেহারার নিগ্রো মহিলা। জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে সে ভয় পেয়ে গিয়েছিল। তার চোখগুলো ঘুরছিল। নাবিকগুলো যখন তাদের বাক্সপেটরাগুলো নৌকা থেকে নামাচ্ছিল নিগ্রো মহিলাটি তখন তাদের পানে তাকিয়েছিল। সবশেষে নামল উনিশ বছরের এক তরুণী। লম্বা চেহারার যুবকটি তাকে ধরে শুকনো বালির উপর নামিয়ে দিলে মেয়েটি তাকে ধন্যবাদ দিল।
এই পাঁচজনের দলটি নীরবে বেলাভূমি থেকে কেবিনের দিকে এগিয়ে আসতে লাগলো। মনে হলো এই কেবিনে এসে ওঠার ব্যাপারটা আগেই ঠিক হয়েছিল। নাবিকরা তাদের মালপত্রগুলো সব কেবিনটার মধ্যেই রেখে দিল।
সহসা দরজার উপর টাঙ্গানো নোটিশটার উপর একজন নাকিবের চোখ পড়তেই বলল, এ আবার কি? এটা ত একটু আগে ছিল না।
তখন অন্যান্য নাবিকরাও সেখানে জড়ো হয়ে ঘাড় উঁচু করে নোটিশটা দেখতে লাগল। বৃদ্ধ অধ্যাপক নোটিশটা জোরে চীৎকার করে পড়তে লাগল। এই বাড়িটা টারজনের। টারজান বহু পশু আর কৃষ্ণকায় ব্যক্তির হত্যাকারী। টারজনের কোন জিনিসপত্র নষ্ট করবে না। সে সবকিছু লক্ষ্য রাখছে। বাঁদর-দলের রাজা টারজান।
নাবিকটা তখন বলে উঠল, কে এই শয়তান টারজান?
যুবকটি বলল, সে নিশ্চয় কোন ইংরেজ।
তরুণী মেয়েটি বলল, কিন্তু বাদর দলের রাজা টারজান কথাটার মানে কি?
যুবকটি বলল, তা ত জানি না মিস পোর্টার। আপনি কি বলেন অধ্যাপক পোর্টার?
অধ্যাপক আর্কিমেদিস পোর্টার চশমাটা ঠিক করে বললেন, খুবই উল্লেখযোগ্য ব্যাপার। কিন্তু আমি যা বলেছি তার বেশি ত কিছু বলতে পারব না ঘটনাটা ব্যাখ্যা করে।
তরুণীটি বলল, কিন্তু বাবা, তুমি ত কিছুই বলনি এ বিষয়ে।
অধ্যাপক পোর্টার বললেন, থাম থাম বাছা। এই সব সমস্যামূলক ব্যাপার নিয়ে তোমার ছোট্ট মাথাটা ঘামিও না।
এই বলে তিনি তাঁর পায়ের তলার মাটিটার দিকে তাকিয়ে তাঁর পিছনের দিকে কোটের কোণটা ধরলেন।
ইঁদুরমুখো নাবিকটা তখন বলল, এই বুড়োটা আমাদের থেকে বেশি কিছুই জানে না।
নাবিকটার অপমানজনক কথায় রেগে গিয়ে যুবকটি বলল, তুমি যদি অধ্যাপক পোর্টার আর মিস পোর্টারের সঙ্গে দ্র ব্যবহার না করো তাহলে আমার হাতে বন্ধুক না থাকলেও তোমার ঘাড়টা শুধু হাতে ভেঙ্গে দেব।
নাবিকটা এবার যুবক ক্লেটনের পিছন দিকে তাকিয়ে তার রিভলবারের ঘোড়াটার উপর হাত রাখল।
এতক্ষণ ওরা কেউ দেখতে পায়নি ওদের সকলের অলক্ষ্যে অগোচরে একজন অদূরে একটা গাছের উপর পাতার আড়ালে বসে ওদের সব কাজকর্ম লক্ষ্য করছে। টারজান যখন প্রথম দেখে একটা নাবিক রিভলবার থেকে গুলি করে একজন লম্বা শ্বেতাঙ্গকে হত্যা করে তখনই সে নাবিকটার এই বর্বর আচরণে রেগে যায়। তারপর যখন দেখল সেই নাবিকটা আবার ক্লেটন নামে এক সুদর্শন শ্বেতাঙ্গ যুবককে হত্যা করার জন্য তার রিভলবারে হাত দিয়েছে তখন আর থাকতে পারল না।
টারজান তখন তার হাতের বর্শাটা সেই উদ্ধত নাবিকটাকে লক্ষ্য করে সজোরে ছুঁড়ে দিল। বর্শাটা গিয়ে নাবিকটার একটা কাঁধ গভীরভাবে বিদ্ধ করল।
