একবার ট্যানা নামে একটা মেয়ে-বাঁদর এসে তার স্বামী গান্টোর বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাল টারজনের কাছে। গান্টো তাকে মেরেছে, কামড়ে দিয়েছে। গান্টোকে ডাকল সে এসে বলল ট্যানা বড় কুঁড়ে, সে তার স্বামীকে মোটেই দেখে না, ফল-মাকড় এনে দেয় না। টারজান দু’পক্ষের কথা শুনে বিচার করে তাদের দুজনকেই তিরস্কার করল। গান্টো যেন তার স্ত্রীকে আর না মারে, মারলে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে তাকে আর ট্যানাও যেন কর্তব্যকর্ম ঠিকমত করে চলে।
এই সব ছোটখাটো ঝগড়া বিবাদ লেগেই থাকে দলের মধ্যে। টারজান এতে বিরক্তি বোধ করে। তার কেবলি মনে হয় দলের অধিপতি হয়ে দলের সঙ্গে সঙ্গে সব সময় থাকা মানেই তার ব্যক্তিস্বাধীনতাকে খর্ব করে ক্ষুণ্ণ করে চলা। তাছাড়া তার কেবিনটা আর আশপাশের জায়গাটাকে বড় ভাল লাগল তার। নির্জন উপকূল, সূর্যালোকিত সমুদ্রের অনন্ত জলরাশি, কেবিনটার ভিতরের পরিচ্ছন্নতা, তারপর অসংখ্য বই-এর এক বিস্ময়কর জগৎ–এই সব কিছুর জন্য মনটা তার ব্যাকুল হয়ে থাকত সব সময়।
একদিন সমুদ্রের ধারে শুয়ে ছিল টারজান। টারজনের কাছ থেকে কিছু দূরে টারক তাদের দলের একটা বুড়িকে তার চুলের মুঠি ধরে খুব জোর মারছিল আর বুড়িটা চীৎকার করছিল।
টারজ যখন দেখল টারজান তার তীর ছাড়াই শুধু হাতেই এগিয়ে আসছে তার দিকে, তখন সে তার প্রভুত্বকে অস্বীকার করে ইচ্ছা করে আরো বেশি করে বুড়িটাকে পীড়ন করতে লাগল।
তারপর জোর লড়াই চলতে লাগল দু’জনের মধ্যে। টারজ তার বুকে আর মাথায় অনেকগুলো ছুরির আঘাত খেল। আর টারজও তার দাঁত আর নখ দিয়ে টারজনের দেহের অনেক জায়গায় ক্ষত করে দিল। তার মাথার নিচে কপালের কাছে অনেকখানি চামড়া কেটে গিয়ে চোখের উপর ঝুলতে লাগল এমনভাবে যে সে ভাল করে দেখতে পাচ্ছিল না। এক সময় দু’জনে গড়াগড়ি খেতে লাগল। অবশেষে। টারজান টারকজের পিঠের উপর বসে তাকে বেকায়দায় ফেলে তার মাথাটা ধরে তার বুকের উপর। নোয়াতে লাগল আর একটু চাপ দিলে তার ঘাড়টা ভেঙ্গে যেত এবং টারজ মারা যেত।
টারজান অনেক ভেবে টারজকে বাঁচিয়ে উচিত শিক্ষা দেবার জন্য তার ঘাড়টা বুকের উপর নুইয়ে বলল কা গোদা? তার মানে তুমি এবার হার মানছ?
এক ভয়ঙ্কর যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠল টারকজ। বলল, ‘কা গোদা। অর্থাৎ হার মানছি।
এবার চাপ কিছু কমিয়ে দিল টারজান। কিন্তু একেবারে মুক্তি দিল না টারজকে। বলল, শোন আমি হচ্ছি বাদরদলের রাজা, বিরাট শিকারী, বিরাট যোদ্ধা। সারা জঙ্গলের মধ্যে আমার চেয়ে বড় আর কেউ নেই। তুমি হার মেনেছ আমার কাছে। দলের সবাই তা শুনেছে। আর কখনো তোমার রাজার সঙ্গে বা দলের আর কারো সঙ্গে ঝগড়া করো না। যদি তা করো তাহলে এর পরের বার তোমাকে মেরে ফেলব। বুঝলে?
টারজ বলল, হুঁ।
এবার বাঁদরদলের দিকে তাকিয়ে টারজান বলল, তোমরা এতে সন্তুষ্ট?
সকলেই সমবেতভাবে উত্তর দিল, হুঁ।
টারজান এবার টারজকে ধরে তুলে দিল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সকলে যে যার কাজে চলে গেল। যেন কিছুই হয়নি।
কিন্তু বাঁদরদলের সকলের মনে এই বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়ে রইল যে টারজান এক বিরাট যোদ্ধা আর এক অদ্ভুত প্রাণী। শত্রুকে বধ করার ক্ষমতা তার থাকা সত্ত্বেও তাকে ছেড়ে দিয়েছে।
সেদিন সন্ধ্যার কিছু আগে দলের পুরুষ বাঁদরদের সকলকে এক জায়গায় ডেকে টারজান বলল, আজ তোমরা সকলে নিজের চোখে দেখেছ টারজান তোমাদের সবার থেকে বড়, সবচেয়ে শক্তিশালী।
তারা একবাক্যে সবাই বলল, হুঁ। টারজান সত্যিই মহান।
টারজান আরও বলল, টারজান কিন্তু তোমাদের মত বাঁদর নয়। তার জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ আলাদা। সে তার জাতির লোকদের খোঁজে দূরে চলে যাবে সমুদ্রের ধার দিয়ে। তোমরা তোমাদের রাজাকে বেছে নাও দলের ভিতর থেকে। কারণ টারজান আর ফিরবে না।
এইভাবে শ্বেতাঙ্গদের সন্ধানে একা বেরিয়ে পড়ল যুবক টারজান।
বেশ কয়েকদিন ধরে কেবিনটাতেই সব সময় থেকে বিশ্রাম করতে লাগল টারজান।
দশ দিন পরেই সুস্থ হয়ে উঠল টারজান। শুধু চোখের কাছে কপালের ক্ষতটা রয়ে গেল।
টারকজের সঙ্গে লড়াইয়ে আহত হবার পর আবার দেহে শক্তি ফিরে পেয়েছে।
একদিন টারজান দেখল কতকগুলো কৃষ্ণকায় লোক বনের ভিতর দিয়ে উধ্বশ্বাসে ছুটতে ছুটতে পালাচ্ছে। কিন্তু তারা দেখতে পেল না টারজান কখন তাদের গতিপথে মাথার উপর একটা গাছের ডালের উপর উঠে ওৎ পেতে বসে আছে।
টারজান প্রথম দু’জনকে গাছের তলা দিয়ে চলে যেতে দিল। কিন্তু তৃতীয় লোকটাকে গাছের তলায় এলেই তার দড়ির ফাঁসটা লোকটার গলায় আটকে দিয়ে তাকে গাছের উপর তুলতে লাগল। লোকটার সঙ্গীরা পিছন ফিরে তা দেখে ভয়ে পালিয়ে গেল। টারজান তখন তাড়াতাড়ি লোকটাকে বধ করে তার অস্ত্র ও গয়নাগুলো নিয়ে নিল। তারপর তার কোমর থেকে হরিণের চামড়াটা ছাড়িয়ে নিয়ে নিজে পরল। তাকে সত্যিই মানুষের মত সুন্দর দেখাচ্ছে। এবার তার ইচ্ছে হলো তার এই পোশাকটা বাঁদরদলের সবাইকে দেখায়।
টারজান এবার মৃতদেহটাকে কাঁধে করে গাঁয়ের গেটটার কাছে নিয়ে গিয়ে ফেলে দিল। তারপর সে সেই গাছতলাটায় গিয়ে অনেকগুলো তীর নিয়ে বনদেবতার উদ্দেশ্যে রেখে দেওয়া খাবার খেয়ে চলে এল। এই ভাবে তার কাজ হাসিল করে কেবিনে ফিরে এল টারজান।
