কার্চাক তখন সদম্ভে আহ্বান জানাল টারজানকে। বলল, নেমে এস টারজান। শক্তিশালী যোদ্ধারা কখনো শত্রুর ভয়ে গাছে উঠে থাকে না।
ধীরে ধীরে গাছ থেকে নেমে পড়ল টারজান। কার্চাক তার দিকে এগিয়ে যেতেই দলের সবাই গাছের উপর এক একটা নিরাপদ জায়গা থেকে দেখতে লাগল। সাত ফুট লম্বা কাৰ্চাকের বিশাল দেহটার উপর তার ছোট মাথাটা একটা গোলাকার বলের মত দেখাচ্ছিল। হাঁ করে দাঁতগুলো বার করে সে গর্জন করতে লাগল।
টারজনের হাতে তখন একমাত্র ছুরি ছাড়া আর কোন অস্ত্র ছিল না। তার তীর ধনুকটা একটু আগে কিছুটা দূরে নামিয়ে রেখেছে। কারণ সে তখন সিংহীর চামড়াটা সবাইকে দেখানোর জন্য ব্যস্ত ছিল।
যাই হোক, খাপ থেকে ছুরিটা বার করে এগিয়ে আসা কার্চাকের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল টারজান। কার্চাক দুটো হাত বাড়িয়ে তাকে ধরতে এলে সে একটা হাত ঝটকা মেরে ছাড়িয়ে তার ছুরিটা আমূল বসিয়ে দিল কার্চাকের বুকের উপর হৃৎপিণ্ডটার একটু নিচে। কিন্তু ছুরিটা তার বুক থেকে তুলতে পারল না টারজান। সেটা তেমনি বুকের উপর গাঁথাই রয়ে গেল। কারণ কাৰ্চাক তখন দাঁত বার করে টারজনের ঘাড়ের উপর একটা কামড় বসাতে যাচ্ছিল। দু’জনে পরস্পরকে বধ করার জন্য প্রাণপণ লড়াই করে যাচ্ছিল।
কিন্তু টারজনের ছুরিটা কাৰ্চাকের বুকে আমূল তখনো বসে থাকায় কার্চাকের শক্তি প্রায় কমে আসছিল। সে যতবার দু’হাত দিয়ে টারজনের দেহটাকে জড়িয়ে ধরতে যাচ্ছিল, ততবারই টারজান ঘুষি মেরে সরিয়ে দিচ্ছল কাৰ্চাককে। অবশেষে কাৰ্চাকের দেহটা শক্ত হয়ে বুকে ছুরি সমেত লুটিয়ে পড়ল মাটিতে।
টারজান তখন কার্চাকের বুক থেকে ছুরিটা বার করে তার মৃতদেহের উপর একটা পা তুলে দিয়ে তার বিজয়োল্লাসের দ্বারা সমস্ত বনভূমিকে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত করে তুলল সে। এইভাবে প্রথম যৌবনেই বদর দলের রাজা হয়ে উঠল টারজান।
দলের মধ্যে আর একজন ছিল যে ‘টারজনের প্রভুত্বকে মানতে চাইত না। সে হলো তুবলাতের ছেলে টারজ। কিন্তু টারজনের ধারাল চকচকে ছুরিটাকে দারুণ ভয় করত সে।
টারজান জানত কাৰ্চাকের মত টারজও সুযোগ খুঁজছে তার উপর প্রতিশোধ নেবার জন্য। সুযোগ পেলেই প্রভুত্বটা ছিনিয়ে নেবে তার কাছ থেকে।
একমাত্র দলপতির পরিবর্তন ছাড়া কয়েক মাস ধরে আর কোন ঘটনা ঘটেনি দলের মধ্যে। প্রায় দিন রাত্রিতে টারজান তার দলের সবাইকে দলপতি হিসাবে সেই নিগ্রোদের গায়ের সামনের মাঠটায় নিয়ে যেত। সেখানে গিয়ে বাঁদরগুলো পেট ভরে ফসল খেত।
এই সময় টারজানও মাঝে মাঝে সেই গাঁয়ের ধারে গাছতলাটায় গিয়ে বিষমাখানো তীর চুরি করে নিয়ে আসত। গাছতলায় জঙ্গলের দেবতাদের উদ্দেশ্যে নিবেদিত যা খাবার থাকত টারজান তার কিছুটা খেত।
গাঁয়ের লোকেরা যখন দেখত গাছতলায় নামানো খাবার রাতের মধ্যে এসে খেয়ে গেছে, তখন তারা ভাবত নিশ্চয়ই দেবতা স্বয়ং এসেছিল। ভাবত রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে যাওয়া তীরগুলোও সেই দেবতাই হয়ত নিয়ে যায়। তখন তাদের কুসংস্কারাচ্ছন্ন মনে ভয়ের মাত্রা আরো বেড়ে যায়। দলপতি মবঙ্গা তখন ভয়ে অন্য কোথাও সরে যাবার কথা ভাবে।
কিছুকাল সমুদ্রের উপকূলের ধারে বাঁদর-দলটা বাস করতে লাগল। কারণ তাদের দলপতি টারজান কেবিনটার কাছাকাছি থাকতে ভালবাসত। কিন্তু একদিন যখন তারা দেখল একদল কৃষ্ণকায় লোক কোথা থেকে এসে সেখানে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপনের জন্য কতকগুলো কুঁড়েঘর তৈরি করছে তখন তারা আবার এমন এক নতুন জায়গায় চলে গেল যেখানে মানুষ যায় না।
সেই গাঁ থেকে শিকারের জন্য তীর চুরি করে আনা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ল টারজনের পক্ষে। কারণ আগে যেখানে তীর রাখত প্রায়ই তীর চুরি হওয়ার জন্য সেখানে আর তীর রাখে না তারা। অন্য এক গোপন জায়গায় কোন ফসলের স্তূপের মধ্যে লুকিয়ে রাখে। তার জন্য টারজান একদিন সমস্তক্ষণ একটা গাছের উপর পাতার আড়ালে লুকিয়ে রইল। তীরগুলোতে বিষ মাখিয়ে কোথায় তারা রাখে তা দেখে নিল।
এরপর দু’বার রাত্রিকালে সেই গায়ে একটা কুঁড়ে ঘর থেকে বেশকিছু তীর চুরি করে নিয়ে এল। গাঁয়ের সশস্ত্র যোদ্ধাগুলো সবাই তখন ঘুমোচ্ছিল। যে ঘরে তীর ছিল সে ঘরেও কিছু লোক ঘুমোচ্ছিল। টারজান নিরাপদে সেখান থেকে তীর নিয়ে বেরিয়ে এলেও সে বুঝল এ কাজ বিপজ্জনক এবং বার বার তা করা উচিত নয়। তাই সে আর রাত্রিতে গাঁয়ের ভিতরে তীর চুরি করতে না গিয়ে পথে কোন নিগ্রো শিকারীকে দেখতে পেলে গাছের উপর থেকে তার গলায় ফাঁস লাগিয়ে তাকে বধ করে তার অস্ত্রগুলো সব কেড়ে নিত। অনেক সময় সেই সব মৃতদেহগুলো গলায় ফাঁস লাগা অবস্থায় গাঁয়ের পথে ফেলে রেখে দিত।
টারজনের কেবিনের কাছাকাছি যেসব নিগ্রোরা অন্য জায়গা থেকে এসে বসতি স্থাপন করে তারা কেবিনটাকে দেখতে পায়নি। তবু টারজান প্রায়ই ভয় করত, তারা যে কোন সময়ে কেবিনটাকে দেখতে পেলেই তার ভিতরকার জিসিনপত্র সব লুটপাট করে নিয়ে যাবে। এজন্য সে দল ছেড়ে প্রায়ই কেবিনের ভিতরে অথবা তার কাছে কাছে থাকত। ফলে দলপতি হিসাবে তার কাজকর্মে অবহেলা হতে লাগল। বাঁদর-দলের মধ্যে প্রায়ই ঝগড়াঝাটি হয়, বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় এবং দলপতিকেই তা মেটাতে হয়। কিন্তু টারজান প্রায়ই অন্যত্র থাকায় দলের মধ্যে ঝগড়া বিবাদ সব অমীমাংসিত রয়ে যায়। এ নিয়ে একদিন দলের কয়েকজন প্রবীণ সদস্য টারজনের কাছে অভিযোগ জানাল। তাদের কথা মেনে নিয়ে একটা মাস টারজান দলের সঙ্গে সঙ্গে থেকে কাটাল।
