এবার টারজান দেখল বন্দীকে গায়ের মাঝখানে এক জায়গায় মবঙ্গার ঘরের সামনে একটা লম্বা খুঁটি পুঁতে তার সঙ্গে বেঁধে রাখল গাঁয়ের লোকেরা। তারপর বন্দীকে ঘিরে ছুরি বর্শা প্রভৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে এক নাচের উৎসবের আয়োজন করতে লাগল। মেয়েরা পুরুষ যোদ্ধাদের পিছন থেকে ঢাক বাজাতে লাগল। এই উৎসবের প্রস্তুতি দেখে বাঁদর- গোরিলাদের দমদম উৎসবের কথা মনে পড়ে গেল টারজনের। এরপর কি হবে তা বুঝতে পারল। এরপর বন্দীটাকে ওরা পালাক্রমে আঘাত করবে বিভিন্ন অস্ত্র দিয়ে।
হঠাৎ একজনের হাত হতে একটা বর্শা বন্দীর দেহের একটা অংশকে বিদ্ধ করল। তার মানে এটা হলো সংকেত। এরপর পঞ্চাশটা বর্শা বন্দীর কান, নাক, চোখ, হাত, পা প্রভৃতি সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিদ্ধ করল একে একে। বন্দীটার মধ্যে তখনো কিছু চেতনা অবশিষ্ট ছিল। তবু ভয়ঙ্করভাবে পীড়ন চালিয়ে যেতে লাগল তারা তার উপর।
টারজান যখন দেখল গাঁয়ের যত সব সমবেত নরনারীর দৃষ্টি বন্দীটার উপর নিবদ্ধ তখন সে গাছ থেকে বিষমাখানো সব তীরগুলো একটা দড়িতে বেঁধে সেইখানেই রেখে দিল। তারপর তার উপস্থিতিটা তাদের জানিয়ে দেবার জন্য মতলব আঁটতে লাগল।
হঠাৎ কি মনে হতে সেদিন যে কুঁড়েটাতে গিয়েছিল সেই ঘরটাতে চুপি চুপি সকলের অলক্ষ্যে অগোচরে গিয়ে হাজির হলো। অন্ধকার ঘরখানার মধ্যে সে ঢুকতেই একটা মেয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকে একটা রান্নার পাত্র নিয়ে গেল। টারজান একটা দেওয়ালের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর মেয়েটা বেরিয়ে গেলে সে একটা নারকেল নিয়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
আবার সেই গাছতলাটায় গিয়ে পৌঁছল টারজান। তারপর তীরের বান্ডিলটা নিয়ে গাছের একটা উঁচু ডালের উপর উঠে বসল। তারপর যখন দেখল মেয়েরা রান্নার জন্য জল গরম আর লোকগুলো মৃত বন্দীটার মাংস তৈরি করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছে তখন সে সেই নারকেল সজোরে ওদের মাঝখানে। ছুঁড়ে দিল। নারকেলটা ভিড়ের মধ্যে একটা লোকের মাথায় লাগতেই সে মাটিতে পড়ে গেল।
সমবেত জনতা এতে দারুণ ভয় পেয় সকলে ছুটে পালিয়ে গেল আপন আপন ঘরে। আকাশ থেকে অকস্মাৎ একটা নারকেল পড়ায় তাদের কুসংস্কারাচ্ছন্ন মন ভয়ে অভিভূত হয়ে গেল। পরে যখন তারা দেখল বিষমাখানো তীরগুলো কে নিয়ে গেছে আর কড়াইটা সেদিনকার মত উল্টোন অবস্থায় পড়ে আছে তখন তাদের ভয় আরও বেড়ে গেল। তারা ভাবল হয়ত জঙ্গলের দেবতাকে রুষ্ট করেছে কোন ভেবে। তাই তাঁকে তুষ্ট করার জন্য কিছু পূজা উপাচার দিতে হবে। সেই থেকে গাছতলাটায় রোজ কিছু খাবার রেখে দিত সেই বনদেবতার উদ্দেশ্যে।
সেই রাতটা টারজান সেই গাছটা হতে কিছু দূরে কাটাল। তারপর সকাল হতেই সে তাদের ডেরার দিকে রওনা হলো। হঠাৎ টারজান দেখল তার থেকে কুড়ি পা দূরে একটা সিংহী দাঁড়িয়ে আছে। তার হলুদ জ্বলজ্বলে চোখ দুটো টারজনের উপর নিবদ্ধ ছিল।
টারজান এই সুযোগ অনেকদিন ধরে খুঁজছিল। ফাঁসের দড়িটা তার ঘাড়ের উপর ছিল। কিন্তু এবার ফাঁসের দড়ির কোন প্রয়োজন নেই। এবার সে ধনুকে একটা তীর লাগিয়ে ছুঁড়ে দিল সিংহীটা লাফ দেবার আগেই। টারজান পাশে সরে গেল। সঙ্গে সঙ্গে আর একটা তীর ছুঁড়ে দিল। তীরটা সিংহীটার পাছায় লাগল সিংহীটা গর্জন করে ঘুরে টারজানক আক্রমণ করল। টারজান আবার একটা তীর ছুঁড়ল। এই তৃতীয় তীরটা সিংহীটার একটা চোখে লাগল। চোখটা তীরবিদ্ধ হওয়ায় সিংহীটা ক্ষেপে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। টারজনের উপর। টারজান সিংহীটার তলায় পড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে তার ছুরিটা বার করে সিংহীটার পেটে বসিয়ে দিল। ক্রমে টারজান দেখল সিংহীটার দেহটা নিথর হয়ে ঢলে পড়ল।
তার উপর পড়ে থাকা সিংহীটার মৃতদেহ সরিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে একটা পা মৃতদেহের উপর রেখে বিজয়ী পুরুষ বাঁদর-গোরিলার মত উল্লাসে চীৎকার করে উঠল টারজান।
সিংহীর মাংসটা খেতে ভাল নয়। শক্ত আর কেমন বিদঘুঁটে গন্ধ। তবু ক্ষিদের জ্বালায় বেশ কিছুটা খেয়ে চামড়াটা ছাড়িয়ে নিল। তারপর রোদে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল গভীরভাবে। পরের দিন উঠতে দুপুর হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ ধরে বনের মধ্য দিয়ে যাবার সময় হঠাৎ একটা হরিণ দেখতে পেল পথে। হরিণটা টারজানকে দেখতে পাবার আগেই তার একটা বিষাক্ত তীর এসে তার বুকে বিঁধল। সঙ্গে সঙ্গে হরিণটা মরে পড়ে গেল ঝোপের ধারে। আবার পেট ভরে হরিণের মাংস খেল টারজান। কিন্তু এবার আর ঘুমোল না। সোজা ডেরার দিকে এগিয়ে চলল।
দলের সামনে টারজান গিয়েই সিংহীর চামড়াটা তাদের গর্বের সঙ্গে দেখাল। তারপর বলল, শোন কার্চাকের দলের বাদরেরা, দেখ দেখ, বিরাট হত্যাকারী টারজান কি করেছে। তোমাদের মধ্যে নুমাদের দলের কাউকে মারতে পেরেছে? টারজান তোমাদের সব বাঁদরদের মধ্যে শক্তিশালী। টারজান হচ্ছে-’মানুষ’ এ কথাটা বলতে গিয়েও বলল না, কারণ মানুষ কাকে বলে তা বাদরেরা জানে না।
বাদরদলের সবাই টারজনের চারপাশে সমবেত হয়ে তার শক্তির কথা সব মন দিয়ে শুনতে লাগল। একমাত্র কার্চাকে সরে গিয়ে টারজনের প্রতি তার ঘৃণা আর বিদ্বেষটাকে লালন করতে লাগল।
হঠাৎ কার্চাকের মাথায় একটা কুবুদ্ধি খেলে গেল। ভয়ঙ্করভাবে গর্জন করতে করতে তার দলের অনেকগুলো বাদরের উপর একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের কামড়াতে শুরু করে দিল। কয়েকজনকে মেরে ফেলল। তারপর তার প্রধান শত্রু টারজনের খোঁজ করতে লাগল। দেখল টারজান একটা গাছের নিচু ডালে বসে রয়েছে।
