টারজান বুঝল এতক্ষণে ওরা কুলঙ্গার মৃতদেহটা দেখতে পেয়েছে। এবার নিকটবর্তী একটা কুঁড়ে ঘরের দিকে তাকিয়ে দেখল ঘরের দরজাটা খোলা। ভিতরে কি আছে তা দেখার একটা কৌতূহল জাগল তার মনে। তাই সে নিঃশব্দে ঘরটার দরজার সামনে গিয়ে একবার দাঁড়াল। কান পেতে শুনল ঘর থেকে কোন শব্দ আসছে কি না। তারপর সে ঘরের ভিতরে ঢুকে পড়ল। দেখল ঘরটার দেওয়ালে বর্শা, অদ্ভুত আকারের ছোরা প্রভৃতি অনেক অস্ত্র আর ঢাল সাজানো আছে। ঘরের কোণে অনেক ঘাস আর কতকগুলো মাদুর আছে। ঐগুলো হলো ওদের বিছানা।
একটা লম্বা বর্শা নেবার ইচ্ছা হলো টারজনের। কিন্তু সে অনেকগুলো বিষমাখা তীর নিয়ে যাবে বলে এখন আর বর্শা নিয়ে যেতে পারবে না। দেওয়াল থেকে একে একে অস্ত্রগুলো নামিয়ে ঘরের মাঝখানে সেগুলো রেখে তার উপর রান্নার পাত্রটা রেখে তার উপর মড়ার খুলিটা রাখল। সবশেষে কুলঙ্গার মাথার পোশাকটা চাপিয়ে দিল তার উপর। নিজের কাজ দেখে নিজেই হাসল টারজান।
এরপর ঘর থেকে বেরিয়ে সেই গাছতলায় এসে হাজির হলো।
গাছের পাতার আড়ালে এক নিরাপদ আশ্রয়ে বসে ওদের ব্যাপারটা দেখতে লাগল টারজান। দেখল চারজন লোক কুলঙ্গার মৃতদেহটা গাঁয়ের পথ দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
টারজান দেখল জনাকতক লোক ঘরের মধ্যে ঢুকেই সবকিছু দেখে ভয়ে ও বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে কি সব বলাবলি করতে লাগল। মবঙ্গা কি বলতেই কয়েকজন লোক কার খোঁজে গোটা গা খুঁজে তোলপাড় করতে লাগল। এমন সময় সেই গাছতলাটায় ওদের নজর পড়ল। ওরা দেখল। সেই বিষমাখা তীরগুলোর মধ্যে দু’ একটা তীর আছে আর বাকিগুলো রহস্যজনকভাবে উধায় হয়ে গেছে। তার উপর কড়াইটা উল্টোন।
এবার সত্যি সত্যিই ভয় পেয়ে গেল গাঁয়ের লোকেরা। ঘরের কাছে কুলঙ্গার আকস্মিক মৃত্যু, তার ঘরের মধ্যে রহস্যময় রসিকতা, এতগুলি তীরের অপহরণ-একসঙ্গে এই ঘটনাগুলি প্রায় একই সঙ্গে পর পর ঘটে গেছে। অথচ এই সব ঘটনার কোন কারণ তারা অনেক ভেবেও খুঁজে পেল না।
এদিকে তখন বেলা প্রায় দুপুর। সকাল থেকে কিছুই খাওয়া হয়নি তার। তাই গাছের উপর দিয়ে ডালে ডালে তাদের ডেরার দিকে ফিরে যেতে লাগল টারজান। পথের মাঝখানে একবার কুলঙ্গার হাতে মারা সেই শুয়োরটার অবশিষ্ট মাংসটুকু খাবার জন্যও কুলঙ্গার যে তীর ধনুক একটা গাছের উপর লুকিয়ে রেখেছিল তা নেবার জন্য থেমেছিল।
তার দলের কাছে টারজান যখন ফিরে এল তখন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেছে। টারজান যখন কাৰ্চাক আর তার দলের সকলের সামনে অনেক তীর ও একটা ধনুক নামিয়ে তার দুঃসাহসিক অভিযানের কথা বলল তখন তার নিজের বুক গর্বে ও গৌরবে ফুলে উঠল।
তার এই সব গৌরবের কথা শুনে একমাত্র দলনেতা কাৰ্চাকই ক্ষুব্ধ হয়ে মুখ ফিরিয়ে চলে গেল।
পরের দিন তার তীর ধুনক নিয়ে তীর ছোঁড়া অভ্যাস করতে লাগল টারজান। কিন্তু এইভাবে অভ্যাস করতে গিয়ে তার সব তীরগুলো চলে গেল।
টারজনের বাদর দল কেবিনটার আশেপাশে সমুদ্র উপকূলের কাছাকাছি তখন শিকারের সন্ধানে ঘুরে বেড়াত। ফলে টারজান কেবিনটায় ঢুকে নিশ্চিন্তে অনেকক্ষণ কাটাতে পারত। একদিন কেবিনে একটা আলমারির পিছনে একটা ছোট বাক্স পেয়ে গেল টারজান।
বাক্স খুলতেই তার মধ্যে এক যুবকের ছবির সঙ্গে হীরকখচিত একটা সোনার হার আর একটা চিঠি পেল টারজান। ছবিটা ভাল করে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল টারজান। সে জানত না ওটা তার বাবার ছবি। তবে তার মুখের হাসিটা খুব মিষ্টি লাগছিল। লকেটওয়ালা সোনার হারটা দেখেও খুব ভাল লাগল তার। তাই সে তার গলায় সেই সোনার হারটা পরে ফেলল।
এরপর চিঠিটা দেখতে লাগল টারজান। চিঠির অক্ষরগুলো সে চিনতে পারলে জানতে পারত যে ওটা কোন চিঠি নয়, তার বাবার লেখা ডায়েরী। ঐ ডায়েরীর মধ্যে তার জন্মের সমস্ত বৃত্তান্ত লেখা আছে। তার জীবনের সব রহস্য জানতে পারত তার মধ্যে। ডায়েরীটা ফরাসী ভাষায় লেখা।
যাই হোক, সেই ডায়েরীর রহস্য তখন ভেদ করতে না পারলেও একটা সংকল্প তার মনের মধ্যে রয়ে গেল। সে রহস্য একদিন সে ভেদ করবেই।
বর্তমানে তার হাতে এখন গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ আছে। তার তীর সব ফুরিয়ে যাওয়ায় আবার তাকে মবঙ্গাদের সেই গাঁয়ে গিয়ে কিছু তীর চুরি করে আনতে হবে।
পরের দিন সকালেই বেরিয়ে পড়ল টারজান। তারাতাড়ি পা চালিয়ে সেই মাঠটার কাছে পৌঁছে গেল সে। তখনো দুপুর হয়নি। সেদিনকার মত আবার তেমনি করে গাছের উপর ওৎ পেতে লুকিয়ে বসে রইল।
কখন গাঁয়ের লোকেরা সবাই ঘরে চলে যাবে এবং কখন মেয়েটা গাছতলা থেকে চলে যাবে তার সুযোগ খুঁজতে লাগল টারজান। এই সুযোগের অপেক্ষায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে গাছের উপর চুপচাপ বসে রইল।
অবশেষে দিন গিয়ে সন্ধ্যা হলো। মাঠের কাজ সেরে মেয়েরা একে একে ঘরে চলে গেল। গাছতলা থেকে মেয়েটাও গাঁয়ের ভিতরে চলে গেল। গায়ের গেট বন্ধ হয়ে গেল। টারজান দেখল গাঁয়ের ভিতরে প্রতিটি কুঁড়ের সামনে মেয়েরা নানারকম খাবার তৈরি করছে।
হঠাৎ একটা গোলমালের শব্দ শুনতে পেল টারজান। দেখল একদল শিকারী দেরী করে ফিরেছে। তাই বন্ধ গেটের বাইরে চীৎকার করছে। সঙ্গে সঙ্গে গেট খুলে গেল আর তারা ভিতরে ঢুকে পড়ল। টারজান দেখল ওদের সঙ্গে একজন বন্দী ছিল। বন্দীটাকে শিকারদের সঙ্গে দেখতে পেয়েই গাঁয়ের নারী পুরুষ সকলে এক পৈশাচিক আনন্দে চীৎকার করতে লাগল। মেয়েরা লাঠি আর পাথর দিয়ে আঘাত করতে লাগল লোকটাকে। ওদের পাশবিক নিষ্ঠুরতা দেখে অবাক হয়ে গেল টারজান। সে দেখল তার মত যারা মানবজাতি তারাও সিংহী আর চিতাবাঘের মতই নিষ্ঠুর। মানবজাতির প্রতি ঘৃণা হতে লাগল টারজনের।
