জীবনে প্রথম একজন মানুষ দেখল টারজান। কিন্তু কালো চকচকে এমন জীবন্ত মানুষ দেখেনি কখনো।
শুয়োরটা মারা গেল। কুলঙ্গা তখন গাছ থেকে নেমে তার কোমর থেকে একটা ছোরা বার করে মৃত শুয়োরটার গা থেকে মাংস ছাড়িয়ে আগুন জ্বেলে তা পুড়িয়ে খেতে লাগল ইচ্ছামত। তারপর বাকি মাংসওয়ালা মৃতদেহটা সেখানে ফেলে রেখেই চলে গেল সেখান থেকে।
টারজান গাছের উপর থেকে সবকিছু নীরবে নিঃশব্দে দেখে গেল। সে কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে আক্রমণ করল না কুলঙ্গাকে।
কুলঙ্গা চলে গেলে টারজানও গাছ থেকে নেমে এসে বেশ কিছুটা মাংস কাঁচাই খেয়ে নিল। তারপর আবার গাছে উঠে অনুসরণ করে যেতে লাগল কুলঙ্গাকে। সে ভাবল লোকটা যখন বিষাক্ত তীর আর ধনুক পাশে রেখে বিশ্রাম করবে সেই অবসরে তাকে বধ করবে।
সারাদিন ধরে গাছে গাছে এক প্রতিচ্ছায়ার মত কুলঙ্গাকে অনুসরণ করে যেতে লাগল টারজান। দেখল কুলঙ্গা আরও দুবার তার সেই বিষাক্ত তীর দিয়ে একটা হায়েনা আর একটা বাঁদরকে মারল। টারজান ভাবতে লাগল ঐ তীরটার ফলায় নিশ্চয় এমন কিছু রহস্যময় বিষ মাখানো আছে যা কোন জীবের রক্তে লাগার সঙ্গে সঙ্গে তার মৃত্যু ঘটবে।
সে রাত্রিতে একটা গাছের তলায় রাত কাটাল কুলঙ্গা। আর সেই গাছের উপরেই একটা উঁচু ডালে ওৎ পেতে বসে রইল টারজান।
সকালে ঘুম থেকে উঠেই কুলঙ্গা দেখল তার তীর ধনুক নেই। আপেশাশে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও না পেয়ে ভয় পেয়ে গেল। কালাকে মারতে গিয়ে বর্শটা আগেই হারিয়েছে। এবার তীর ধনুকটাও গেল। আছে শুধু একটা ছুরি। তাই সে ভয়ে তার গায়ের দিকে পা চালিয়ে দিল।
টারজান দেখল আর দেরী করা উচিৎ হবে না।
কুলঙ্গাকে অনুসরণ করে টারজান গাছের ডালে ডালে এগিয়ে চলল। অবশেষে কুলঙ্গার মাথার উপর এসে পড়ল টারজান। এবার হাতের মুঠোয় ফঁসের দড়িটা শক্ত করে ধরল। কুলঙ্গাদের গাঁটা দেখতে পাচ্ছিল। বনটার প্রান্তে একটা মাঠ আর মাঠের ওধারে গাঁ। আর মোটেই দেরী করলে চলবে না।
কুলঙ্গা বন থেকে বার হবার আগেই তার প্রান্তসীমায় একটা গাছের উপর থেকে একটা ফঁসের দড়ি ঝুলতে ঝুলতে তার গলায় এসে আটকে গেল।
তার গলায় ফাঁসটা আটকে যেতেই টারজান এমন কায়দা করে দড়িটা গাছের উপর টেনে ধরল যে কুলঙ্গা মোটেই চীৎকার করতে পারল না। এবার তার দড়িটা গাছের একটা মোটা ডালের সঙ্গে বেঁধে দিয়ে নিজে নেমে গেল। তারপর তার কোমর থেকে ছুটিরা বার করে সেটা কুলঙ্গার বুকের উপর আমূল বসিয়ে দিল। এইভাবে তার মা কালার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিল সে।
কিন্তু কুলঙ্গার মৃতদেহ থেকে ছুরি দিয়ে মাংস কাটার জন্য উদ্যত হয়েও তা কাটতে পারল না টারজান।
যাই হোক, কুলঙ্গার মৃতদেহটা ফেলে রেখে গাছে উঠে ফাঁসের দড়ি খুলে দড়িটা হাতে নিয়ে সেখান থেকে গাছের ডালে ডালে পা চালিয়ে চলে গেল টারজান।
একটা উঁচু গাছের উপর থেকে কুলঙ্গাদের গাঁ-টা ভাল করে দেখল টারজান। দেখল বন আর গাঁয়ের মাঝখানে একটা মাঠ থাকলেও বনের দিকটা পাশ দিয়ে গিয়ে স্পর্শ করেছে গাটাকে। সেই গাঁয়ে যারা থাকে তারাও কুলঙ্গার মত মানুষ। সেই সব মানুষদের জীবনযাত্রা জানার এক কৌতূহল অনুভব করল টারজান।
বনের যেদিকটা মাঠটার পাশ দিয়ে গায়ের কাছ পর্যন্ত চলে গেছে, বনের সেই দিকটা দিয়ে মবঙ্গাদের গায়ের কাছে চলে গেল টারজান।
বনটার শেষ প্রান্তে একটা বিরাট বড় গাছের উঁচু ডালের উপর বসে গা-টা দেখতে লাগল টারজান।
উলঙ্গ শিশুরা গায়ের পথে পথে খেলা করে বেড়াচ্ছিল। মেয়েদের অনেকে শুকনো কলাগাছগুলো পাথরে পেষাই করছিল। অনেকে আবার ময়দা থেকে কেক তৈরি করছিল।
শুকনো ঘাস দিয়ে তৈরি একধরনের মাদুরের মত জিসিন মেয়েদের কোমর থেকে হাঁটুর উপর পর্যন্ত ঢাকা ছিল। তাদের পায়ে হাতে বুকের উপর পিতল আর তামার গয়না ছিল। গলায় ছিল তারের হার। অনেক মেয়ের নাকে আবার আংটির মত একটা গয়না ছিল।
জীবনে এই প্রথম মেয়ে মানুষ দেখল টারজান।
টারজান দেখল নারীরাই একমাত্র কাজ করছে। মাঠে চাষের কাজ এবং ঘর সংসারের কাজ সব মেয়েরাই করছে। পুরুষের কোথাও সে কাজ করতে দেখল না।
এরপর টারজান দেখল যে গাছের উপর সে চেপেছিল তার ঠিক তলায় একটা মেয়ে কি করছিল। তার পাশে অনেকগুলো তীর ছিল। তার সামনে জ্বলন্ত আগুনের উপর কড়াইয়ে লালমত কি এক জিনিস ফুটছিল। মেয়েটি একটি করে তীর তুলে নিয়ে তার সূচলো মুখটা সেই কড়াইয়ের মধ্যে একবার করে ডুবিয়ে পাশে এক জায়গায় রেখে দিচ্ছিল।
এবার টারজান সামান্য একটা তীর কিভাবে ছোঁড়ার সঙ্গে সঙ্গে জন্তুর মৃত্যু ঘটায় তার রহস্যটা বুঝতে পারল।
বিষমাখা ঐ সব তীরের কয়েকটা নিয়ে যাবার ইচ্ছা হলো টারজনের। টারজান যখন এবিষয়ে একটা করিকল্পনা খাড়া করার চেষ্টা করছিল, এমন সময় হঠাৎ একটা জোর চীৎকার শুনতে পেল সে। যেদিক। থেকে চীৎকারের শব্দটা আসছিল সেদিকে তাকিয়ে সে দেখল যে গাছের তলায় সে কুলঙ্গাকে মেরেছিল সেইখানে একটা নিগ্রো যোদ্ধা দাঁড়িয়ে তার মাথার উপর বর্শাটা সঞ্চালিত করতে করতে খুব জোরে চীৎকার করছে।
মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত গা-টায় হৈ-চৈ পড়ে গেল। টারজান দেখল গাঁয়ের কুঁড়েঘরগুলোর ভিতর থেকে অসংখ্য সশস্ত্র যোদ্ধা ফাঁকা মাঠটা পার হয়ে ছুটে যেতে লাগল সেই গাছতলাটার দিকে। তাদের পিছনে যেতে লাগল গায়ের যতসব বৃদ্ধ, নারী আর শিশু।
