টারজনের আশা সবটা পূরণ হলো না তবু সিংহীটার গলায় ফাঁস লাগাতে পারার জন্য গর্ব অনুভব করতে লাগল। সে দলের কাছে ফিরে গিয়ে সবার সামনে কথাটা বলল। কথাটা শুনে তার ঘোর শত্রুরাও মুগ্ধ হয়ে গেল তার সাহস আর বীরত্বে। বিশেষ করে কালা আনন্দ ও গর্বের আতিশয্যে নাচতে লাগল।
সে সময় কার্চাকের গোরিলাদলটা কেবিনের কাছাকাছি বনাঞ্চলটায় বাস করছিল।
অনেকে বলত একটা হাতির সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিল টারজনের। হাতিকে বাঁদর দলের সবাই ‘ট্যান্টর’ বলত। সিংহীকে তারা যেমন বলত ‘স্যাবর’ আর সিংহকে বলত নুমা’। অনেকে নাকি চাঁদের আলোঝরা বনভূমিতে একটা হাতির পিঠে পেচে বেড়াতে দেখেছে টারজানকে। কিন্তু কিভাবে সে বন্ধুত্ব হলো তা কেউ বলতে পারেনি। সেই হাতিটা ছাড়া বনের অন্য জন্তু শত্রু ছিল না তার। তবে অবশ্য তার বাঁদর দলের মধ্যে এখন আর কেউ বিশেষ কোন শত্রুতা করে না তার সঙ্গে।
টারজান আঠারো বছর বয়সে পড়তেই কেবিনে যেসব বই ছিল তা গড় গড় করে পড়তে পারত। সে তাড়াতাড়ি লিখতেও শিখে ফেলল। মুখে উচ্চারণ বা ইংরাজি শব্দ পড়তে না পারলেও সে মনে মনে। ইংরাজি পড়ে বুঝতে ও লিখতে পারত।
কিন্তু একদিন টারজান যখন তার বাবার কেবিনটার মধ্যে বই পড়ায় ব্যস্ত ছিল তাদের বাসস্থানের পূর্ব প্রান্তে পঞ্চাশজন কৃষ্ণকায় সশস্ত্র নিগ্রো কোথা থেকে এসে হাজির হয়। তাদের কপালে ছিল তিনটে করে রঙীন সমান্তরাল রেখার উল্কি আর বুকে ছিল তিনটে করে বৃত্ত। তাদের হাতে ছিল বর্শা আর তীর ধনুক। আসলে তারা আগে থাকত একটা দূর গাঁয়ে। সেই অঞ্চলে একদল শ্বেতাঙ্গ কিছু নিগ্রোসেনা নিয়ে রবার আর হাতির দাঁতের খোঁজে তাদের সেই গাঁ আক্রমণ করে। তখন তারা একজন শ্বেতাঙ্গ অফিসার আর কিছু নিগ্রো সেনাকে নিহত করে। কিন্তু পরে শ্বেতাঙ্গদের এক বিরাট সেনাদল এসে পড়ায় তারা। তাদের সেই গা ছেড়ে আরও ভিতরে চলে এসে এক নতুন বস্তী গড়ে তোলে ওরই মধ্যে একটা ফাঁকা। জায়গায়। সেখানে কাছাকাছি রবার গাছ না থাকায় নিশ্চিন্তে বসতি স্থাপন করে সেখানে।
এই নিগ্রোদলের রাজা ছিল মবঙ্গা। একদিন মবঙ্গার ছেলে কুলঙ্গা শিকারের সন্ধানে বর্শা আর তীর ধনুক নিয়ে একাই তাদের বস্তী থেকে পশ্চিম দিকের ঘন জঙ্গলে বেরিয়ে পড়ে। সেদিন রাত্রিতে একটা গাছের উপর শুয়ে রাত কাটায় কুলঙ্গা। সেখান থেকে পশ্চিমে তিন মাইলের মধ্যে কাৰ্চাক তার দলবল নিয়ে বাস করত।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই পশ্চিম দিকে আবার যাত্রা শুরু করল। তখন টারজান একা একা দল ছেড়ে কেবিনের দিকে চলে গেল। আর দলের সবাই দু’তিনজন করে এক একটি দলে বিভক্ত হয়ে আহার সংগ্রহের জন্য এখানে সেখানে ঘুরে বেড়াতে লাগল। কালা তখন একা একা খাবার জন্য পুরনো পচা কাঠ আর পোকামাকড় সংগ্রহ করতে করতে কিছুটা পূর্ব দিকে গিয়ে পড়েছিল।
হঠাৎ অদ্ভুত একটা শব্দ শুনে সচকিত হয়ে উঠল কালা। দেখল তার সামনে পায়ে চলা বনপথটার প্রান্তে একটা ভয়ঙ্কর মূর্তি ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে তার দিকে। আসলে লোকটা ছিল কুলঙ্গা। এই ধরনের মানুষের মূর্তি এর আগে তারা দেখেনি কখনো।
কালা কিন্তু সেখানে আর না দাঁড়িয়ে পিছনে তার দলের কাছে ফিরে যাবার জন্য পা বাড়াল। কিন্তু বেশিদূর যেতে পারল না কালা। কুলঙ্গার হাত থেকে ছাড়া একটা বর্শার বিষাক্ত ফলক তার পাশ দিয়ে চলে গেল। কালা তখন ঘুরে তার আক্রমণকারীকে আক্রমণ করল। তার চীৎকারে তার দলের সবাই ছুটে এল তার কাছে।
এদিকে কুলঙ্গার নিক্ষিপ্ত বর্শাটা ব্যর্থ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে একটা বিষাক্ত তীর তার ধনুক থেকে ছুঁড়ে দিল। তীরটা কালার বুকে এসে লাগলে যন্ত্রণায় আর্তনাদ করতে করতে তাদের দলের সকলের। সামনেই পড়ে গেল কালা।
বাঁদর-গোরিলাগুলো কুলঙ্গাকে দেখতে পেরে তাড়া করল একযোগে। কিন্তু সে হরিণের মত তীব্র বেগে ছুটে পালিয়ে গেল। তাদের চোখ থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল মুহূর্তে। ফলে কিছুক্ষণ পর বাঁদরগুলো ব্যর্থ হয়ে ফিরে এল। কালার প্রাণবায়ু তখন তার দেহ ছেড়ে চলে গেছে।
এদিকে বাঁদরদলের বিরাট চেঁচামেচির সঙ্গে আর্তনাদের মত একটা ধ্বনি শুনতে পেয়ে টারজান তার কেবিন থেকেই বুঝতে পেরেছিল একটা বিপদ ঘটেছে তার দলে। তাই সে উধ্বশ্বাসে ছুটে এল তাদের কাছে। এসে দেখল কালার মৃতদেহটার চারদিকে সবাই দাঁড়িয়ে আছে ভিড় করে।
শোক আর দুঃখের সীমা পরিসীমা রইল না টারজনের।
দুঃখের প্রথম আঘাতটা কোনরকমে কাটিয়ে উঠে কালার মৃত্যু সম্পর্কে খোঁজ খবর নিতে লাগল টারজান। কে মেরেছে, হত্যাকারী কোনদিকে পালিয়েছে তা জেনে নিয়ে আর না দাঁড়িয়ে গাছের উপর উঠে ডালে ডালে এগিয়ে চলল টারজান সেই পলাতক হত্যাকারীর সন্ধানে। তার কোমরে ছিল কেবিনে পাওয়া সেই ছুরিটা আর তার কাঁধের উপর ঝোলানো ছিল সেই ফাঁসের দড়ি।
গাছে গাছে অনেক দূর যাওয়ার পর টারজান একটা ছোট নদীর ধারে মাটির উপর একবার নামল। মাটির উপর পায়ের দাগ দেখে বুঝতে পারল পলাতক হত্যাকারী তারই মত মানুষ এবং একটু আগে সে এখান থেকে গেছে।
এইভাবে মাইলখানেক যাবার পর টারজান গাছের উপর থেকে অদূরে একটা ফাঁকা জায়গায় তীর ধনুক হাতে কৃষ্ণকায় একটা লোককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। তার সামনে দাঁত বার করে তাকে আক্রমণ করার উদ্যোগ করছিল একটা বনশুয়োর, ওরা যাকে ‘হোর্তা বলে।
