তাকে অন্য কেউ লক্ষ্য না করলেও একজন করল। সে হলো তুবলাত। তুবলাত প্রথম দিকেই একতাল মাংস ছিঁড়ে এনে ভিড় থেকে একটু দূরে নির্জনে বসে খাচ্ছিল তা। পরে আর একতাল মাংস আনার মতলব করছিল যখন তখন হঠাৎ দেখতে পেয়ে গেল টারজানকে। দেখল বড় একটা মাংসের তাল নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে টারজান।
তার রক্ত-লাল চোখগুলো বড় বড় করে ঘৃণাভরে টারজনের পানে তাকিয়ে তাকে তেড়ে গেল তুবলাত। তখন মারামারি বা ঝগড়া বিবাদ করার কোন প্রবৃত্তি ছিল না টারজনের। সে তাই মাংস নিয়ে মেয়েদের দলে গিয়ে লুকোবার চেষ্টা করছিল। কিন্তু তুবলাত খুর দ্রুত তার দিকে ছুটে যাওয়ায় লুকোতে পারল না সে। লুকোতে না পেরে সে একটা গাছের ডাল ধরে তার উপরে উঠে পড়ল। মাংসটা দাঁতে কামড়ে ধরে গাছটার সবচেয়ে উপরের ডালে উঠে গেল। কিন্তু দেহটা অত্যধিক ভারী হওয়ার জন্য বৃদ্ধ তুবলাত সেখানে উঠতে পারল না।
তুবলাত তখন রাগে গর্জন করতে করতে ক্ষেপে গিয়ে গাছ থেকে মাটিতে নেমে এল। সে তখন পাগল হয়ে গেছে। মেয়ে-বাঁদর ও শিশুগুলোকে অতর্কিতে আক্রমণ করে তাদের অনেকের ঘাড়ে দাঁত বসিয়ে একতাল করে মাংস তুলে নিয়েছে। তার ভয়ে তখন মেয়ে পুরুষ ও শিশুবাঁদরগুলো সবাই যে যেখানে পারল ছুটে পালাতে লাগল। সবাই গাছে উঠে পড়ল।
কিন্তু একজন তখনো কোন গাছে উঠতে পারেনি। সে হলো কালা। তুবলাত তখন কালাকে হাতের কাছে পেয়ে তাকেই আক্রমণ করল। কালা একটা গাছের নিচু ডাল ধরে তুবলাতের মাথার উপর উঠে পড়ল। কিন্তু ডালটা অশক্ত থাকায় সঙ্গে সঙ্গে ভেঙ্গে পড়তেই তুবলাতের ঘাড়ের উপর পড়ে গেল কালা।
গাছের উপর তুবলাতের প্রচণ্ড পাগলামির সবকিছুই দেখছিল টারজান। এবার আর সে থাকতে পারল না। সে তীব্র গতিতে গাছ থেকে নেমে তুবলাত মাটি থেকে উঠে কালাকে আক্রমণ করার আগেই কালা আর তুবলাতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়ল বীরবিক্রমে।
তুবলাত এবার তার আকাঙ্খিত শত্রুকে পেয়ে গেল এতক্ষণে। সে তখন বিজয়গর্বে দাঁত বার করে ঝাঁপিয়ে পড়ল টারজনের উপর। কিন্তু টারজান তাকে সুযোগ না দিয়ে এক হাতে তার গলাটা ধরে অন্য হাত দিয়ে ছুরিটা ধরে সেই ছুরি বারবার বসিয়ে দিতে লাগল তুবলাতের বুকে। অবশেষে টারজান দেখল তুবলাতের অসার নিষ্প্রাণ দেহটা জড়পিণ্ডের মত ঢলে পড়ল মাটির উপর।
এবার বাঁদরদলের সকলেই একে একে নেমে এল গাছের আড়াল থেকে। টারজান আর তার ঘোরতর শত্রুর মৃতদেহটার চারদিকে গোল হয়ে দাঁড়াল। টারজান তখন তুবলাতের মৃতদেহের উপর একটা পা রেখে চাঁদের দিকে মুখ তুলে গলা ফাটিয়ে চীৎকার করে তার প্রভুত্ব ঘোষণা করল। তারপর সে দলের সবাইকে লক্ষ্য করে বলল, শোন তোমরা, আমি হচ্ছি টারজান। শত্রুদের যম। আমাকে আর আমার মা কালাকে তোমরা সবাই মান্য করবে। আমার মত শক্তিমান তোমাদের মধ্যে আর একজনও নেই। একথা যেন আমার শত্রুরা মনে রাখে।
কার্চাকের রক্তচক্ষুর দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে তার বুকটা চাপড়ে আর একবার চীৎকার করল টারজান।
তুবলাতের মৃতদেহটা সেখানে সেই উৎসবস্থানেই পড়ে রইল। কারণ ওরা নিজেদের দলের কারো মৃতদেহ খায় না।
মার্চ মাসটা ওদের আহারের সন্ধানে ঘুরে ঘুরে কেটে গেল। কোন কোন গাছের পাতা, বুনো আতাফল, কিছু জীবজন্তু, পাখি, পাখির ডিম, সরীসৃপ জাতীয় কিছু জীব আর পোকামাকড় খেয়ে গোটা মাসটা কাটাল তারা।
সেদিন টারজান একটা গাছের নিচু ডালে বসেছিল। তার নিচেই ছিল একটা সিংহী, টারজান তাকে রাগাবার জন্য একটা আতাফল ছুঁড়ে দিল তার গায়ের উপর। সিংহীটা রেগে গিয়ে মুখ বার করে গর্জন করে উঠল। সে টারজনের চোখে চোখ রেখে তাকাল ভয়ঙ্করভাবে। টারজানও তখন তর স্বরের অনুকরণ করে চীৎকার করল। সিংহীটা তখন ধীরে ধীরে বনের মধ্যে ঢুকে গেল।
কিন্তু সিংহীটাকে বধ করার একটা সংকল্প জাগল টারজনের মাথায়। তার প্রধান কারণ সিংহীটাকে বধ করে তার চামড়া দিয়ে তার নগ্নতাকে ঢাকার জন্য একটা আচ্ছাদন তৈরি করবে সে। কেবিনে সেই ছবির বইটা দেখার পর হতে সে আর বাঁদর-গোরিলাগুলোর মত উলঙ্গ হয়ে থাকতে চায় না।
তাই সিংহীটাকে বধ করার বাসনা এতে বেড়ে গেল তার। কিন্তু টারজনের অস্ত্র বলতে একটা ছুরি আর সেই ফাঁসের দড়ি।
দড়িটা তৈরি হয়ে গেল একদিন নদীর কাছাকাছি একটা পথের ধারে একটা গাছের ডালে শিকারের সন্ধানে গা-ঢাকা দিয়ে বসে রইল টারজান।
অবশেষে পাশের একটা ঝোপ থেকে নিঃশব্দ পদসঞ্চারে সিংহীটা এসে দাঁড়াল সেই গাছটার তলায়।
এদিকে ফাঁসের দড়িটা শক্ত করে হাতের মুঠোর মধ্যে ধরে স্থিরভাবে একটা ব্রোঞ্জমূর্তির মত বসেছিল টারজান। এবার ফাঁসের দড়িটা সিংহীটার মাথার উপর প্রথমে ঝুলিয়ে দিল সে। দড়িটা সাপের মত ঝুলতে থাকায় সিংহীটা মুখ তুলে সেই দিকে তাকিয়ে সেটা কি তা ভাবতে লাগল। এমন সময় ফাঁসটা উপর থেকে কায়দা করে সিংহীর গলায় আটকে দিল টারজান। তারপর তার হাতের দড়ির শেষ প্রান্তটা একটা ডালে শক্ত করে বেঁধে দিল।
ফাসটা গলায় আটকে যাওয়ার পর সিংহীটা উপর দিকে মুখ তুলে দেখতে পেল টারজানকে। তাকে ধরার জন্য লাফ দিল সিংহীটা। গর্জন করতে লাগল প্রবলভাবে। কিন্তু টারজান আরও উপর ডালে উঠে গেল। তার ইচ্ছা ছিল দড়িটা ধরে উপর থেকে টেনে সিংহীটাকে শুন্যে ঝোলাবে। কিন্তু টারজান এরপর দড়িটা আরও টেনে বাঁধতে গেলে সিংহীটা তখন তার বড় বড় থাবা দিয়ে দড়িটা ছিঁড়ে দিল। তবে তার গলায় ফাসটা শুধু আটকে রইল।
