চিতার মুখে কথা শুনে আরও একজন বিস্ময়ে অভিভূত হয়েছে। ঘরটার ছাদের একটা বরগা সামনের দেয়াল ভেদ করে বাইরে খানিকটা বেরিয়ে আছে। তার উপরে বসে একটা ফোকড়ের ভিতর দিয়ে সব কিছুই সে দেখতে পাচ্ছে।
সে লোকটি মুজিমো। তার পাশে নিয়ামওয়েগির আত্মা। এত চিতাবাঘ দেখে সে বেচারি ভয়ে কাঁপছে।
মুজিমো আবার নিচে তাকাল। ঐ সাদা পুরুষ ও সাদা মেয়েটির কি হবে তা সে অনুমান করতে পারছে। কিন্তু তা নিয়ে তার কোন মাথাব্যথা নেই। কিন্তু হঠাৎ একটা কিছু দেখে তার আগ্রহ বেড়ে গেল। বীভৎস মুখোশগুলোর আড়ালে একটা পরিচিত মুখ যেন তার চোখে পড়ল। অনেকক্ষণ ধরেই তার উপর সে নজর রেখেছিল। কেমন যেন চেনা চেনা লাগছে। মুজিমোর ঠোঁটে ঈষৎ হাসি দেখা দিল। চলে এস। বলে সঙ্গীকে ডেকে সে কোন রকমে ছাদে উঠে গেল। বিড়ালের মত পা ফেলে এগিয়ে গিয়ে পার্শ্ববর্তী একটা গাছের ডালে লাফিয়ে পড়ল। বনের অন্ধকার দু’জনকেই ঢেকে দিল।
নিচের বড় ঘরে সন্ন্যাসিনীরা তখন বেদীর উপর অনেক উনুন জ্বেলে দিয়েছে, তার উপর মাটির পাত্রে নরমাংস রান্না হচ্ছে। ওদিকে সন্ন্যাসীরা ভাড়ে ভর্তি করে নিয়ে এসেছে ঘোল আর চোলাই। সেগুলো খেয়ে সকলেই নাচতে শুরু করেছে। চোলাই পেটে পড়ায় প্রধান সন্ন্যাসীও পাগলের মত নাচতে শুরু করে দিল।
বুড়ো টাইমারের দিকে এগিয়ে গিয়ে বোবোলো বলল, আমার সঙ্গে চলে এসো।
কোথায়?
তোমাকে পালাতে সাহায্য করব।
মেয়েটিকে সঙ্গে না নিয়ে আমি যাব না।
বেশ তো, সে ব্যবস্থাও করা হবে। কিন্তু তোতামাদের দুজনকে তো এক সঙ্গে নিয়ে যেতে পারব না। বুঝতে পারলেই ইমিগেগ আমাকে মেরে ফেলবে। আগে তুমি এস। মন্দিরের পিছনে একটা ঘরে তোমাকে লুকিয়ে রেখে আসি। তারপর মেয়েটিকে নিয়ে যাব।
বুড়ো টাইমারকে মন্দিরের পিছনের একটা ঘরে নিয়ে গেলে সে বলল, ফিরে যাবার আগে আমার হাতের বাঁধর কেটে দাও।
মুহূর্তের জন্য ইতস্তত করে বোবোলো বলল বেশ তো তাই দিচ্ছি। এখান থেকে তুমি একা তো পালাতে পারবে না। মন্দির একটা দ্বীপের মাঝখানে অবস্থিত। চারদিকের নদী কুমীরে ভর্তি; নদীপথে ছাড়া এখান থেকে বের হবার আর কোন পথ নেই।
বুড়ো টাইমার অধৈর্য গলায় বলল, বুঝেছি। এখন যাও; শিগ্গির মেয়েটিকে নিয়ে এস।
বোবোলো চলে গেল।
মন্দিরে তখন হুলুস্থুল কাণ্ড চলেছে। হাড়ির মাংস বিলি করা হচ্ছে; পাত্রের পর পাত্র চোলাই উজাড় হয়ে যাচ্ছে; উপরের বেদীতে প্রধান সন্ন্যাসী আচ্ছন্নের মত পড়ে আছে। চিতা-দেবতা উপুর হয়ে একটা মানুষের হাড় চিবুচ্ছে। প্রধান সন্ন্যাসিনী দাঁড়িয়ে আছে দেয়ালে হেলান দিয়ে।
বোবোলো তার কাঁধে হাত রাখল। মেয়েটি চমকে চোখ ফেরাল।
বোবোলো ইসারা করে চুপি চুপি বলল, চলে এস।
মেয়েটি একটু আগেই দেখেছে, এই মেয়েটি বুড়ো টাইমারকে এখান থেকে নিয়ে গেছে। সে বোবোলোকে অনুসরণ করল।
মেয়েটিকে বুড়ো টাইমারের ঘরে পৌঁছে দিয়ে বোবোলো বলল, তোমরা এখানে অপেক্ষা কর।
মন্দিরে ফিরে গিয়ে বোবোলো দেখল সেখানকার হৈ-হল্লা অনেকটা ঝিমিয়ে পড়েছে। হঠাৎ কৃতকর্মের জন্য তার কেমন ভয় করতে লাগল। মনে জোর আনবার জন্য তার চোলাইয়ের একটা বড় পাত্র তুলে মুখে ঢেলে দিল। ফল ফলতে দেরী হল না। এক ঘণ্টা পরে দেখা গেল বোবোলো মেঝেতে পড়ে অকাতরে ঘুমুচ্ছে।
গাটো মুঙ্গুরও একই অবস্থা। অগত্যা সে হুকুম জারি করল, খাদ্য-পানীয় যখন নেই, তখন ফিরে চল বাড়ি। সকলেই সম্মত হল। এমন কি বোবোলো পর্যন্ত। তারও মাথার মধ্যে সব কিছু গুলিয়ে গেছে। কি যেন তার করার ছিল, কিন্তু কিছু মনে করতে পারছে না। অগত্যা অন্য সর্দারদের সঙ্গে সেও তার দলবল নিয়ে ডোঙায় উঠে পড়ল।
কিছু সৈনিকের নেশা তখনো ভাঙে নি। মন্দিরের চত্বরে সকলেই ছড়িয়ে পড়ে আছে। কিছু ছোট সন্ন্যাসী ও সন্ন্যাসিনীও আছে তাদের মধ্যে। তাদের জন্য একটা ডোঙ্গা সর্দাররা রেখে গেছে। বেদীর এক কোণে ইমিগেগ গভীর ঘুমে কুঁকড়ে পড়ে আছে। পেট ভরা থাকায় চিতা-দেবতাও ঘুমিয়ে পড়েছে।
কালি বাওয়ানা ও বুড়ো টাইমার বোবোলোর অপেক্ষায় বসে আছে মন্দিরের পিছনের অন্ধকার ঘরে। বাড়িটা ক্রমেই চুপচাপ হয়ে আসছে; সকলের ফিরে যাবার আয়োজনও কানে আসছে। নদী তীরের হৈ হল্লা শুনেও তারা বুঝতে পেরেছে যে আদিবাসীরা নদীতে ডোঙ্গা ভাসিয়েছে।
বুড়ো টাইমার বলল, বোবোলোর তো এতক্ষণে আসা উচিত।
কালি বাওয়ানা বলল, সে হয় তো আমাদের ফেলেই চলে গেছে।
টাইমার বলল, তাহলে তুমিও চলে এস। সময় নষ্ট করো না। হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে আবার বলল, হাতে হাত দাও। আমরা যেন কখনও বিচ্ছিন্ন হয়ে না পড়ি।
অনেক কষ্টে মন্দির থেকে বেরিয়ে ছুটতে ছুটতে তারা নদীর তীরে পৌঁছে গেল। মনে ভয় ছিল, নদীতে ডোঙ্গা না পেলে সব পরিশ্রমই বৃথা হয়ে যাবে। কিন্তু না, উল্লাসে তাদের মন নেচে উঠল। তীরে কাদার মধ্যে একটা ডোঙ্গা দাঁড়িয়ে আছে।
বুড়ো টাইমার হাত ধরে কালি বাওয়ানাকে ডোঙ্গায় তুলে দিল; তারপর নিজেও উঠে বসল। নীরবে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানিয়ে তারা বড় নদীর দিকে ভেসে চলল।
মধ্যরাতের ঘণ্টাখানে পরে মুজিমো ও নিয়ামওয়েগি আত্মর ঘুমন্ত উটেঙ্গাদের মাঝখানে এসে নামল। শাস্ত্রীদের ঘাঁটিগুলো পরিদর্শন করে ওরান্ডো সবেমাত্র ফিরছে। সে জেগেই ছিল। বলল, কি সংবাদ নিয়ে এলে মুজিমো? শত্রু পক্ষের খবর কি?
