পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে আর এক জায়গায় দেখল আর একটা ছবির তলায় লেখা রয়েছে একটি বালক ও একটি কুকুর। এইভাবে সে কোন অক্ষর বা লিখিত ভাষার জ্ঞান ছাড়াই অক্ষর পরিচয়ের চেষ্টা করতে লাগল ধীরে ধীরে।
এইভাবে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ধরে নিজে নিজে শিখে যেতে লাগল সে। বিভিন্ন ছবির তলায় অক্ষরগুলো দেখে দেখে তাদের সম্বন্ধে একটা অস্পষ্ট ধারণা জাগল তার মনে।
টারজনের বয়স যখন বারো তখন একদিন কেবিনটার মধ্যে ঢুকে টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা কাঠের পেন্সিল নিয়ে টেবিলের উপর ক’টা আঁচড় কাটতে কতকগুলো কালো রেখার সৃষ্টি হলো। হিজিবিজি দাগ কেটে পেন্সিলের সীসটা ক্ষয় করে ফেলল। তারপর কি মনে হতে আর একটা পেন্সিল নিয়ে সেই ছবির বইয়ের অক্ষরগুলো লেখার চেষ্টা করতে লাগল।
অনেক চেষ্টার পর সে বই-এর অক্ষরগুলো লিখতে পারল। অক্ষরগুলো দেখে দেখে লিখতে গিয়ে সে সংখ্যাও শিখতে লাগল। তার হাতের আঙ্গুলগুলো গুণতে শিখল। এইভাবে লেখা শুরু হলো তার। বিভিন্ন শব্দের মধ্যে যে সব অক্ষরগুলো ঘুরে ফিরে ব্যবহৃত দেখল সেগুলো সাজিয়ে একটা বর্ণমালা খাড়া করল টারজান।
এইভাবে টারজনের বয়স সতের হয়ে উঠল। তখন সে প্রাথমিক পাঠের বইটা পুরো পড়তে পারল।
মাঝে মাঝে বাঁদরদলটা বাসস্থান পরিবর্তন করার জন্য কেবিনে গিয়ে পড়াশুনো করার কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি হতে লাগল টারজনের। তবু সে পথের কোথাও কোন গাছের বড় পাতা বা ফাঁকা জায়গায় মাটি দেখতে পেলেই তার উপর ছুরি দিয়ে তার শেখা অক্ষরগুলো লিখত টারজান।
টারজান যখন প্রথম বাদরদলে আসে তখনকার থেকে দলটা এখন অনেক বেড়ে গেছে। কার্চাকের নেতৃত্বে তাদের দলের সদস্যসংখ্যা বেড়েছে। তাছাড়া বনের অন্যান্য জন্তুর আক্রমণে মৃত্যুর সংখ্যাও কম। তাদের দলে খাদ্যেরও কোন অভাব হয় না। দলের ছোট ছোট পুরুষ বাঁদরগুলো বড় হয়ে সবাই কার্চাকের প্রভুত্ব মেনে নিয়ে তার সঙ্গে শান্তিতে বাস করছে।
বাঁদর দলের মধ্যে টারজনের একটা বিশেষ স্থান ছিল। তারা তাকে তাদের দলেরই একজন হিসাবে দেখত। প্রবীণ পুরুষ বাঁদরগুলো উপেক্ষা করত অথবা ঘৃণার চোখে দেখত। টারজনের আশ্চর্য বুদ্ধি, শক্তি ও সাহস আর কালা না থাকলে অনেক আগেই টারজানকে মেরে ফেলত তারা।
কালার স্বামী তুবলাত ছিল টারজনের ঘোর শত্রু। তবে টারজনের বয়স যখন তের তখন একদিন তুবলাতের মধ্যস্থতাতেই টারজনের উপর দলের পক্ষ থেকে সব পীড়ন বন্ধ হয়ে যায় এবং ঠিক হয় দলের কেউ টারজানকে ঘাটাবে না বা তার উপর কোনভাবে পীড়ন চালাবে না, খেলার ছলেও কেউ কিছু করবে না। সে সম্পূর্ণ একা একা থাকবে।
দলের মধ্যে টারজান যেদিন প্রতিষ্ঠা লাভ করে সেদিন বনের মধ্যে ফাঁকা একটা জায়গায় সমবেত হয় দলের সবাই। জায়গাটা ঠিক কোন রঙ্গালয়ের মত। সে জায়গার মাঝখানে কতকগুলো মাটির ঢাক আনা হলো কোথা থেকে। গাছের উপর থেকে প্রায় একশোটা বাঁদর-গোরিলা নেমে এসে সমবেত হলো সেই জায়গায়। চাঁদ উঠেছে আকাশে। চাঁদের আলো ঝরে পড়া সেই নৈশ বনভূমিতে আজ দমদম নাচ নাচবে ওরা। আজ ওদের অদ্ভুত এক উৎসব।
সহসা কার্চাক গলা ফাটিয়ে গর্জন করে পর পর তিনবার তার লোমশ বুকটা চাপড়াল তার দুটো থাবা দিয়ে। এরপর জায়টার মাঝখানে পড়ে থাকা বাঁদর-গোরিলার মৃতদেহের পানে তার রক্তলাল চোখ দুটো দিয়ে তাকিয়ে সেটাকে একবার প্রদক্ষিণ করল।
তারপর দলের অন্যান্য পুরুষ বাঁদরগুলোও একে একে গলা ফাটিয়ে একবার করে গর্জন করে মৃতদেহটাকে সেইভাবে প্রদক্ষিণ করল। তাদের সেই বিরাট গর্জনে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠল সমস্ত বনভূমি। এই গর্জনের অর্থ হলো শত্রুপক্ষের প্রতি সদম্ভ আহ্বান।
এবার পুরুষ বাঁদরগুলো সার দিয়ে নাচিয়েদের সঙ্গে দাঁড়াল। এরপর শুরু হল মৃতদেহের প্রতি আক্রমণ। এক জায়গায় অনেকগুলি লাঠি গাদা করা ছিল। কাৰ্চাক প্রথমে সেই গাদা থেকে একটা বড় লাঠি তুলে নিয়ে মৃতদেহটার উপর জোরে আঘাত করল এবং সেই সঙ্গে সেইরকম যুদ্ধের আহব্বন জানিয়ে গর্জন করল। মারের সঙ্গে সঙ্গে ঢাক বাজতে লাগল আর নাচ শুরু হলো। সেই বাজনা আর নাচের সঙ্গে সঙ্গে পালাক্রমে একজন করে পুরুষবাদর লাঠি দিয়ে মৃতদেহটাতে আঘাত করতে লাগল।
এইভাবে মৃত্যুর যে নৃত্যোৎসব চলছিল তাতে টারজানও যোগদান করেছিল। জোরে জোরে তালে তালে পা ফেলতে, লাফ দিতে ও এক ভয়ঙ্কর ক্ষিপ্রতার সঙ্গে আক্রমণ ও আঘাত করতে সে ছিল সবার চাইতে বেশি তৎপর।
ক্রমে তালে তালে ঢাকের বাজনার বেগ বেড়ে যেতে লাগল।
পুরো আধঘণ্টা ধরে এই উন্মত্ত নাচ চলতে লাগল। তারপর এক সময় কাৰ্চাক ইশারা করতেই নাচ ও বাজনা একমুহূর্তে থেমে গেল। সঙ্গে সঙ্গে সবাই একযোগে সেই মৃতদেহটার দিকে ছুটল। অসংখ্য লাঠির আঘাতে মৃতদেহটা একতাল মাংসপিণ্ডে পরিণত হয়েছিল, সবাই তাতে তার দাঁত বসিয়ে তার থেকে এককামড় করে মাংস ছিঁড়ে নিয়ে খেতে লাগল। যাদের গায়ের জোর বেশি তারা কামড় দিয়ে বেশি মাংস তুলে নিচ্ছিল।
অন্যদের মত টারজনেও মাংসের দরকার ছিল। কিন্তু এ সব কাড়াকাড়ির মধ্যে থেকে তার প্রয়োজনীয় মাংস ছিনিয়ে আনার মত শক্তি তার ছিল না। কিন্তু সেই ধারাল ছুরিটা তার কোমরে তারই হাতে তৈরি করা একটা খাপের মধ্যে ছিল। সেই ছুরিটা নিয়ে মৃতদেহটার কাছে গিয়ে তার একদিকের বগল থেকে বড় একতাল মাংস কেটে নিল টারজান। কাঁচাক তখন অন্য কাজে ব্যস্ত ছিল বলে এটা সে দেখতে পায়নি। টারজান তার কাছ দিয়েই নিঃশব্দে সবার থেকে একটু দূরে চলে গলে।
