এইভাবে ছুরিটা নিয়ে কিছুক্ষণ খেলা করার পর আলমারির ভিতরকার বইগুলো ঘাঁটতে গিয়ে। ছবিওয়ালা একটা ছোটদের বই দেখতে পেল। বইটাতে ছবির মাধ্যমে বর্ণমালা শেখানো হয়েছে। শিশুদের। যেমন ‘এ’ অক্ষরটার পাশে আছে একটা তীরন্দাজের ছবি আর ‘বি’ অক্ষরের পাশে আছে। একটা বালকের ছবি। এম’ অক্ষরের কাছে কতকগুলো ছোট ছোট বাদরের ছবিও দেখতে পেল টারজান।
বই-এর মধ্যে যে সব মানুষ বা জীবজন্তুর ছবি দেখছিল টারজান প্রথম প্রথম সেগুলো জীবন্ত মনে হচ্ছিল তার। তাই সে বই থেকে তুলতে যাচ্ছিল সেগুলোকে। কিন্তু পরে বুঝল সেগুলো জীবন্ত নয়।
বইটার মাঝখানে একজায়গায় তার শত্রু সিংহী আর একটা সাপের ছবি দেখল টারজান। ওদের বাঁদরদলের ভাষায় সিংহীকে স্যাবর আর সাপকে হিস্তা বলে।
বইটা আবার আলমারিতে রেখে দিল টারজান। তারপর ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে বেরিয়ে গেল ঘর হতে।
যাবার সময় ঘরের মেঝে থেকে সেই ছুরিটা তুলে নিয়ে সঙ্গে নিয়ে গেল। এগুলো সে বাঁদরগুলোকে দেখাবে।
কেবিন থেকে বেরিয়ে দশ পা এগিয়ে যেতে না যেতেই টারজান দেখল পাশের একটা ঝোপ থেকে বেরিয়ে এক বিরাটকায় বাঁদর-গোরিলা তার সামনে এসে হাজির হলো। টারজান প্রথমে ভেবেছিল গোরিলাটা তাদেরই দলের কেউ হবে। কিন্তু পরে দেখল গোরিলাটা তাদের গোড়া শক্ত বোলগানি।
টারজান দেখল তাদের ঘোর শত্রু বোলগানির সামনাসামনি সে যখন পড়ে গেছে তখন সে তাকে ছাড়বে না। সে তার কাছ থেকে পালিয়ে যেতেও পারবে না।
বোলগানিকে দেখে কোন ভয় জাগল না টারজনের অন্তরে। বরং এক দুঃসাহসিক অভিযানের আনন্দে ও উত্তেজনায় তার হৃৎপিণ্ডটা লাফাতে লাগল। সুযোগ পেলে অবশ্যই পালাত সে। কারণ সে বুঝতে পেরেছিল বোলগানির সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে পেরে উঠবে না সে।
টারজানই প্রথমে একটা ঘুষি মারল বোগলানির গায়ে। কিন্তু ঘুষিটাকে হাতির উপর একটা মাছির আঘাত বলে মনে হলো। হঠাৎ কি মনে হলো কেবিন থেকে নিয়ে আসা ধারাল ছুরিটা বোলগানি তাকে কামড়াতে এলেই তার বুকে সজোরে বসিয়ে দিল। যন্ত্রণায় চীৎকার করতে করতে টারজানকে বার বার কামড়ে তার ঘাড় ও হাত থেকে কিছুটা করে মাংস তুলে নিল। তারপর টারজানকে নিয়ে সে মাটিতে পড়ে গিয়ে গড়াগড়ি খেতে লাগল। এই অবসরে বোলগানির বুক থেকে ছুরিটা তুলে নিয়ে আবার কয়েকবার ছুরিটা সেই বুকে বসিয়ে দিতে লাগল। অবশেষে বোলগানির দেহটা নিথর নিস্পন্দ হয়ে উঠল আর টারজানও জ্ঞান হারিয়ে ফেলল আঘাতের যন্ত্রণায়।
কার্চাকের বাঁদরদলটা ছিল সেখান থেকে প্রায় মাইলখানেক দূরে। হঠাৎ বোলগানির বিকট চীৎকার শুনে সচকিত হয়ে ওঠে কাৰ্চাক। তার দলের সবাইকে ডেকে দেখল সবাই উপস্থিত আছে কি না। কারণ সে জানত বোলগানি তাদের দলের শত্রু এবং সে দলের কাউকে একা পেলে সে কখনই ছাড়বে না।
কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখা গেল টারজান দলের মধ্যে নেই। তখন ওরা বুঝল নিশ্চয়ই বোলগানির কবলে পড়েছে।
কালা কিন্তু অনেকক্ষণ থেকে খুঁজছিল টারজানকে। তার কোন বিপদের আশঙ্কায় তার মায়ের প্রাণ কাতর হয়ে উঠেছিল। তাই সে গাছের উপর উঠে খোঁজ করতে করতে এগিয়ে গেল।
অবশেষে ঘুরতে ঘুরতে কালা ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখল মরার মত রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত দেহে পড়ে আছে টারজান। সঙ্গে সঙ্গে বুকে কান পেতে দেখল তখনও দেহে তার প্রাণ আছে। ধীর গতিতে ধুক ধুক করছে হৃৎপিণ্ডটা। আরও দেখল অদূরে বোলগানির প্রাণহীন বিরাট দেহটা পাথরের মত শক্ত হয়ে পড়ে আছে।
টারজনের অচৈতন্য দেহটা কাঁধে তুলে তার দলের আড্ডায় বয়ে নিয়ে এল কালা। তার ক্ষতস্থানগুলোকে জিব দিয়ে চেটে পরিষ্কার করে দিল। প্রবল জ্বরে কাতর হয়ে ছটপট করতে লাগল। টারজান। বার বার জল চাইতে লাগল। কালা তখন মুখে করে নদী থেকে জল এনে তাকে দিতে লাগল। এইভাবে বেশ কয়েকদিন ধরে অক্লান্তভাবে সেবাযত্ন করে টারজানকে সারিয়ে তুলল কালা।
অসুখের সময়টা টারজনের খুব দীর্ঘ হলেও ধীরে ধীরে সেরে উঠতে লাগল টারজান। এক মাসের মধ্যেই সে আবার হেঁটে বেড়াতে লাগল। আবার সে আগের মত গায়ে বল পেয়ে কর্মঠ হয়ে উঠল।
একদনি সন্ধ্যাবেলায় একা একা বেরিয়ে পড়ল সে। প্রথমে ছুরিটার খোঁজে সেদিনকার সেই ঘটনাস্থলের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। সেখানে গিয়ে সে ঝরা পাতায় ঢাকা বোলগানির কঙ্কালটা পড়ে থাকতে দেখতে পেল। সেখানে পাতায় ঢাকা তার ছুরিটাকেও দেখতে পেল সে। ছুরিটার গায়ে লেগে থাকা গোরিলাটার রক্ত শুকিয়ে যাওয়ায় মরচে ধরে গেছে সেটাতে। তাই আগেকার মত তার মুখটাতে আর চকচকে ধার নেই। তবু সেই ছুরিটাকে কাছে রেখে দিল টারজান।
এরপর সোজা কেবিনটায় চলে গেল সে।
আজ ঘরটার সবকিছু খুঁটিয়ে দেখতে গিয়ে প্রথমে বইগুলো তার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। এই বইগুলো এমনভাবে প্রভাব বিস্তার করল তার মনে যে সে আর কিছুই দেখতে চাইল না। আর কোন দিকে মন গেল না।
একটা প্রাথমিক পাঠের বই ঘাঁটতে ঘাঁটতে তারই মত একটা ছেলের ছবি দেখতে পেল সে। টারজান দেখল ছেলেটা তার মত নগ্নদেহ নয়। তার হাত আর মুখ ছাড়া লোমের তৈরি জ্যাকেটে ঢাকা তার। দেহটা। ছবির তলায় বালক’ এই কথাটা শুধু লেখা আছে। আরো দেখল যে সব অক্ষরগুলো দিয়ে এই কথাটা লেখা রয়েছে সেই সব অক্ষরগুলো আলাদা করেও বিভিন্ন জায়গায় লেখা আছে।
