টারজনের বিপদসূচক চীঙ্কার শোনার সঙ্গে সঙ্গে চল্লিশ পঞ্চাশটি বড় বড় বাঁদর বিদ্যুৎবেগে গাছের ডালে ডালে ঘটনাস্থলে এসে হাজির হলো। সে দলে কালাও ছিল। টারজনের গলার স্বর সে ভালই চিনত।
এতগুলো বিরাটকায় বাঁদরের সঙ্গে লড়াইয়ে প্রবৃত্ত হওয়া যুক্তিযুক্ত নয় ভেবে সিংহীটা টারজনের সঙ্গীর মৃতদেহটা ছেড়ে রাগে গর্জন করতে করতে একটা ঝোপের মধ্যে ঢুকে গেল।
সাহস পেয়ে জল থেকে শুকনো ডাঙ্গায় এসে উঠল টারজান। শীতল জলে গাটা ডুবিয়ে আজ জীবনে প্রথম এক অনাস্বাদিতপূর্ব আরামবোধ করল। এরপর থেকে সে রোজ একবার জলে গা ডুবিয়ে স্নান করত।
যে বাঁদরদলটার সঙ্গে টারজান বাস করত সে দলটা সমুদ্র-উপকূল থেকে পঁচিশ মাইল জুড়ে বনের মধ্যে ঘুরে বেড়াত। তারা কয়েক মাস করে এক একটা জায়গায় থাকত। পরে আবার অন্য এক জায়গায় বনের মধ্যে চলে যেত। আহার সংগ্রহ, আবহাওয়ার অবস্থা আর বিপজ্জনক বন্য জন্তুদের অবস্থিতি-এই সবকিছু বিবেচনা করেই স্থান পরিবর্তন করত তারা।
সারাদিন আহারের সন্ধানে ঘুরে বেড়িয়ে রাত্রির অন্ধকার ঘন হয়ে উঠলেই বাঁদরদলের সবাই কেউ মাটির উপর, কেউ বা গাছের উপর ঘুমিয়ে পড়ত। টারজান ঘুমোত কালার কোলের উপর।
মাঝে মাঝে কালার অবাধ্য হলে টারজানকে কালা দু-এক ঘা মারত। কিন্তু কোনদিন সে নিষ্ঠুর বা খুব কঠোর হতে পারেনি তার উপর। বরং সে তাকে তিরস্কারের থেকে আদরই করত বেশি।
কালার স্বামী তুবলাত এজন্য ঘৃণার চোখে দেখত টারজানকে। কতবার সে রাগের মাথায় টারজনের জীবনের অবসান ঘটাবার চেষ্টা করেছে।
টারজানও যখনি সুযোগ পেয়েছে তখনি সে তুবলাতের প্রতি তার ঘৃণার ভাবটা জানিয়ে দিয়েছে। কখনো কালার কোলের নিরাপদ আশ্রয়ে থেকে অথবা কখনো গাছের মাথায় সরু সরু ডাল থেকে। তুবলাতকে ভেংচি কেটে অপমান করেছে।
ছোটবেলা থেকে দড়ি তৈরি ও দড়ি নিয়ে মজার মজার খেলায় পটু হয়ে ওঠে টারজান। বন থেকে লম্বা লম্বা ঘাস তুলে তাই দিয়ে লম্বা লম্বা দড়ি তৈরি করত সে। তারপর সেই দড়ির ফাঁস তৈরি করে তার খেলার সাথীদেরও মাঝে মাঝে তুবলাতের গলায় আটকে দিত।
এই ধরনের খেলায় খুব মজা পেত বাঁদরগুলো। কোন খেলার সাথী গাছের তলা দিয়ে ছুটে কোথাও গেলে টারজান তখন উপর থেকে দড়ির ফাঁসটা নামিয়ে তার গলায় লাগিয়ে দিত আর সে হটাৎ থেমে যেতে বাধ্য হত। তাতে সবাই মজা পেত।
তুবলাতের গলায় একদিন এই দড়ির ফাঁসটা আটকে যাওয়ায় সে কিন্তু এটাকে বড় ভয়ের চোখে দেখত।
এর জন্য কালাকে একবার শাস্তি দিল তুবলাত। কার্চাকের কাছে নালিশ করল। কাৰ্চাকও সাবধান করে দিল কালাকে ও টারজানকে। কারো কোন কথা শুনত না টারজান। সুযোগ পেলেই সে তর দড়ির ফাসটা অতর্কিতে আটকে দিত তুবলাতের গলায়।
আর তখন তুবলাতের সেই দুরবস্থা দেখে অন্যান্য বাদরগুলো মজা পেত। কারণ ভাঙ্গা নাকওয়ালা তুবলাতকে দলের কেউ ভাল চোখে দেখত না।
দিনের বেলায় আহারের সন্ধানে ঘুরে বেড়ানোর সময় বাঁদরের দলটা প্রায়ই উপকূলভাগের কাছে মৃত ক্লেটনের সেই কেবিনটার কাছাকাছি এসে পড়ত। আর সেই জায়গাটায় ওরা এসে পড়লেই কেবিনটার কাছে এসে প্রায়ই জানালাগুলোর পর্দা সরিয়ে ভিতরে উঁকি মেরে দেখত টারজান। এক একবার ছাদের উপর উঠে চিমনি দিয়ে উঁকি মারত। ভিতরে কি আছে তা দেখার জন্য এক অদম্য কৌতূহলে ফেটে পড়ত সে।
একদিন একাই কেবিনটার কাছে চলে এল টারজান। আসার সঙ্গে সঙ্গেই কেবিনটার দরজার উপর চোখ পড়ল। এতদিন এই দরজাটাকে দেওয়ালের একটা অংশ বলে দেখে এসেছে এবং তাই তার মনে হয়েছে। কিন্তু আজ তার মনে হলো বাইরে দেওয়ালগুলোর অংশ বলেই মনে হলেও এটা একটা স্বতন্ত্র বস্তু এবং এটা ঘরে ঢোকার পথ।
ক্লেটনের মৃত্যুর পর হতে পর পর দশটি বছর কেটে গেছে। তবু এই কেবিনটার ভিতরে কালো বাটওয়ালা সেই ভূতুড়ে জিনিসটার প্রতি কাৰ্চাক ও তার দলের লোকদের ভয় আজও যায়নি তাদের মন থেকে। কেবিনটাতে একদিন কি ঘটনা ঘটেছিল সেকথা তারা বলেনি টারজানকে। তাছাড়া তারা সব ভুলে গেছে এতদিনে।
একমাত্র কালা শুধু মাঝে মাঝে টারজানকে বলত তোর বাবা ছিল অদ্ভুত ধরনের সাদা বাঁদর। কিন্তু সেকথার মানে বুঝতে পারত না টারজান। তার বাবা যেই হোক, কালা তার মা নয় একথা কখনো ভাবতে পারত না সে।
আজ প্রথম কেবিনের দরজাটা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে পরীক্ষা করতে লাগল টারজান। তার প্রতিটি অংশ খুঁটিয়ে দেখল। অবশেষে ঠিক জায়গায় হাত পড়ে গেল এবং সঙ্গে সঙ্গে তার বিস্ময়বিমূঢ় চোখের সামনে সশব্দে খুলে গেল দরজাটা।
দরজাটা খুলে গেলেও সঙ্গে সঙ্গে ঘরের মধ্যে ঢুকতে পারল না টারজান। কিন্তু অনেকক্ষণ ধরে ঘরের মধ্যে তাকিয়ে থাকার পর ভয়টা ভেঙ্গে গেল তার। তারপর ঢুকে পড়ল ঘরের মধ্যে।
টারজান দেখল ঘরের মাঝখানে মেঝেতে একটা কঙ্কাল পড়ে আছে। ঘরের মধ্যে যে একটা খাট ছিল তার উপর আর একটা কঙ্কালকেও পড়ে থাকতে দেখল। দুটো কঙ্কালের মধ্যে মাংসের কোন চিহ্ন নেই। ঘরের একধারে যে একটা দোলনা ছিল তার মধ্যেও একটা ছোট্ট কঙ্কাল ছিল, মনে হলো সেটা যেন কোন শিশুর কঙ্কাল।
এরপর ঘরের মধ্যেকার অন্যান্য জিনিসপত্রের দিকে নজর দিল টারজান। ঘরের মধ্যে যেসব যন্ত্রপাতি, অস্ত্রশস্ত্র, বইপত্র, পোশাক-আকাশ এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিল সেগুলো একে একে পরীক্ষা। করে দেখতে লাগল সে। বন্য আবহাওয়ার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে কালের আঘাত সহ্য করতে করতে এই সব বস্তু বিবর্ণ ও বিকৃত হয়ে গেছে অনেকখানি। কিন্তু টারজান একটা সিন্দুক আর একটা আলমারি খুলে দেখল তার মধ্যে যে সব জিনিস ছিল সেগুলো সব ভাল অবস্থায় আছে। সেই সব জিনিসগুলো ঘাঁটতে ঘাটতে একটা ছুরি দেখতে পেল টারজান। ছুরিটা শিকারের সময় ব্যবহার করত ক্লেটন। ছুরিটার ফলাটায়। দারুণ ধার থাকায় তার আঙ্গুলের এক জায়গায় কেটে গেল। এরপর সে ছুরিটাকে খেলনার মত ব্যবহার করতে করতে চেয়ার ও টেবিলের ধারগুলো কাটতে লাগল।
