কার্চাক রাইফেলটা হাতে নিয়ে পরীক্ষা করতে লাগল। তারপর একসময় ট্রিগারটার উপর হাত পড়তেই গর্জনের মত জোর শব্দ হলো একটা। শব্দটা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাঁদরগুলো পালাতে গিয়ে এ ওর ঘাড়ের উপর মুখ থুবড়ে পড়ে গেল।
কাৰ্চাকও ওদের মত ভয় পেয়ে গেল। কিন্তু সে রাইফেলটা না ছেড়ে সেটা হাতে ধরেই পালিয়ে যাবার জন্য দরজার দিকে এগিয়ে গেল। কেবিন থেকে বেরিয়ে সে রাইফেলটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিল।
পরম যত্নের সঙ্গে শিশুটাকে মানুষ করে যেতে লাগল কালা। কিন্তু এত সেবা যত্ন করেও ঠিকমত বাড়ে না বা গায়ে বল পায় না শিশুটা। প্রায় এক বছর হয়ে গেল শিশুটা তার হাতে এসেছে। তবু এখনো সে অন্যান্য বাঁদরশিশুর মতো একা একা হাঁটতে বা গাছে চড়তে পারে না। এ কথাটা প্রায়ই এক নীরব বিস্ময়ের সঙ্গে ভাবতে থাকে কালা।
কালার স্বামী তুবলাতেরও বিরক্তির অন্ত ছিল না এ বিষয়ে। কালা যদি সব সময় শিশুটাকে নজর না রাখত তাহলে তুবলাত অনেক আগেই তাকে সরিয়ে দিত পৃথিবী থেকে।
এরপর কালার বিরুদ্ধে নালিশ জানাবার জন্য একদিন কাৰ্চাকের কাছে গেল তুবলাত। কাৰ্চাক যেন তুবলাতের কথামত চলার জন্য বাধ্য করে কালাকে। কালা যেন তার দ্বারা বাধ্য হয়ে ত্যাগ করে ঐ মানবশিশুটাকে।
কিন্তু কাৰ্চাক যখন কালাকে ডেকে কথাটা তুলল তার কাছে তখন কালা তাকে স্পষ্ট জানিয়ে দিল যদি তারা এই শিশুটাকে নিয়ে শান্তিতে থাকতে না দেয় তাকে তাহলে সে দল ছেড়ে চলে যাবে চিরদিনের মত।
কালার কুড়িয়ে পাওয়া শিশুটার গায়ের চামড়া সাদা বলে ওরা সবাই মিলে ওর নামকরণ করেছিল টারজান। টারজান কথাটার মানেই হলো সাদা চামড়া।
দিনে দিনে বেড়ে উঠতে লাগল টারজান। তার বয়স যখন দশ বছর হলো তখস সে ভালভাবে গাছে চড়তে শিখল। গাছে গাছে ঘুরে বেড়াতে পারত সে। মাটির উপরেও সে এমন সব মজার মজার খেলা দেখাত যা কেই পারত না।
অনেক বিষয়েই অন্যান্য বাঁদরশিশুদের সঙ্গে তফাৎ ছিল টারজনের।
অন্যান্য বাঁদর শিশুদের থেকে টারজনের বুদ্ধি অনেক বেশি থাকলেও তার আকৃতি আর শক্তি তাদের থেকে ছিল অনেক কম। দশ বছর বয়সে বাঁদর-শিশুরা এক একটা বাঁদরে পরিণত হয়। কিন্তু টারজান আজও পর্যন্ত একটা অপরিণত বালকই রয়ে গেছে।
কিন্তু বালক হলেও সাধারণ বালক ছিল না সে। শৈশব থেকেই তার হাত দিয়ে গাছের ডালে ডালে ঝুলত টারজান। এই ঝোলার কায়দাটা সে শিখেছিল তার মা কালার কাছ থেকে। তারপর যতই বড় হয়ে উঠতে লাগল ততই সে অন্যান্য বাঁদরশিশুদের সঙ্গে গাছে গাছে লাফিয়ে খেলা করে বেড়াত।
একটা গাছ থেকে শূন্যে লাফ দিয়ে কুড়ি ফুট শূন্যতা অতিক্রম করে অন্য একটা গাছের ডাল অভ্রান্তভাবে ধরতে পারত টারজান।
টারজনের বয়স দশ বছর পার হবার সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য বাদরশিশুদের সঙ্গে তার দেহগত তফাক্টা প্রকট হয়ে উঠল তার কাছে। তার গায়ের সাদা চামড়াটা রোদে পুড়ে পুড়ে তামাটে হয়ে গিয়েছিল। তা হোক। কিন্তু তার সবচেয়ে দুঃখ ও লজ্জার কারণ হলো এই যে অন্যান্য বাঁদরদের মতো কোন লোম ছিল তার গায়ে। এই লজ্জাটা ঢাকার জন্য অনেক সময় গোটা গায়ে কাদা মেখে থাকত। কিন্তু কাদাগুলো শুকিয়ে গেলেই ঝরে পড়ত আর তা ছাড়া বড় অস্বস্তি লাগত। তাই শেষে কাদা মাখা ছেড়ে দিল। অস্বস্তি থেকে মুক্তি পাবার জন্য লজ্জাকেই বরণ করে নিল।
ঘুরতে ঘুরতে একদিন জলাশয়ের স্বচ্ছ জলে জীবনে প্রথম তার মুখের প্রতিবিম্ব দেখল টারজান।
টারজান সেখানে গিয়েছিল কালার এক সন্তান অর্থাৎ তার ভাইয়ের সঙ্গে। সেখানে জলের ধারে দাঁড়িয়ে জলের উপর ঝুঁকে তাকাতেই দু’জনের মুখের ছায়া ফুটে উঠল হ্রদের শান্ত জলের উপর। কোন এক ভয়ঙ্কর বদর যুবকের কদাকার মুখের পাশে অতি সুন্দর এক মানবযুবকের মুখ।
সে মুখ দেখে এক পুলকিত বিস্ময়ে অবাক হয়ে গেল টারজান। তার গায়ে লোম না থাক কিন্তু কী সুন্দর মুখ! তার মুখগহ্বরটা কত ছোট, তার দাঁতগুলো কত সাদা আর ছোট। তার বাঁদরভাইদের মোটা মোটা ঠোঁট আর বড় বড় দাঁতগুলোর পাশে কত সুন্দর দেখাচ্ছিল সেগুলো। তার নাক আর নাসারন্ধ্র দুটো কত ছোট। অবশেষে সে ভাবল এমন সুন্দর আকৃতি পাওয়া সত্যিই কত ভাল।
কিন্তু তার চোখ দুটোকে খুব ভয়ঙ্কর বলে মনে হলো। সাদায় কালোয় মেশা একটা গোলাকার পদার্থ। কি বিশ্রী! সাপদেরও চোখগুলো এমন ভয়ঙ্কর নয়।
নিজের চেহারাটা খুঁটিয়ে দেখতে গিয়ে তন্ময় ও অভিভূত হয়ে পড়েছিল টারজান।
হঠাৎ ওরা দুজনেই দেখতে পেল ওদের থেকে মাত্র তিরিশ হাত দূরে একটা বিরাট সিংহী, লেজ নাড়তে নাড়তে এগিয়ে আসছে। তার পেটটা প্রায় মাটি স্পর্শ করছিল। একটা বিরাট বিড়ালের মত নীরবে নিঃশব্দে তার শিকারের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার উদ্যোগ করছিল সে।
সিংহীটার গর্জনে সচকিত হয়ে টারজান দেখল তার এক দিকে সামনে হ্রদের বিস্তৃত জলরাশি আর একদিকে নিশ্চিত মৃত্যু।
সিংহীটার কবল থেকে আত্মরক্ষার আর কোন উপায় না পেয়ে হ্রদের জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল সে। সাঁতার না জানলেও হাত পা নেড়ে কোনরকমে জলের উপর মাথাটা বার করে তার দলের বাঁদরদের উদ্দেশ্যে চীৎকার করতে লাগল। দেখল সিংহীটা ততক্ষণে তার সঙ্গীর নিথর দেহটার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সেটাকে ছিঁড়ে খাচ্ছে আর তার দিকে তাকাচ্ছে। ভাবছে সে জল থেকে উঠলে তাকেও ধরবে।
