বুঝতে পারার সঙ্গে সঙ্গেই ক্লেটনের দুঃখটা এক অন্তহীন বিশালতায় প্রকট হয়ে উঠল তার সামনে। তার দুগ্ধপোষ্য শিশুসন্তানটির সমস্ত দায়িত্ব কিভাবে পালন করবে সে কথা ভাবতে গিয়ে কোন কূল কিনারা খুঁজে পেল না।
এ্যালিসের মৃত্যু ঘটে যে রাতে তার পরদিন সকালে শেষবারের মত ডায়েরী লেখে ক্লেটন। এক অন্তহীন দুঃখ আর হতাশায় সকরুণ হয়ে ওঠে তার প্রতিটি কথা।
বিছানার পাশে একটা চেয়ারে বসে এই কথাগুলো ডায়েরীতে লিখতে লিখতে ক্লান্ত হয়ে হাত দুটো টান করে বিছানার উপর ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল ক্লেটন। তার হাত থেকে কলমটা পড়ে যায়। স্ত্রীর মৃতদেহটা তখনও পড়েছিল বিছানায়।
উপকূলভাগ হতে এক মাইল দূরে অরণ্যের মধ্যে বাঁদর-গোরিলাদের প্রধান কার্চাক সেদিন রাগের মাথায় এক তাণ্ডব শুরু করে দিয়েছিল তার দলের মধ্যে।
কালা নামে একটা মেয়ে বাঁদর-গোরিলা তার একটা কোলের বাচ্চাকে নিয়ে আহারের সন্ধানে দূরে গিয়েছিল। কার্চাকের তাণ্ডবলীলার কথা জানত না সে। হঠাৎ একসঙ্গে অনেকগুলো বাদরের চীকারে হুঁশ হলো তার। বুঝল কাৰ্চাক নিশ্চয় পাগল হয়ে গেছে এবং এই মুহূর্তে সেখানে গিয়ে পড়লে তার জীবন। বিপন্ন হবে।
নিরাপত্তার খোঁজে কালা এগাছ ওগাছ করতে লাগল। কাৰ্চাক এক সময় তাকে ধরতে গিয়ে তার এত কাছে চলে এল যে কালা একটা উঁচু গাছের মাথা থেকে লাফ দিল জোরে। কালা অন্য একটা গাছের ডাল ধরল। কিন্তু তার কোলের বাচ্চাটা তিরিশ ফুট নিচে পড়ে গেল। কালা তখন একটা আর্তনাদ করে কার্চাকের সব ভয় ভুলে গিয়ে তার বাচ্চাটার কাছে গিয়ে তাকে মাটি থেকে তুলে নিল। কিন্তু তার আগেই তার প্রাণটা বেরিয়ে গেছে তার দেহ থেকে।
দলের বাঁদর-গোরিলাগুলো যখন দেখল কাৰ্চাক শান্ত হয়ে উঠেছে তখন তারা নিরাপদ আশ্রয় থেকে বেরিয়ে এসে আপন আপন কাজে মন দিল।
এইভাবে ঘণ্টাখানেক কেটে যাওয়ার পর তার দলের সব বাঁদরদের এক জায়গায় ডেকে তাকে অনুসরণ করতে বলল কাৰ্চাক।
প্রথমেই তারা ফাঁকা মাঠের উপর দিয়ে কিছুক্ষণ গেল। তারপর হাতিচলা বনপথের মধ্য দিয়ে যেতে লাগল। এরপর গাছগুলোর ডাল ধরে ধরে খুব দ্রুত এগিয়ে চলল তারা। কালাও তার মরা বাচ্চাটা আঁকড়ে ধরে এগিয়ে চলতে লাগল তাদের সঙ্গে।
দুপুরের কিছু পরে সমুদ্রের বেলাভূমির কাছে পৌঁছল যেখানে সেই ঢিবিটার পাশে কেবিনটা ছিল, এই কেবিনটাই ছিল কাৰ্চাকের লক্ষ্য।
আসলে কার্চাকের লক্ষ্য ছিল দুটো। কার্চাকের প্রথম লক্ষ্য হলো কালো বাটওয়ালা সেই রাইফেলটা যার মুখ থেকে বেরোন গুলি থেকে অনেক বাঁদর-গোরিলার মৃত্যু হয়েছে।
সম্প্রতি আর এদিকে আসত না কাৰ্চাক। কারণ যখনি তার দলবল নিয়ে কেবিনটার দিকে এগিয়ে যেত অথবা আক্রমণ করার চেষ্টা করত তখনি সেই কালো বাটওয়ালা বস্তুটা গর্জন করে উঠে তাদের দলের কারো না কারো মৃত্যু ঘটাত।
আজ কিন্তু সেই সাদা লোকটার কোন পাত্তা নেই। কাৰ্চাক দূর থেকে দেখল কেবিনের দরজাটা খোলা রয়েছে। কোনরূপ চেঁচামেচি বা তর্জন গর্জন করল না। কালো লাঠির মত সেই ভয়ঙ্কর বস্তুটার ভয়ে নিঃশব্দ পদক্ষেপে এগিয়ে আসতে লাগল।
সবার আগে ছিল কাৰ্চাক। তার পিছনে ছিল দু’জন পুরুষ বাঁদর আর তাদের পিছনে ছিল কালা। কালার কোলে তখনো ছিল সেই মরা বাচ্চাটা।
কাৰ্চাক দেখল ঘরটার মধ্যে সেই আশ্চার্য সাদা লোকটা টেবিলের উপর ঝুঁকে হাত দুটো টান করে শুয়ে আছে। বিছানার উপর একটা নিস্পন্দ দেহ কাপড়ে ঢাকা অবস্থায় শুয়ে আছে। আর ঠিক সেই সময়ে ঘরের একপাশে দলে থাকা একটা দোলনা থেকে একটা শিশু সকরুণ সুরে কেঁদে উঠল।
নিঃশব্দে ঘরের মধ্যে ঢুকে আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুত হতেই জেগে উঠল ক্লেটন। চমকে উঠল কাৰ্চাকদের দিকে তাকিয়ে।
দরজার দিকে তাকিয়ে ক্লেটন যা দেখল তাতে তার দেহের সব রক্ত হিম হয়ে জমে গেল। সে দেখল তার পিছনে তিন-চারটে পুরুষ বাঁদর কখন চুপিসারে এসে দাঁড়িয়েছে। তাদের পিছনে আরো কত বাঁদর আছে এবং সংখ্যায় কত হবে তার কিছু জানতে পারল না ক্লেটন। দেখল কাৰ্চাক তার লোমশ হাত দুটো বাড়িয়ে তাকে ধরতে আসছে।
ক্লেটনের দেহটাকে সামান্য একতাল মাংসে পরিণত করে তাকে যখন ছেড়ে দিল কাৰ্চাক ঠিক তখনি তার দৃষ্টি পড়ল দোলনার শিশুটার উপর।
কাৰ্চাক তাকে ধরার আগেই কালা ছুটে গিয়ে শিশুটাকে তুলে নিয়ে তার জায়গায় তার কোলের মরা শিশুটাকে রেখে দিল। তারপর সেই মানব-শিশুটাকে কোলে নিয়ে লাফ দিয়ে একটা উঁচু গাছের উপর উঠে গেল। সেই জীবন্ত মানব-শিশুর কান্না তার বুকের মধ্যে তার মাতৃত্বকে জাগিয়ে তুলল।
গাছটার অনেক উঁচু একটা ডালে বসে কালা সেই মানবশিশুটাকে বুকে চেপে ধরে আদর করতে লাগল। কালা পশুমাতা হলেও তার সহজাত মাতৃত্ববোধ মানবশিশুর অর্ধস্পষ্ট বোধশক্তির মধ্যে মাতৃস্নেহের এক আশ্চর্য রূপ ধারণ করল। ফলে সঙ্গে সঙ্গে চুপ করে গেল শিশুটি। কোন ইংরেজ লর্ড পরিবারের সন্তান কালা নামে এক বাদরীর বুকে মানুষ হতে লাগল।
প্রথমেই কার্চাকের নজর পড়ল দেয়ালের উপর টাঙ্গানো ক্লেটনের রাইফেলটার উপর। বজ্ৰদণ্ডটা করায়ত্ত করার জন্য বহুদনি ধরে কামনা করে আসছে কাৰ্চাক তার মনের মধ্যে। কিন্তু আজ সেই বস্তুটা হাতের কাছে পেয়েও সেটাকে হাত দিয়ে ধরতে সাহস পাচ্ছে না সে।
