ওদের চেঁচামেচিতে মুখ তুলে তাকাল ক্লেটন। এতক্ষণে যাকে ছোট ছোট বাঁদরগুলো সবচেয়ে বেশি ভয় করে সেই বিরাটকায় মানবাকৃতি জীবটাকে স্বচক্ষে ভাল করে দেখল ক্লেটন। দেখল সেটা ডালপালা ভেঙ্গে গর্জন করতে করতে তার দিকেই এগিয়ে আসছে।
ক্লেটন তখন তার কেবিন থেকে একটু দূরে একটা গাছ কাটছিল। প্রায় দু’মাস যাবৎ এখানে আসার পর থেকে কোন বিপদের মুখে না পড়ায় আত্মরক্ষার সম্বন্ধে ক্রমশই উদাসীন হয়ে উঠেছিল ক্লেটন। তার রাইফেল ও রিভলবার সব কেবিনের ভিতরে রেখে গিয়েছিল। তাই যখন দেখল জানোয়ারটা এমনভাবে দ্রুত তার দিকে আসছে যে ছুটে গিয়ে কেবিন থেকে অস্ত্র আনা সম্ভব হবে না তখন চরম ভয়ের একটা শিহরণ খেলে গেল ওর সর্বাঙ্গে।
ক্লেটন দেখল তার হাতে একটা কুড়াল ছাড়া আর কোন অস্ত্র নেই এবং সামান্য এই অস্ত্র দিয়ে রাক্ষসের মত এই বিরাট জন্তুটার সঙ্গে লড়াই করা সম্ভব নয়।
তবু একবার চেষ্টা করে দেখল ক্লেটন। সে উধ্বশ্বাসে কেবিনের দিকে ছুটতে লাগল। চীৎকার করে এ্যালিসকে সাবধান করে দিল।
কেবিন থেকে একটু দূরে তখন বসেছিল এ্যালিস। ক্লেটনের চীৎকারে সে মুখ ফিরিয়ে দেখল। বনমানুষের মত একটা বিরাট জন্তু তার স্বামীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য এগিয়ে আসছে জোর গতিতে। তা দেখে সঙ্গে সঙ্গে কেবিনের মধ্যে ছুটে গিয়ে ঢুকে গেল সে। যাবার সময় পিছন ফিরে তাকিয়ে একবার দেখল তার স্বামী তার হাতের কুড়ালটা দিয়ে সেই ভয়ঙ্কর বিরাটকায় জন্তুটার সঙ্গে লড়াই করছে।
ক্লেটন একবার চীৎকার করে বলল, কেবিনের দরজাটা বন্ধ করে ভিতের থাক এ্যালিস। আমি এই কুড়াল দিয়েই একে শেষ করে ফেলব।
সেই বিরাট পুরুষ বাঁদর-গোরিলাটার ওজন হবে প্রায় তিনশো পাউন্ড। তার চোখগুলো ঘৃণায় ও হিংসায় জ্বলছিল। তার বড় বড় দাঁতগুলো বার করে হাঁ করে গর্জন করছিল ক্লেটনের সামনে।
ক্লেটন দেখল সে যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখান থেকে তার কেবিনটা মাত্র কুড়ি পা দূরে। সে যখন দেখল কেবিন থেকে তার স্ত্রী হাতে একটা রাইফেল নিয়ে বেরিয়ে আসছে তখন এক ভয়ের শিহরণ খেলে গেল তার সর্বাঙ্গে।
সাধারণত আগ্নেয়াস্ত্রকে ভয় করে চলত এবং কখনো খুঁত না যেন। কিন্তু আজ সে স্বামীকে বিপদাপন্ন। দেখে শাবকবৎসলা এক সিংহীর মত নির্ভীকতার সঙ্গে ছুটে এল বাঁদর-গোরিলার দিকে।
ক্লেটন চীৎকার করে উঠল, ফিরে যাও এ্যালিস। ঈশ্বরের নামে বলছি।
কিন্তু এ্যালিস গেল না। বাঁদরটা এবার ক্লেটনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ক্লেটনও তার কুড়ালটা দেহের সমস্ত শক্তি দিয়ে ঘোরাতে লাগল তার চারদিকে। কিন্তু জন্তুটা তার বলিস্ট বিরাট হাত দুটো দিয়ে কুড়ালটা ধরে ক্লেটনের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে ফেলে দিল সেটা একধারে।
এবার এক বিকট চীৎকার করে বাঁদরটা যেমনি ক্লেটনের গলাটা দু’হাত দিয়ে ধরতে গেল অমনি এ্যালিসের রাইফেল থেকে বেরিয়ে আসা একটা গুলি বাঁদর-গোরিলাটার পিঠটাকে বিদ্ধ করল।
সঙ্গে সঙ্গে ক্লেটনকে ছেড়ে দিয়ে জন্তুটা তার নতুন শত্রু এ্যালিসের দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু রাইফেলটাতে আর গুলি না থাকায় চেষ্টা করেও আর গুলি করতে পারল না সে। জন্তুটা এবার হাত বাড়িয়ে ধরতেই তার সামনে মূর্হিত হয়ে পড়ে গেল এ্যালিস। সঙ্গে সঙ্গে জন্তুটাও তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
ক্লেটন তখন তার স্ত্রীর অচেতন দেহটা থেকে সরিয়ে দেবার জন্য জন্তুটাকে পিছন থেকে টানতে লাগল।
একটু টানতেই জন্তুটা টলতে টলতে পড়ে গেল। তার পিঠে লাগা বুলেটের ক্রিয়াটা সম্পূর্ণ হলো এতক্ষণে।
ক্লেটন তার স্ত্রীর দেহটা তাড়াতাড়ি পরীক্ষা করে দেখল দেহের উপর কোন ক্ষতচিহ্ন নেই। সে বুঝল জানোয়ারটা এ্যালিসের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই মারা যায়।
ধীরে ধীরে এ্যালিসের অচেতন দেহটা তুলে ধরল ক্লেটন। কেবিনের মধ্যে নিয়ে গেল। কিন্তু পুরো দু’ঘণ্টার আগে জ্ঞান ফিরল না এ্যালিসের।
কিন্তু জ্ঞান হওয়ার পর এ্যালিস প্রথমে যা বলল তা শুনে ভয় পেয়ে গেল ক্লেটন। জ্ঞান ফিরে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এ্যালিস কেবিনটার চারদিকে তাকাল পরম বিস্ময়ের সঙ্গে। তারপর একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল, ও জন, সত্যি সত্যি ঘরে থাকাটা কত আরামদায়ক! আমি একটা ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন দেখেছি।
ক্লেটন তার স্ত্রীর কপালে হাত বুলিয়ে বলল, ঠিক আছে। ঘুমিয়ে পড়। দুঃস্বপ্ন নিয়ে মাথা ঘামিও না।
সেই রাত্রিতেই একটি পুত্র সন্তান প্রসব করল এ্যালিস। সেই আদিম জঙ্গলের মাঝে ছোট কেবিনটাতে শিশুটির জন্ম হলো যখন তখন দরজার বাইরে একটা চিতাবাঘ ডাকছিল এবং উপকূলবর্তী সেই ঢিবিটার উপর হতে একটা সিংহের গর্জন ভেসে আসছিল।
তার শিশু সন্তানের জন্মের পর পুরো একটা বছর বেঁচে ছিল লেডী গ্রেস্টোক, কিন্তু সেই বাঁদর গোরিলার আকস্মিক আক্রমণ থেকে যে আঘাত সে পেয়েছিল সেই আঘাতের প্রকোপটা জীবনে কোনদিন সামলে উঠতে পারেনি। তবে যতদিন বেঁচেছিল ততদিন সে সেই কেবিনটার বাইরে একটিবারের জন্যও বার হয়নি অথবা একথা সে কোনদিন বুঝতে পারেনি। যে সে আর ইংল্যান্ডে নেই।
তাদের শিশুটির জন্মের এক বছর গত হতেই কোন এক রাতে নীরবে পৃথিবী থেকে চিরদিনের মত চলে গেল লেডী এ্যালিস। তার মৃত্যুটা ঘটে এমনই নীরবে ও নিঃশব্দে যে ক্লেটন বুঝতেই পারেনি প্রথমে।
