অবশেষে সে তার স্বামীকে বলল, ও জন, কী ভয়ঙ্কর কথা! এখন আমরা কি করব?
কাজ। এখন আমাদের একমাত্র উচিত কাজ করা, এখন কাজই আমাদের মুক্তির একমাত্র উপায়। বেশি চিন্তা করলে আবার পাগল হয়ে যেতে হবে।
ক্লেটনের প্রথম চিন্তা হলো রাত কাটাবার মত এমন একটা আশ্রয় বা আস্তানা গড়ে তুলতে হবে যেটা হবে বন্য জন্তুর নাগালের বাইরে।
যাই হোক, বাক্স খুলে আগে রাইফেল দুটো ও কিছু গুলি বার করল ক্লেটন যাতে আকস্মিক কোন আক্রমণ হতে আত্মরক্ষা করতে পারে তারা। তারপর দুজনে মিলে রাত্রির আস্তানা গড়ে তোলার জন্য জায়গা দেখতে লাগল।
সমুদ্রের বেলাভূমি থেকে একশো গজ দূরে একটুখানি ফাঁকা জায়গা দেখতে পেল ওরা। ওরা ঠিক করল ঐখানে একটা ঘর তৈরি করবে স্থায়ীভাবে বাস করার জন্য। কিন্তু তার আগে রাত্রিবাসের জন্য একটা আশ্রয় চাই।
গাছের উপর একটা মাচা তৈরি করার জন্য চারটে বড় গাছ বেছে নিল ক্লেটন। মাটি থেকে দশ ফুট উঁচুতে চারটে গাছের উপর আয়তক্ষেত্রাকার এমন একটা মাচা তৈরি করল সে যেটাকে লাফ দিয়েও ধরতে পারবে না কোন জন্তু।
কুড়াল দিয়ে গাছের ডাল কেটে আর জাহাজ থেকে আনা মোটা দড়ি দিয়ে মাচা তৈরির কাজ তখনি শুরু করে দিল ক্লেটন। চারটে মোটা ডালের ঘেরা দিয়ে ছোট ছোট ডাল দিয়ে পাটাতন তৈরি করল মাচার উপর। সেই পাটাতনের উপর ঢালা ঢালা অনেক পাতা বিছিয়ে দিয়ে বিছানার মত নরম করল। মাথার উপরেও অনুরূপভাবে একটা ছাউনি তৈরি করল ক্লেটন। তারপর পালের মোটা কাপড় দিয়ে মাচাটার চারদিকে ঘিরে দিল। সবশেষে এ্যালিসের ওঠা-নামার জন্য একটা মই তৈরি করল।
সন্ধ্যা হবার কিছু আগেই ওদের কম্বল ও বিছানা আর কিছু হালকা জিনিসপত্র মাচার উপর তুলে ফেলল ক্লেটন। তারপর দুজনে উঠে পড়ল মাচার উপর।
সারাদিনের মধ্যে ওরা শুধু নানা জাতের অসংখ্য পাখি ছাড়া আর কোন বড় জন্তু জানোয়ার দেখতে পায়নি। পাখি ছাড়া কিছু বাঁদর দেখেছে। পাখি আর বাঁদরের কিচিমিচি ছাড়া আর কোন জন্তুর ডাক শুনতে পায়নি।
ওরা মাচার উপর বিছানা পেতে বসল। তখন গরম ছিল বলে ক্লেটন পাশের কাপড়গুলো ছাদের উপর তুলে দিল। তখন অন্ধকর ঘনিয়ে আসছিল।
সহসা ক্লেটনের একটা হাত জড়িয়ে ধরে এ্যালিস বলল, দেখ দেখ ওটা কি মানুষ?
অন্ধকারে ভাল দেখা না গেলেও ক্লেটন দেখল সমুদ্রের ধারে উঁচু জায়গাটার উপর বিরাটকায় একটা মানুষের মূর্তি দাঁড়িয়ে যেন কি শুনছে তাদের পানে তাকিয়ে। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর পিছন ফিরে চলে গেল মূর্তিটা।
ক্লেটন গম্ভীরভাবে বলল, অন্ধাকারে ঠিক বুঝতে পারছি না।
এ্যালিস বলল, না জন, ওটা মানুষ নয়, কিম্ভুতকিমাকার এক জন্তু। আমার কিন্তু ভয় পাচ্ছে।
এ্যালিসের কানে কানে অনেক সাহস আর ভালবাসার কথা বলে তাকে শান্ত করল ক্লেটন। তারপর দু’জনে শুয়ে পড়ল।
যাই হোক, তার হাতের কাছে একটা রাইফেল আর একটা রিভলভার রেখে দিল ক্লেটন।
ঘুমে তাদের চোখ দুটো সবেমাত্র জড়িয়ে এসেছে এমন সময় একটা বিরাট সিংহের ডাক শুনতে পেল ওরা। সিংহটা ক্রমশই এগিয়ে এসে ওদের মাচার তলায় দাঁড়িয়ে গাছের উপর আঁচড় কাটতে লাগল। একঘণ্টা ধরে সিংহটা সেখানে থাকার পর চলে গেল। ক্ষীণ চাঁদের আলোয় ক্লেটন দেখল একটা বিরাট জন্তু ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে।
সেরাতে ভাল ঘুম হল না ওদের।
সকাল হতেই হাঁফ ছেড়ে বাঁচল ওরা। রাতটা নিরাপদে কাটিয়ে ওরা বেশকিছুটা স্বস্তি অনুভব করল।
কোনরকমে প্রাতরাশটা সেরে নিয়েই ঘর তৈরির কাজে মন দিল ক্লেটন।
কাজটা খুবই কঠিন এবং এ কাজ শেষ করতে কিছু কম একটা গোটা মাসই লেগে গেল। এক মাসের চেষ্টায় মাত্র একটা ছোট ঘর তৈরি করল ক্লেটন। মোটা মোটা কাঠের গোটাকতক খুঁটি দিয়ে ঘরটাকে দাঁড় করিয়ে সরু কাঠের ছিটে-বেড়া দিয়ে দিল। তার উপর কাদা-মাটি লাগিয়ে দিল পুরু করে। ঘরের এক পাশে ঘাট থেকে কতকগুলো নুড়ি পাথর এনে উনোন তৈরি করল একটা। সরু সরু শক্ত কাঠ দিয়ে ঘরটার মধ্যে একটামাত্র জানালা করল। ক্লেটন যাতে কোন জন্তু চাপ দিলেও তা ভেঙ্গে না যায়। কাঠের। ফাঁক দিয়ে হাওয়া বইবে, আলো আসবে, অথচ তাদের নিরাপত্তা ক্ষুণ্ণ হবে না কোনভাবে।
কেবিনটা দেখতে হলে ঠিক ইংরাজি ‘এ’ অক্ষরের মত। ঘরের ছাদটা লম্বা লম্বা বুনো ঘাস আর। তালপাতা দিয়ে ছাইয়ে দিয়ে উপরে আবার কাদামাটি দিয়ে লেপে দিল। প্যাকিং বাক্সের কাঠগুলোকে একটার পর একটা রেখে পেরেক পিটিয়ে দুটো দরজার কপাট তৈরি করল ক্লেটন। দরজাটা এমন ভারী আর মজবুত হলো যে সে একা সেটা তুলে বসাতে পারছিল না। ঘরের ছাদটা তৈরি হয়ে যেতেই বাক্স পেটরা চেয়ার টেবিল সব ঘরের মধ্যে গুছিয়ে রাখল ওরা।
দ্বিতীয় মাসের শেষের দিকে স্থায়ীভাবে বাসা বাঁধল ওরা ওদের নতুন কেবিনটায়। বন্য জন্তুদের আক্রমণের ক্রমাগত আশঙ্কা আর ভয়ঙ্কর অন্তহীন নির্জনতা ছাড়া ওদের মনোকষ্টের আর কোন কারণ ছিল না।
এমন কি ওদের চারপাশে সারাদিন ধরে যেসব পাখি আর বাঁদর দেখত তারা, ওদের সঙ্গে যেন পরিচিত হয়ে উঠছিল। ওদের কাছে আসতে আর ভয় পেত না তারা।
সেদিন বিকেলবেলায় ক্লেটন তাদের কেবিনটার পাশে আর একটা ঘর তৈরি করার জন্য কাজ করছিল। তার ইচ্ছা ছিল পাশাপাশি আরও কয়েকটা ঘর সে তৈরি করবে। হঠাৎ এক ঝাঁক পাখি আর বাঁদর উঁচু ঢিবিটা থেকে ছুটে এসে ক্লেটনদের চারপাশে ভিড় করে কিচমিচ করতে লাগল জোরে।
