দীর্ঘকাল বন্দী অবস্থায় কাটাবার ফলে অর্ধভুক্ত সম্রাট খুব শুকিয়ে গেছে; শরীরও দুর্বল হয়ে পড়েছে। তবে তার দেহ মোটামুটি অক্ষতই আছে। নিজেদের দেশে ফিরে যাবার পথে সারির জাহাজগুলোতে আনন্দের ঢেউ বয়ে গেল।
জ্যাসন বলল, আমি তোমাদের সঙ্গে ফিরছি না। আমাকে তোমরা জা-র জাহাজে নামিয়ে দাও।
কি বললে? টারজান চেঁচিয়ে বলে উঠল। তুমি এখানেই থেকে যাবে?
আমার কথামতই এই অভিযানের আয়োজন করা হয়েছিল। তাই অভিযানে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার পূর্ণ দায়িত্ব আমার। তাই লেঃ ভন হারে ভাগ্যকে অনিশ্চিতের হাতে ছেড়ে দিয়ে আমি কিছুতেই বহির্জগতে ফিরে যেতে পারি না।
টারজান বলল, কিন্তু তুমি কেমন করে ভন হার্স্টকে খুঁজে পাবে?
জ্যাসন উত্তর দিল, ডেভিড ইনেসকে বলল তার সন্ধানে একটা অভিযানের ব্যবস্থা করে দিতে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস পেলুসিডারের স্থানীয় লোকদের নিয়ে গড়া সেই অভিযাত্রীদল ভন হাস্টকে খুঁজে বের করতে পারবে।
টারজান বলল, তোমার সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ এক মত। তুমি যদি এই নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করতে একান্তই ইচ্ছুক হয়ে থাক তাহলে এখনই তোমাকে জা-র জাহাজে নামিয়ে দেব।
রাইফেল, রিভলবার ও যথেষ্ট গুলি-গোলা নিয়ে জ্যাসন যাত্রার জন্য প্রস্তুত হল। অভিযানের সঙ্গীদের কাছ থেকে একে একে বিদায় নিল।
সকলের সঙ্গে করমর্দন শেষ করে বলল, বিদায় জানা।
মেয়েটি জবাব দিল না। দাদার দিকে ঘুরে দাঁড়াল।
বলর, বিদায় টোয়ার।
বিদায়? কি বলছ তুমি জানা? টোয়ার শুধাল।
যাকে ভালবেসেছি তার সঙ্গেই ফিরে যাচ্ছি আমি, জোরামের লাল ফুলটি স্মিত হেসে জবাব দিল।
বাঁদরদলের রাজা টারজান (টারজান অফ দি এপস)
উপনিবেশসংক্রান্ত সরকারি নথিপত্র ও এক মৃত লোকের ডায়েরী থেকে আমরা জানতে পারি যে লর্ড গ্রেস্টোক বা জন ক্লেটন নামে জনৈক ইংরেজ সামন্তকে একবার আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলবর্তী এক ব্রিটিশ অধিকৃত অঞ্চলে এক জটিল অনুসন্ধান কার্যের জন্য পাঠানো হয়।
আফ্রিকার ইংরেজ বাসিন্দারা প্রায়ই বলাবলি করত সেই ইউরোপীয় জাতির লোকেরা ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে সেখানকার আদিম অধিবাসীদের ধরে নিয়ে গিয়ে ক্রীতদাস করে রাখে।
এই অত্যাচার বন্ধ করার জন্যই ব্রিটিশ উপনিবেশ দপ্তর ব্রিটিশ-অধিকৃত পশ্চিম আফ্রিকার এক নতুন পদ সৃষ্টি করে সেই পদে জন ক্লেটনকে নিযুক্ত করে। তবে তাকে গোপনে এই নির্দেশ দেওয়া হয় যে সে যেন কোন এক ইউরোপীয় মিত্রশক্তি পশ্চিম আফ্রিকার কৃষ্ণকায় ব্রিটিশ প্রজাদের উপর যে অত্যাচার করছে তার এক পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করে।
নিয়োগপত্র পেয়েই একই সঙ্গে আনন্দিত আর দুঃখে অভিভূত হয়ে উঠল ক্লেটন। কিন্তু অন্য দিকে এ কাজের কথা ভেবে ভয় পেয়ে গেল সে, কারণ মাত্র তিন মাস হলো সে সুন্দরী তরুণী এ্যালিস রাদার ফোর্ডকে বিয়ে করেছে। এই সুন্দরী তরুণী স্ত্রীকে আফ্রিকার নির্জন প্রদেশে নিয়ে যেতে হবে ভেবে সত্যিই ভয় পেয়ে গেল সে।
এ্যালিসের খাতিরে সে একাজের দায়িত্বভার প্রত্যাখ্যান করে নিয়োগপত্র বাতিল করে দিতে পারত। কিন্তু এ্যালিসই জেদ ধরল, একাজের ভার নিয়ে তাকে বিদেশে যেতেই হবে এবং তাকেও তার সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে।
১৮৮৮ সালের মে মাসের কোন এক উজ্জ্বল সকালে জন ক্লেটন বা লর্ড গ্রেস্টোক লেডী এ্যালিসকে সঙ্গে নিয়ে ডোভার থেকে আফ্রিকার পথে রওনা হয়।
এক মাস পর তারা পৌঁছল ফ্রীটাউনে। সেখানে তারা ফুবালদা নামে জাহাজে চাপে। এই জাহাজই তাদের নিয়ে যাবে তাদের গন্তব্যস্থানে। কিন্তু গন্তব্যস্থানে পৌঁছবার আগেই তাদের যাত্রাপথে এই জাহাজ থেকে লর্ড গ্রেস্টোক ও লেডী এ্যালিস কোথায় অদৃশ্য হয়ে যায় চিরদিনের মত তা পৃথিবীর কেউ কোনদিন জানতে পারেনি।
ফ্রীটাউন থেকে ক্লেটনরা যাত্রা করার ছ’মাস পর তাদের সেই ছোট্ট জাহাজটার খোঁজে ছ’টা ব্রিটিশ যুদ্ধ জাহাজ দক্ষিণ আতলান্তিকের সমগ্র অঞ্চলটা চষে বেড়ায়। কিন্তু অনুসন্ধানকার্য শুরু করার কিছু পরেই সেন্ট হেলেনা দ্বীপের উপকূলে একটা জাহাজের ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাওয়া যায়। ফলে সেখানেই অনুসন্ধানের ব্যাপারটার সমাপ্তি ঘটে। ধরে নেয়া হল ফুবালদা নামে সেই ছোট্ট জাহাজটা তার সমস্ত যাত্রী ও নাবিকসহ ঢেউ-এর আঘাতে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে ডুবে যায় সমুদ্রগর্ভে।
ওদিকে ফুবালদা জাহাজের বিদ্রোহী নাবিকরা জাহাজের অফিসারদের সব মেরে ফেলার পর তারা পথে জঙ্গলাকীর্ণ একটা ভূ-খণ্ডে নামিয়ে দিয়ে যায় ক্লেটন আর তার স্ত্রীকে।
ভবিষ্যতের সম্ভাব্য বিপদ আর তার মাঝে তাদের অসহায়তার কথা ভেবে ভয়ে শিউরে উঠল ক্লেটন। তবু ঐ বিশাল বনভূমির অন্ধকার গভীরে যে দুর্ভাগ্য তাদের জন্য প্রতীক্ষা করে আছে ঈশ্বরের অনুগ্রহে তা সে দেখতে পেল না ঠিকমত। ফলে ভাগ্যের উপর আত্মসমর্পণ করে চুপ করে রইল।
পরদিন সকালে জাহাজ থেকে একটা ছোট নৌকায় ক্লেটনদের সব মালপত্র নামিয়ে দেওয়া হলো। মাইকেল নিজে তদারক করতে লাগল, ক্লেটনদের কোন জিনিস যেন জাহাজে না থাকে।
উপকূলে ওদের নামিয়ে দিয়ে নদী থেকে বেশ কিছু পানীয় জল ভরে নিয়ে নৌকা নিয়ে আবার জাহাজে ফিরে এল।
মাইকেলদের নৌকাগুলো যখন উপসাগরের শান্ত জলের উপর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ফুবালদার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল তাদের পানে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ক্লেটন আর তার স্ত্রী। আসন্ন বিপদ আর নিবিড় হতাশার অনুভূতিতে তোলপাড় হতে লাগল তাদের বুক দুটো। দেখতে দেখতে ফুবালদার জাহাজটাও যখন ধীরে ধীরে চোখের আড়াল হয়ে দূর দিগন্তে মিলিয়ে গেল তখন এ্যালিস ক্লেটনের গলাটা দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। অবরুদ্ধ আবেগ আর চেপে রাখতে পারল না বুকের মধ্যে।
