বোঝা গেল, নৌ-বহরকে দেখতে পেয়ে উড়োজাহাজটা ঘুরে ঘুরে সেই দিকেই নেমে আসছে।
জ্যাসন বলে উঠল, ওটা আমাদের জাহাজ। ওরা আমাদের বন্ধু।
ক্রমে জাহাজ থেকে জাহাজে খবর ছড়িয়ে পড়ল। যে তাদের মাথার উপরে উড্ডীয়মান বস্তুটি কোন উড়ন্ত সরীসৃপ নয়, একটা উড়োজাহাজ, আর তাতে আছে এবৃনার পেরি ও তাদের প্রিয় সম্রাট প্রথম ডেভিডের বন্ধুর দল।
জ্যাসন গ্রিডলে জনৈক যোদ্ধার হাত থেকে বর্শাটা নিয়ে তার মাথায় লাজোর মাথার রুমালটা বেঁধে একটা পতাকা তৈরি করে সংকেত করলঃ ও-২২০ শোন! এটা পেলুসিডার-সম্রাট প্রথম ডেভিডের নৌ বহর; সেনাপতি আনোরক-এর জা; লর্ড গ্রেস্টোক, দশজন ওয়াজিরি ও জ্যাসন গ্রিডলে জাহাজেই আছে।
সঙ্গে সঙ্গে ও-২২০-এর পিছন দিকের বুরুজে গর্জে উঠল কামান-আন্তর্জাতিক অভিবাদন-রীতির প্রথম সূচনা।
উড়োজাহাজটা আরও নিচে নেমে এলে টারজান শুধাল, তোমাদের সঙ্গে সকলেই আছে তো?
হ্যাঁ, জুনারের জবাব ভেসে এল।
ভন হার্স্ট তোমাদের সঙ্গে আছে কি? জ্যাসনের প্রশ্ন।
না, জুনারের জবাব।
তাহলে একমাত্র সেই হারিয়ে গেল, জ্যাসন বিষণ্ণ গলায় বলল।
তোমরা কি একটা কিছু নামিয়ে দিয়ে আমাদের তুলে নিতে পার? টারজান প্রশ্ন করল।
জুপনার চেষ্টা করে জাহাজটাকে জা’র জাহাজের পাটাতনের পঞ্চাশ ফুটের মধ্যে নামিয়ে আনল। একটা ঝোলা নামিয়ে দিয়ে এক এক করে দলের সকলকেই ও-২২০-তে তুলে নিল; প্রথমে ওয়াজিরি, তারপর জানা ও টোয়ার, তারপর জ্যাসন ও টারজান; তিন কোরসারকে জা-র বন্দী রূপে রেখে দেয়া। হল।
নৌ-বহরটি ধীরে ধীরে চলতে শুরু করল। ও-২২০-ও উড়ে চলল তার মাথার উপর দিয়ে। অনেকদিন পরে একত্র হয়ে অনেক কথা আলোচনা করল, অনেক স্মৃতি-কথা শোনাল।
দূরে দেখা দিল কোরসারের উপকূল-রেখা। তখন একটা ঝোলা নামিয়ে দিয়ে জাকে তুলে নেয়া হল ও-২২০-তে। সেখানে ডেভিডকে উদ্ধারের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হল। জা তার জাহাজে ফিরে এসে লাজো ও অপর দুই কোরসারকে ও-২২০-তে তুলে দিল।
জ্যাসন ও টারজান তিন বন্দীকে সঙ্গে নিয়ে প্রকাণ্ড উড়োজাহাজটাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাল। সব দেখে শুনে তারা তো একেবারে থ। কামান ও বোমা দেখিয়ে জ্যাসন বলল, এর একটা ছুঁড়লেই তোমাদের কিড-এর রাজপ্রাসাদটা হাজার ফুট আকাশের দিকে উড়ে যাবে। আর দেখতেই পাচ্ছ সে-রকম বোমা আমাদের হাতে অনেকগুলো আছে। আমরা ইচ্ছা করলেই গোটা কোরসার ও তার নৌ-বহরকে ধ্বংস করে ফেলতে পারি।
তারপরই ও-২২০ পূর্ণ গতিতে ছুটে চলল কোরসারের দিকে। শহরের মাথার উপর দিয়ে সেটাকে উড়তে দেখে কোরসারের রাজপথে ও গৃহ-প্রাঙ্গণে ভিড় জমে গেল। ভীত, বিস্মিত দৃষ্টিতে সকলেই তাকিয়ে রইল আকাশের দিকে।
শহরের তিন হাজার ফুট উপরে জাহাজটা থামল। তিন কোরসার বন্দীকে টারজান ডেকে পাঠাল।
বলল, তোমরা জান, কোরসারকে ধ্বংস করার ক্ষমতা আমরা রাখি। পেলুসিডার-সম্রাটকে উদ্ধার করতে যে বিরাট নৌ-বহর আসছে তাও তোমরা দেখেছ। তার সঙ্গে আছে আমাদের এই উড়োজাহাজ। এখান থেকে আমরা শহর লক্ষ্য করে বোমা ছুঁড়ব। তোমাদের গুলি কখনও এতদূরে পৌঁছবে না। এ অবস্থায় তোমার কি মনে হয় না লাজো যে আমরা কোরসার অধিকার করতে পারব?
আমি তা জানি, লাজো জবাব দিল।
খুব ভাল কথা, টারজান বলল। একটা সংবাদ দিয়ে আমি তোমাকে কিডের কাছে পাঠাব। তাকে তুমি সত্য কথাই বলবে তো?।
বলব, লাজো জবাব দিল।
খুবই সহজ সংবাদ। তাকে বলবে, পেলুসিডারের সম্রাটকে মুক্ত করতেই আমরা এসেছি। কি ভাবে আমাদের সে দাবী আদায় করা হবে তাও তাকে বুঝিয়ে বলবে। তারপর বলবে, সে যদি সম্রাটকে জাহাজে করে নিয়ে গিয়ে আমোরক-এর জার হাতে অক্ষত অবস্থায় তুলে দেয়, তাহলে কোন গোলাগুলি না ছুঁড়ে আমরা সারিতে ফিরে যাব। বুঝেছ?
হ্যাঁ।
ঠিক আছে, বলে ডর্ফের দিকে ফিরে টারজান বলল, এবার ওকে নিয়ে যাবে কি?
লাজোর হাতে একটা প্যারাসুট দিয়ে জ্যাসন বলল, এটাকে ধর। এই রিংটাকে চেপে ধর। তারপর জাহাজ থেকে লাফিয়ে পড়েই সেটাকে ভাল করে একটা ঝাঁকি দিও, বাস্–তাহলেই তুমি স্বচ্ছন্দে মাটিতে নেমে যাবে একটা হাল্কা পালকের মত।
লাজো তবু বলল, আমি মরে যাব।
জ্যাসন বলল, তুমি দেখছি ভয়ানক ভীরু। কিন্তু আমি বলছি, তোমার কোন ক্ষতি হবে না।
লাজোকে কেবিনের দরজার কাছে নিয়ে ডর্ফ সেটাকে সপাটে খুলে দিল।
রিংটাকে ঝাঁকি দিতে ভুলো না, বলেই ডর্ফ সজোরে লাজোকে ঠেলে ফেলে দিল। পরমুহূর্তেই কেবিনের সকলেই দেখল, সাদা পাখনা মেলে প্যারাসুটটা বাতাসের বুকে ঝিল্মিল্ করছে। এবার টারজনের বাণী অবশ্যই কিডের কাছে পৌঁছবে।
একটু পরেই দেখা গেল, দলে দলে লোক চলেছে রাজপ্রাসাদ থেকে নদীর দিকে। একটা জাহাজ নোঙর তুলে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল সারি থেকে আগত নৌ-বহরের দিকে।
ও-২২০ আকাশ পথে তাকে অনুসরণ করে বলল, আর জার জাহাজটা এগিয়ে এল কিডের জাহাজের সঙ্গে মিলিত হতে। আর এই ভাবেই পেলুসিডারের সম্রাট ডেভিড ইনেস ফিরে গেল তার নিজের লোকজনের মধ্যে।
কোরসার জাহাজটা বন্দরে ফিরে গেল। উড়োজাহাজটা নেমে এল সারির নৌ-বহরের খুব কাছাকাছি। ডেভিড ও তার উদ্ধারকারীদের মধ্যে সম্ভাষণ-বিনিময় হল-অথচ তাদের কাউকে সে আগে কখনও দেখে নি।
