তাকে দেখে লোকটিও থেমে গেল। নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। চেঁচিয়ে বলল, টারজান! সত্যি কি তুমি! তুমি তাহলে মারা যাও নি। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, সত্যি তুমি মারা যাও নি।
অরণ্য-রাজের ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল। সবিস্ময়ে বলল, গ্রিডলে! জ্যাসন গ্রিডলে! জানা যে বলল তুমি মারা গেছ!
জ্যাসন বলে উঠল, জানা! তুমি তাকে চেন? তাকে দেখেছ? কোথায় সে?
সে আমার সঙ্গেই আছে, টারজান জবাব দিল। তারপর বলল, চল, ওয়াজিরিদের খুঁজে বের করতে হবে।
অদুরেই অনেক মানুষের কলকণ্ঠ ভেসে এল। রাইফেলধারী দশটি ওয়াজিরি যোদ্ধা টোয়ার ও তিন কোরসারকে ঘিরে ধরে নিয়ে আসছে।
এতক্ষণ উভয়পক্ষই পরস্পরকে শত্রু বলে ধরে নিয়েছিল। এবার টারজান, জ্যাসন ও জানার মধ্যস্থতায় তাদের মধ্যে শান্তি স্থাপিত হল, বন্ধুত্ব গড়ে উঠল।
টারজানকে জীবিত দেখে টোয়ারের বিস্ময়ের সীমা রইল না। জানাকে সুস্থ দেহে নিরাপদে দেখতে পেয়ে আনন্দে ও স্বস্তিতে তার বুকটা ভরে গেল। জানা ছুটে এসে দাদাকে জড়িয়ে ধরল।
দীর্ঘ পরিশ্রম ও ক্লান্তির পরে সকলেই পরিপূর্ণ বিশ্রাম নিল। পরস্পরকে শোনাল তাদের অভিযানের কাহিনী। টোয়ারের ইচ্ছা জানাকে নিয়ে জোরামে ফিরে যাবে। টারজান, জ্যাসন ও ওয়াজিরিদের একমাত্র বাসনা অভিযানের অন্য সঙ্গীদের খুঁজে বের করবে। লাজো ও তার সঙ্গীরা চাইল তাদের জাহাজে ফিরে যেতে।
অনেক আলোচনার পর স্থির হল, আপাতত সকলে মিলে কোরসারেই যাওয়া হবে। তদনুসারে অনেক খাবার-দাবার সঙ্গে নিয়ে একদিন সকলে লংবোট-টাতে চেপে বসল।
অনুকূল বাতাসে লুংবোটের আরোহীরা ভেসে চলেছে সূর্যালোকিত সমুদ্রের বুকে। আর সেই একই পথে আকাশে উড়ে চলেছে ও-২২০ অভিযানের হারানো সঙ্গীদের ব্যর্থ অনুসন্ধানে।
দেখতে দেখতে বাতাস ধেয়ে এল ঝড়ের বেগে, ঢেউ উত্তাল হয়ে উঠল। কাজেই তীরে যাবার চেষ্টা ছেড়ে তারা বাতাসের আগে আগেই চলতে বাধ্য হল। বৃষ্টি নেই, বিদ্যুৎ নেই, আকাশে মেঘ নেই- শুধু প্রচণ্ড ঝড়ের বেগে ধেয়ে আসছে বাতাস; উচ্ছ্বসিত সমুদ্র বুঝি তাদের গিলে খাবে।
কিন্তু ভাগ্যের যাদুবলে নৌকাটা রক্ষা পেল। বাতাস পড়ে গেল। সমুদ্র আবার শান্ত হল। এবার চারদিকে শুধু জল আর জল, তীরভূমির চিহ্নমাত্র চোখে পড়ছে না।
টারজান বলল, উপকূল-রেখা তো হারিয়ে গেল লাজো, এবার আমরা কোরসারের পথ খুঁজে পাব কেমন করে?
লাজা বলল, সেটা খুব সহজ হবে না।
হঠাৎ আঙুল তুলে জানা বলে উঠল, ওটা কি? সকলেরই দৃষ্টি সেই দিকে ঘুরে গেল।
লাজো বলল, একটা পাল। আমরা বেঁচে গেলাম।
কিন্তু ধর জাহাজটা যদি শত্রুর হয়? জ্যাসন বলল।
লাজো বলল, না, তা নয়। কারণ কোরসার ভিন্ন অপর কারও জাহাজ এ সমুদ্রে চলাফেরা করে না।
জানা বলে উঠল, ওই আরেকটা পাল। অনেকগুলো পাল।
সকলে দূরের পালগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। ধীরে ধীরে সেগুলো এগিয়ে আসছে। শেষ পর্যন্ত বোঝা গেল যে একটা বেশ বড় নৌ-বহর তাদের অনুসরণ করছে।
লাজো বলল, ওরা তো কোরসার নয়। ওরকম জাহাজও আমি আগে কখনও দেখি নি।
শত্রু-জাহাজের পাটাতনের উপর একটি লোক উঠে এল। চীৎকার করে বলল, জাহাজ থামাও, নইলে তোমাদের উড়িয়ে দেব।
তুমি কে? জ্যাসন প্রশ্ন করল।
আমি আনোরক-এর জা, আর একটা পেলুসিডার-ম্রাট প্রথম ডেভিডার নৌ-বহর। তোমরা কারা?
আমরা বন্ধু, টারজান জবাব দিল।
কোরসারের সমুদ্রে পেলুসিডার-সম্রাটের কোন বন্ধু থাকতে পারে না।
এবনার পেরি যদি তোমার সঙ্গে থাকে তাহলে আমরা প্রমাণ করে দেব যে তুমি ভুল করছ, জ্যাসন বলল।
জা বলল, এবনার পেরি আমাদের সঙ্গে নেই; কিন্তু তার সম্পর্কে তুমি কি জান?
মার্কিনী সঙ্গীটিকে দেখিয়ে টারজান বলল, এর নাম জ্যাসন গ্রিডলে। হয় তো এবৃনার পেরির কাছে এর নাম শুনে থাকবে। একটা অভিযাত্রী দল নিয়ে বহির্জগৎ থেকে সে এখানে এসেছে কোরসারদের কারাগার থেকে ডেভিড ইনেসকে উদ্ধার করতে।
লংবোটে তিনজন কোরসারকে দেখে জার মনে কিছুটা সন্দেহ জাগলেও সব কথা বুঝিয়ে বলার পরে, বিশেষ করে ওয়াজিরিদের রাইফেলগুলো পরীক্ষা করে দেখার পরে সে এদের সব কথাই সত্য বলে মেনে নিল, সাদরে অভ্যর্থনা করে নিয়ে গেল তাদের জাহাজে। সেখানে তখন নৌ-বহরের অনেকেই। হাজির হয়েছে। মুখে-মুখে খবর ছড়িয়ে পড়েছে যে অপরিচিত এই সব মানুষদের মধ্যে দু’জন তাদের বন্ধু; তারা এসেছে বহির্জগৎ থেকে ইনেসকে উদ্ধার করতে। তাই টারজান ও জ্যাসনকে স্বাগত জানাতে এসেছে অন্য সব জাহাজের ক্যাপ্টেনরা। তাদের মধ্যে আছে পেলুসিডার-সম্রাজ্ঞী সুন্দরী ডিয়ানের ভাই শক্তিমান ডেকর; তুরীয়দের সর্দার গুর্কের কোল্ক; আর সারির রাজা লোমশ ঘক-এর ছেলে টানার। তাদের কাছেই টারজান ও জ্যাসন জানল যে এই নৌ-বহরও চলেছে ডেভিডকে উদ্ধার করতে।
টানার প্রশ্ন করল, তোমরা কি করে আশা করতে পারলে যে মাত্র এক ডজন লোক নিয়ে ডেভিডকে উদ্ধার করতে পারবে?
টারজান বলল, আমাদের সব লোক এখানে নেই। আমরা দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি, আর তাদের খুঁজে পাচ্ছি না। অবশ্য আমাদের দলে তোক খুব বেশি নয়। সম্রাটকে উদ্ধারের ব্যাপারে লোকবল অপেক্ষা অন্য বলের উপরেই আমরা নির্ভর করেছি।
ঠিক সেই মুহূর্তে জাহাজ থেকে হৈ-চৈর শব্দ ভেসে এল। উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল সর্বত্র। সকলেই আকাশের দিকে তাকিয়ে কি যেন দেখাচ্ছে। ইতোমধ্যেই কেউ কেউ কামানের নলকে সেই দিকে তুলে ধরেছে; সকলেই রাইফেলে গুলি ভরতে ব্যস্ত। টারজান ও জ্যাসন উপরে তাকাতেই দেখল তাদের মাথার উপরে ও-২২০।
