অন্ধকার কারাগারে বসে বুড়ো টাইমার মেয়েটির কথাই ভাবছিল। এদের কবল থেকে কেমন করে তাকে উদ্ধার করবে সেই চিন্তাই এখন তার কাছে বড় হয়ে উঠেছে। এমন সময় কে যেন ঘরে ঢুকল। অন্ধকারে তাকে চিনতে পারল না, কিন্তু কথা শুনেই বুঝতে পারল যে, লোকটি তার পূর্ব-পরিচিত সর্দার বোবোলো।
বোবোলো বলল, আমি হয়তো তোমাকে সাহায্য করতে পারি। এখান থেকে বাইরে যেতে চাও তো?
নিশ্চয় চাই।
আমি তোমাকে সাহায্য করব। কিন্তু তার জন্য দাম চাই।
কত?
দশটা হাতির দাঁত।
বুড়ো টাইমার শিস দিয়ে উঠল। বলল, সেই সঙ্গে একটা স্টিম-ইয়াট আর একটা রোলস রয়েসও চাই তো?
কিছু না বুঝেই বোবোলা ঘাড় নাড়ল, হ্যাঁ।
অনেক কথা-কাটাকাটির পর স্থির হল, বুড়ো টাইমার তার আংটিটা দেবে। সেই আংটি নিয়ে বোবোলো যাবে তার সঙ্গী কিডের কাছে। সেটা দেখেই কিভ চিনতে পারবে এবং বোবোলোর দাবীমত তাকে দশটা দাঁত দিয়ে দেবে। আর বুড়ো টাইমারও ছাড়া পাবে।
বুড়ো টাইমারের পিছনে গিয়ে বোবোলো তার আঙ্গুল থেকে আংটিটা খুলে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। মনে মনে বলল, আংটি আর হাতির দাঁত দুইই হাতিয়ে নেব। বুড়ো টাইমার এবার গভীর গাড়ায়।
ওদিকে গাটো মুঙ্গু অন্য সর্দারদের নিয়ে আলোচনায় বসেছে, নতুন বন্দীকে নিয়ে কি করা যায়। বোবোলো এসে তাদের সঙ্গে যোগ দিল। নানা জনের নানা মত। সকলেরই গলা সপ্তমে চড়া।
হঠাৎ তাদের আলোচনায় বাধা পড়ল। যে গাছের নিচে বসে আলোচনা চলছিল তার ডালে একটা সরু সরু শব্দ উঠল, আর পরক্ষণেই একটা ভারী জিনিস কে যেন ছুঁড়ে দিল তাদের ঠিক মাঝখানে। সভয়ে তারা উপরে তাকাল; অন্ধকারে কিছুই দেখতে পেল না। নিচে তাকিয়ে দেখল, তাদের পায়ের কাছে পড়ে আছে একটা মানুষের মৃতদেহ। তার হাত-পা বাঁধা, আর গলাটা এ-কান থেকে ও-কান পর্যন্ত কাটা।
গাটো মুঙ্গু ফিসফিস্ করে বলল, এ তো সেই উটোঙ্গা লুপিঙ্গু। এই তো আমাদের গোপনে খবর এনে দিয়েছিল।
একজন বলল, তারা বিশ্বাসঘাতককে শাস্তি দিয়েছে।
বোবোলো বলল, কিন্তু তাকে গাছের উপর তুলে আমাদের দিকে ছুঁড়ে দিল কে?
সকলেই একে-অন্যের মুখের দিকে তাকাতে লাগল। বোবোলোই আবার মুখ খুলল, ওরান্ডোর এক মুজিমোর কথা আমরা শুনেছি। সেই সাদা মানুষ নাকি টুম্বাইয়ের ওঝা সোবিটোর চাইতেও বেশি শক্তিশালী। হয় তো সেই লুপিঙ্গুকে এখানে ফেলে দিয়েছে। আমাদের সতর্ক করে দিয়েছে। কাজেই বন্দীকে অবিলম্বে প্রধান পুরোহিতের কাছে নিয়ে যাওয়া উচিত। সে যা ভাল বোঝে তাই করবে। বন্দীকে যদি মেরেও ফেলে তো সে দোষ আমাদের উপর বর্তাবে।
একজন বলল, খুব বুদ্ধিমানের মত কথা বলেছ।
পাতার ফাঁক দিয়ে মুজিমো সবই দেখতে পাচ্ছিল। নিয়ামওয়েগির আত্মা ঘুমিয়ে পড়েছে তার কাঁধের উপরে। সে দেখল, সাদা বন্দীটিকে সকলে টানতে টানতে নিয়ে চলেছে। তার পায়ের বাঁধন খুলে দেয়া হয়েছে। নদীর তীরে পৌঁছে ছোট ছোট ডোঙ্গার একটা বহর (প্রায় ত্রিশটা ডোঙ্গা) তারা জলে ভাসিয়ে দিল। প্রায় তিনশ’ সৈনিক তাতে চড়ে বসল। গায়ে-মুখে রং-করা অসভ্য লোকগুলোকে নিয়ে সবগুলো ডোঙ্গা ভাটির স্রোতে তরতর করে চলতে লাগল।
নিয়ামওয়েগির আত্মাকে কাঁধে নিয়ে মুজিমোও গাছ থেকে নেমে নদীর সমান্তরাল পথটা ধরে এগোতে লাগল।
ঘটনাক্রমে বুড়ো টাইমার ও বোবোলো এক ডোঙ্গাতেই উঠেছে।
মন্দিরের কাছে পৌঁছে সকলে ডোঙ্গা থেকে নামল। সকলে মিলে মিছিল করে ঢুকল মন্দিরের সেই বড় ঘরটায়। ঘরটা লোকজনে ভর্তি। সকলে যার যার নির্দিষ্ট আসনে বসল। বুড়ো টাইমারের সাগ্রহ চোখ দুটি বৃথাই সাদা মেয়েটির সন্ধানে চারদিকে ঘুরতে লাগল। সেখানে সে নেই।
ছোট বেদীটার উপর দাঁড়িয়ে আছে প্রধান পুরোহিত। তার নিচে ও চারদিকে অনেক ছোট পুরোহিতের ভিড়। পাশেই ভারী দণ্ডের সঙ্গে শিকল দিয়ে বাঁধা রয়েছে। একটা প্রকাণ্ড চিতাবাঘ; নিচের জনতার দিকে তাকিয়ে গরু-গ করছে। বুড়ো টাইমারের মনে হল, সেটা যেন এই সব কালো মানুষদের পাশবিক ধর্মের এক মূর্ত প্রতীক।
প্রধান পুরোহিত তাদের উদ্দেশ্য করে বলতে লাগল, হে চিতা-দেবতা, তোমার সন্তানরা তাদের এক শত্রুকে বন্দী করেছে। তোমার মহামন্দিরে তাকে নিয়ে এসেছে। এখন তোমার কি ইচ্ছা?
মহূর্তের জন্য সব নিশ্চুপ। সকলেরই চোখে প্রধান পুরোহিত ও চিতাবাঘের উপর নিবদ্ধ। তারপরই ঘটল এক অলৌকিক ঘটনা। সাদা মানুষটির শরীর ঠাণ্ডা হয়ে এল; চুল উঠল খাড়া হয়ে। চিতাবাঘের মুখ থেকে বের হল মানুষের ভাষা। এ যে অবিশ্বাস্য; অথচ সে তো নিজের কানেই শুনল : চিতা-দেবতার সন্তানরা যাতে খেতে পারে তার জন্য তাকে মেরে ফেলা হোক। কিন্তু তার আগে মন্দিরের নতুন প্রধান সন্ন্যাসীকে এখানে আনা হোক; আমার ভাইয়ের নির্দেশে লুলিমি তাকে এনেছে বহু দূর দেশ থেকে; আমার সন্তানরা তাকে একবার দেখুক।
অন্য তিনশ’ জনের সঙ্গে বুড়ো টাইমারের দৃষ্টি পড়ল বেদীর পিছনকার খোলা দরজার উপরে। অস্পষ্ট একটি মূর্তি অন্ধকারের ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে দ্বারপথে দাঁড়াল; মশালের আলো পড়ল তার উপর।
বিস্ময় ও আতংকের একটা চীৎকার স্তব্ধ হয়ে গেল সাদা মানুষটির কণ্ঠতালুতে। এ মূর্তি যে সেই মেয়ের যাকে সে খুঁজছে।
অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেল। বেদীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে ইমিগেগ অনবরত বিড় বিড় করে কি যেন বলতে লাগল; কখনও কোন ছোট সন্ন্যাসী বা সন্ন্যাসিনীকে উদ্দেশ্য করে, কখনও বা চিতা-দেবতার উদ্দেশ্যে। আর যখনই চিতা-দেবতা জবাব দেয় তখনই সমবেত সৈনিকরা ভয়ে আঁতকে ওঠে।
