এক সময় মাথার উপরে একটা শক্ত ডাল দেখতে পেয়ে এক লাফে সেটাকে ধরে ফেলে টারজান বিদ্যুৎ গতিতে গাছের মগডালে ঘন পাতার আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল। এত দ্রুত ব্যাপারটা ঘটে গেল যে হরিবরা কেউ কিছু বুঝবার আগেই সে হাওয়া হয়ে গেল।
কিছুটা পিছন থেকে জানাও তাকে পালাতে দেখল। জোরামের লাল ফুলের মন থেকে আশার শেষ ক্ষীণ শিখাটাও নিভে গেল। টারজানকে সে দোষ দিল না, তবু সে মনে মনে জানল যে জ্যাসন তাকে এভাবে ছেড়ে যেতে পারত না।
বাতাসে ভেসে আসা গন্ধকে অনুসরণ করে টারজান অতি দ্রুত গাছপালার ভিতর দিয়ে এগিয়ে চলল। বিশাল পেলুসিডারের অন্ধকার বনের মধ্যে এই গন্ধ তার নাকে আসবে সেটা যতই অবিশ্বাস্য হোক তবু এই গন্ধ যাদের কাছ থেকে আসছে তাদের অস্তিত্বকে সে কখনও সন্দেহ করেনি।
এক সময় সে নিচের স্তরে নামতে লাগল। গন্ধটাও ক্রমেই তীব্রতর হচ্ছে। নামতে নামতে যখন বনের এক কোণে মাটিতে তার পা পড়ল তখন দশটি দীর্ঘদেহী যোদ্ধার বিস্মিত দৃষ্টির সামনে সে যেন। নেমে এল স্বর্গের দেবদূতের মত।
বিস্ময়-বিস্ফারিত চোখে মুহূর্তকাল তার দিকে তাকিয়ে থেকে তারা ছুটে গেল তার দিকে, তার সামনে নতজানু হয়ে তার হাত দুটিতে চুমো খেতে লাগল। তারা চীৎকার করে বলতে লাগল, ওঃ, বাওয়ানা, বাওয়ানা, সত্যি কি তুমি এলে! মুলুঙ্গু তার সন্তানদের প্রতি কৃপা করেছে; তাদের বড় বাওয়ানাকে জীবিত অবস্থায় ফিরিয়ে দিয়েছে।
টারজান বলল, কিন্তু বাছারা, তোমাদের উপর আমি একটা কাজের ভার দিচ্ছি। সর্প-নররা পিছনেই আসছে; তাদের সঙ্গে আছে একটি বন্দিনী মেয়ে। তোমাদের সঙ্গে রাইফেল রয়েছে। আশা করি প্রচুর গুলিও আছে।
যতদূর সম্ভব বর্শা ও তীর ব্যবহার করে আমরা প্রচুর গুলি হাতে রেখেছি বাওয়ানা।
খুব ভাল করেছ। এবার সে সব দরকারে লাগবে। উড়োজাহাজটা থেকে আমরা কতটা দূরে আছি?
তা তো জানি না, মুভিরো বলল।
জান না? টারজান বলল।
না বাওয়ানা, আমরা পথ হারিয়ে ফেলেছি।
জাহাজ থেকে দূরে এসে তোমরা কি করছিলে? টারজান প্রশ্ন করল।
গ্রিডলে ও ভন হস্টের সঙ্গে আমরা তোমাকেই খুঁজতে বেরিয়েছিলাম বাওয়ানা।
তারা কোথায়? টারজান শুধাল।
অনেক দিন আগে আমরা গ্রিডলের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি; তারপর থেকে আর তাকে দেখিনি।
তারা আসছে। টারজান সকলকে সতর্ক করে দিল।
আমিও শুনতে পেয়েছি বাওয়ানা, মুভিরো বলল।
এবার দেখবে কিছু ভয়ঙ্কর মানুষ, টারজান বলল; তবে তাদের চেহারা দেখে ভয় পেয়ো না। তোমাদের বুলেটই তাদের সাবাড় করবে।
মুভিরো সদর্পে বলল, কোন ওয়াজিরিকে কখনও ভয় পেতে দেখেছ বাওয়ানা?
টারজান হাসল। বলল, একজনের রাইফেল আমাকে দাও, তারপর জঙ্গলের মধ্যে ছড়িয়ে পড়। ঠিক কোন্ পথে তারা যাবে তা জানি না। যে কেউ তাকে দেখবে অমনি গুলি চালাবে মেরে ফেলতে। কিন্তু মনে রেখো, তাদের একজনের সামনে মেয়েটি আছে। খুব সাবধান, মেয়েটির যেন কোন ক্ষতি না হয়।
কথা শেষ হবার আগেই প্রথম হরিবটি দর্শন দিল। সঙ্গে সঙ্গে গর্জে উঠল রাইফেল। অগ্রগামী হরিবটি ছিটকে মাটিতে পড়ে গেল। গোরোবর ছুটিয়ে ধেয়ে এল বাকি হরিবরা। পরপর গর্জে উঠল টারজান ও অন্যদের হাতের আগ্নেয়াস্ত্র। পরাজয় কাকে বলে তা তারা জানত না; এবার জানল। প্রতিপক্ষের হাতের আগুন-খেকো অস্ত্রের বিরুদ্ধে এটে ওঠা যাবে না বুঝতে পেরে বাকি হরিবরা ইতস্তত ছুটতে লাগল।
এতক্ষণের মধ্যেও টারজান জানার দেখা পায়নি। ভাল করে দেখল, একটা দূরন্ত গতি গোরোবরের। পিঠে চড়ে বিদঙ্গতিতে সে ছুটে চলে যাচ্ছে। আর ঠিক সেই মুহূর্তে একটা সওয়ারবিহীন গোয়োবর পিছন থেকে ধাক্কা মেরে তাকে মাটিতে ফেলে দিল। পুনরায় উঠে দাঁড়াবার আগেই জানা ও তার। অপহরণকারী দূরের গাছপালার আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল।
অন্ধকার বনের পথে ছুটে চলেছে টারজান। দূর থেকে ছুটন্ত হরিবকে দেখতে পেয়েই টারজান একটা গাছে উঠে তাদের অনুসরণ করে চলল। ক্রম সে এমন একটা জায়গায় পৌঁছে গেল যেখানে তার ঠিক নিচের হরিবটা জানাকে টানতে টানতে নিয়ে চলেছে।
কালবিলম্ব না করে একটা জীবন্ত বর্শার মত টারজান সোজা লাফিয়ে পড়ল হরিবের পিঠের উপর। সেই ধাক্কাতেই সেটা মাটিতে পড়ে গেল। পেশীবহুল হাতে তার গলাটা পেঁচিয়ে ধরে টারজান সেটাকে টেনে তুলে নিজেও সোজা হয়ে দাঁড়াল। তারপর সেটাকে দুই হাতে মাথার উপর তুলে বার কয়েক ঘুরিয়ে সজোরে মাটিতে ছুঁড়ে দিল।
শেষ পর্যন্ত যখন বুঝতে পারল যে হরিবটা চিরদিনের মত স্তব্ধ হয়ে গেছে, তখন টারজান নিচু হয়ে তার পাথরের ছুরিটা নিয়ে নিল। মাটি থেকে তুলে নিল তার বল্লমটা। জানার দিকে ফিরে বলল, এস, এখানে আমাদের জন্য একটি মাত্র নিরাপদ স্থানই আছে। বলেই জানাকে কাঁধে তুলে নিয়ে সে এক লাফে গাছে চড়ে বসল।
মুভিরো ও তার দলকে যেখানে শেষ দেখেছিল সেই দিকেই তারা দ্রুত ফিরে চলল। এমন সময় শুনতে পেল অনেক পায়ের শব্দ তাদের দিকেই এগিয়ে আসছে।
মেয়েটিকে একটা মোটা ডালের আড়ালে লুকিয়ে রেখে টারজান নিঃশব্দে অপেক্ষা করতে লাগল।
মুহূর্তমাত্র অপেক্ষা করার পরেই নিচে দেখা দিল একটি প্রায় উলফঙ্গ মানুষ। কোমরে জড়ানো এক ফালি নোংরা ছাগলের চামড়া; তাও কাদায় মাখামাখি; সারা দেহেও কাদার প্রলেপ। এই ঘন জঙ্গলের মধ্যে সে একাকি কি করছে বুঝতে না পেরে টারজান এক লাফে তার ঠিক সামনে মাটিতে নেমে এল।
