সে চেঁচিয়ে বলল, হা ঈশ্বর! ওরা কারা?
টোয়ার কাঁপতে কাঁপতে বলল, ওরা হরিবের দল। ওদের হাতে পড়ার চাইতে মরা ভাল।
স্রোতের টানে ও বৈঠার বেগে ভারী নৌকাটা সোজা ছুটে চলেছে সেই ভয়ংকর বীভৎস জীবগুলোর দিকে। দূরত্ব ক্রমেই কমে আসছে। সামনের গলুই থেকে একটা বন্দুক গর্জে উঠল। হরিবরা নৌকার সামনে থেকে সরে গেল। কিন্তু পরমুহূর্তেই তারা নৌকার দুই পাশ বরাবর ছুটতে লাগল। গাদা বন্দুক থেকে সমানে বের হচ্ছে আগুন ও ধোঁয়া, ছুটছে তার ভিতরকার লোহা ও পাথরের টুকরো। কিন্তু হরিবদের ভ্রূক্ষেপ নেই। একটা পড়ছে তো দুটো এগিয়ে সে তার জায়গা নিচ্ছে।
নৌকার জীবিত আরোহীর সংখ্যা ক্রমে মুষ্টিমেয় হয়ে এল। হরিবরা তখন বাহনদের ছেড়ে প্রতিপক্ষের নৌকার উপর লাফিয়ে পড়তে লাগল। বাঁকা তলোয়ার ও গাদা বন্দুকের মৃত্যুলীলা সমানেই চলতে লাগল; কিন্তু বিপুল সংখ্যাধিক্যে বলীয়ান সর্প-নরের দল অবশিষ্ট কোরসারদের প্রায় ঢেকে ফেলল।
যুদ্ধ শেষ হল। তখন বেঁচে আছে মাত্র তিনজন কোরসার। লাজো তাদের মধ্যে একজন। হরিরা তাদের হাত বেঁধে তীরে নামালো। গুরুতর আহতদের ছুরির আঘাতে আঘাতে শেষ করল। জ্যাসন ও টোয়ারকে অক্ষত অবস্থায় দেখে তাদেরও হাত বেঁধে তীরে নামিয়ে কোরসারদের পাশেই রেখে দিল।
টোয়ার বলল, তুমি জান ওরা কারা? আগে কখনো ওদের দেখেছ?
লাজো বলল, হ্যাঁ, জানি, তবে এই প্রথম ওদের দেখা পেলাম। ওরা হরিবের দল–সর্প-নর বেলা আম ও গিয়র কোর্সের মধ্যবর্তী অঞ্চলে বাস করে।
ক্লান্ত দেহে, অবসন্ন মনে জ্যাসনও একসময় ঘুমিয়ে পড়ল।
উঠে দাঁড়াও। একজন হরিবের কর্কশ ডাকে জ্যাসনের ঘুম ভেঙে গেল। তোমার হাতের বেড়ি খুলে দিচ্ছি। পালাতে পারবে না। সে চেষ্টা করলেই মরবে। আমার সঙ্গে এস।
ওদিকে অন্য সব হরিবরা উঠে দাঁড়িয়ে শিসের মত একটা বিচিত্র শব্দ করে ডাকতে লাগল, আর সে ডাক শুনে জল থেকে উঠে ও জঙ্গলের ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে তাদের বাহনরা সার বেঁধে দাঁড়িয়ে পড়ল।
সকলেই যার যার বাহনে চড়ে বসল। পাঁচ বন্দীকে বসিয়ে নিল পাঁচ আরোহীর সামনে। তারপর সেই বিচিত্র মিছিল এগিয়ে চলল সূর্যহীন অন্ধকার ঘন অরণ্যের পথে।
বন পার হয়ে তারা সূর্যের আলোয় পৌঁছে গেল। দূরে জ্যাসনের চোখে পড়ল একটা হ্রদের ঝিলমিল জল।
হ্রদের তীরে পৌঁছে একটি হরিব হঠাৎ টোয়ারের মুখ চেপে ধরে বুড়ো আঙ্গুল ও তর্জনীর চাপে নাকটা আটকে দিয়ে তাকে সঙ্গে নিয়ে হ্রদের জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। একটু পরেই দু’জন ডুবে গেল।
একটু পরে আর এক হরিব এসে লাজোকে নিয়ে সেই একইভাবে হ্রদের জলে ডুব দিল। বাকি দুজন কোরসারেরও সেই একই দশা হতে দেরী হল না।
এবার তার পালা। হরিবের হাত থেকে ছাড়া পেতে জ্যাসন প্রাণপণ চেষ্টা করল। কিন্তু সেই চটচটে হাতের মুঠি আলগা হল না। তাকে নিয়ে সেও অতি দ্রুত জলের নিচে নেমে গেল। একটু পরেই আঠালো কাদার উপর দিয়ে তাকে টেনে নিয়ে চলল। একটু বাতাসের জন্য তার ফুসফুসটা যন্ত্রণায় চীৎকার করে। উঠল, সব ইন্দ্রিয় অবশ হয়ে এল, মুহূর্তের জন্য সব কিছু অন্ধকারে ঢেকে গেল। কিন্তু তার চাইতেও গাঢ়তর নরকের অন্ধকার গর্তের ভিতরে তাকে টেনে নিয়ে যাওয়া হল। তার পরেই তার মুখ ও নাকের উপর থেকে হাতটা সরিয়ে নেয়া হল। ধীরে ধীরে চেতনা ফিরে এলে সে বুঝল যে সে ডুবে যায় নি; কাদার উপর শুয়ে প্রশ্বাসের সঙ্গে টেনে নিচ্ছে বাতাস, জল নয়।
তার চারদিক ঘিরে নেমে এল পরিপূর্ণ অন্ধকার। একটা চটচটে শরীর তার শরীরের উপর দিয়ে সস করে চলে গেল; তারপর আর একটা–আরও একটা। জলের একটা ছলাৎছলাৎ, গড়গড় শব্দ, তারপর নীরবতা-কবরের নীরবতা।
বিস্তীর্ণ সমতল ভূমিতে পৌঁছবার পরে টারজান ও জানাও পড়ল হরিবদের কবলে। কিন্তু একদল সশস্ত্র প্রাণীর দ্বারা পরিবৃত হয়েও বিনা বাধায় অস্ত্র সমর্পণের ইচ্ছা অরণ্য-রাজের নেই। সে বলল, আমাদের নিয়ে তোমরা কি করতে চাও?
একটা হরিব বলল, তোমাদের নিয়ে যাব আমাদের গাঁয়ে; পেট ভরে খাওয়াব। হরিবদের কাছ থেকে কেউ পালাতে পারে না, সে চেষ্টা করো না।
টারজান তবু ইতস্তত করতে লাগল। জোরামের লাল ফুলটি তার আরও কাছে গিয়ে চুপি চুপি বলল, ওদের সঙ্গেই চল। তাহলে হয় তো পরে পালাবার কোন সুযোগ মিলতেও পারে।
মাথা নেড়ে টারজান হরিবের দিকে ফিরে বলল, আমরা প্রস্তুত।
অন্ধকার বনের পথ ধরে তারা এগিয়ে চলল।
জঙ্গলে ঢোকার পর থেকেই টারজান বুঝতে পেরেছে যে ইচ্ছা করলেই এখন সে পালাতে পারে। এক লাফে যে কোন একটা নিচু ডাল ধরতে পারলেই চোখের নিমেষে এক ডাল থেকে আর এক ডালে উঠে সে এমন ভাবে হাওয়া হয়ে যাবে যে কোন হরিবের সাধ্য নেই তাকে ধরতে পারে। কিন্তু সে তো জানাকে ফেলে যেতে পারে না। তাকে সব কথা বলার মত সুযোগও পাচ্ছে না। কাজেই সে সুযোগের জন্যই অপেক্ষা করতে লাগল।
এক সময় পাগলা হাওয়ায় এমন একটা গন্ধ তার নাকে এসে লাগল যা সে জীবনে আর কখনও পাবে বলে আশাও করতে পারেনি। এই পরিচিত গন্ধ যাদের গা থেকে আসছে তারা আছে সামনের দিকে। অতএব পালাবার সুযোগ এসেছে। কিন্তু দু’জন একই সঙ্গে পালানো সম্ভব নয়। মেয়েটিকে নিরাপদ করতে হলে আগে তাকে পালাতে হবে। তারপর
