জোরামের লাল ফুলটিকে খুঁজে পাবার আশায় জ্যাসন গ্রিডলে পাহাড়ের চড়াই ভেঙ্গে ফেলির গ্রামের দিকে ছুটে চলেছে; বোনকে উদ্ধার করতে বা প্রতিশোধ নিতে বর্শা ও ছুরি হাতে তার পাশে চলেছে টোয়ার।
কোন রকম বিপদের আশংকা করে তারা পাহাড় বেয়ে নেমে গাছের নিচেকার ঘন ঝোপের ভিতরে ঢুকে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে একজন মানুষ লাফিয়ে পড়ে তাদের মাটিতে ফেলে দিল। মুহূর্তের মধ্যে দু’জনকে নিরস্ত্র করে পিঠমোড়া কের তাদের হাত বেঁধে ফেলল। তারপর ঝাঁকি দিয়ে দু’জনকে দাঁড় করিয়ে দিতেই আক্রমণকারীদের দিকে চোখ পড়ামাত্র জ্যাসন গ্রিডলের চোখ বিস্ময়ে একেবারে ছানাবড়া হয়ে গেল।
সে চেঁচিয়ে বলে উঠল, আরে কী আশ্চর্য! এখানে এসে গণ্ডার, ম্যামথ, ট্রাকোডন, টেরাডাকিটল ও ডাইনোসরের দেখা পাব তা জানতাম, কিন্তু পেলুসিডারের একেবারে গহন গভীরে ক্যাপ্টেন কিড, লাফিতে ও স্যার হেনরি মর্গানকে দেখতে পাব এ স্বপ্নেও ভাবিনি।
একজন বলল, ওটা কোন ভাষা? তুমিই বা কে? আর কোথা থেকে এসেছ?
ভাষাটা প্রাচীন মার্কিনী, আর আমি এসেছি ইউ, এস, এ থেকে। কিন্তু তোমরা কারা? আর কেনই বা আমাদের বন্দী করেছ?
একজন দাড়িওয়ালা লোক বলল, আমরা জানি তুমি কে বা কোন্ দেশ থেকে এসেছ। আমাদের বোকা বানাতে চেষ্টা করো না।
বেশ তো, তা যদি জানই তো আমাকে ছেড়ে দাও। কারণ তোমরা নিশ্চয় জান যে কারও সঙ্গে আমাদের কোন লড়াই নেই।
বক্তা বলল, তোমাদের দেশ সব সময়ই কোরসারদের সঙ্গে যুদ্ধরত। তুমি তো সারির লোক। তোমার অস্ত্রশস্ত্র দেখেই সেটা বুঝতে পেরেছি। তোমাকে দেখামাত্রই বুঝেছি, তুমি সুদূর সারি থেকে এসেছ। একজন সঙ্গীর দিকে তাকিয়ে বলল, এই তো স্বয়ং টানার। সে যখন কোরসারে বন্দী ছিল তখন তাকে দেখেছিলে কি?
না, তখন আমি জাহাজে ছিলাম। তবে এই যদি টানার হয় তাহলে আমরা অনেক পুরস্কার পাব।
প্রথম বক্তা বলল, এবার জাহাজে ফিরে চল। আর সময় নষ্ট করে কোন লাভ নেই।
জাহাজের লিংবোট’টা তীরে একটা গাছের সঙ্গে বাঁধা ছিল। পাহারায় ছিল পাঁচজন কোরসার।
বন্দীদের নৌকার মধ্যে ঠেলে দিয়ে কোরসাররাও উঠে পড়ল। তীব্র স্রোতের টানে নৌকাটা তত করে ভেসে চলল।
পেরির কাছ থেকে বেতার মারফৎ জ্যাসন পেলুসিডারের টানারদের যে কাহিনী আগেই জানতে পেরেছিল তাতেই কোরসারদের চেহারা ও স্বভাব তার জানাই ছিল। তবু তারা কেউই সামনা সামনি দেখা রক্ত-মাংসের মানুষ ছিল না।
এইসব অসভ্য কোরসার, তাদের নৌকা, তাদের পোশাক ও প্রাচীনকালের আগ্নেয়াস্ত্র দেখেই জ্যাসন স্পষ্ট প্রমাণ পেল যে তারা সহিঃপৃথিবী থেকেই এখানে এসেছে। সে আরও বুঝল, এদের দেখেই ডেভিড ইনেসের মনে দৃঢ় ধারণা জন্মেছিল যে পেলুসিডার থেকে বহিঃপৃথিবীতে যাবার একটা পথ মেরু অঞ্চলের দিকে অবশ্যই আছে।
কাজেই এই অসভ্য লোকগুলোর হাতে পড়ার দুর্ভাগ্যের জন্য টোয়ার খুব হতাশ হলেও জ্যাসন কিন্তু দেখতে পেয়েছে সৌভাগ্যের হাতছানি। সে ধরেই নিয়েছে, এরা তাদের নিয়ে যাবে সেই কোরসার শহরে যেখানে ডেভিট ইনেসকে বন্দী করে রাখা হয়েছে; আর তা যদি হয় তাহলে তো পেলুসিডারের সম্রাটকে উদ্ধারের যে ব্রত নিয়ে তারা এই অভিযানে এসেছে তার প্রথম লক্ষ্যে তারা পৌঁছে যেতে পারবে।
নৌকা ভেসে চলেছে। জ্যাসন ও টোয়ারকে রাখা হয়েছে নৌকার মাঝখানে। তাদের হাত তখনও পিঠমোড়া করে বাঁধা। জ্যাসনের কাছেই যে কোরসারটি বসে আছে সঙ্গীরা তাকে ডাকছিল লাজো বলে। লোকটি প্রথম থেকেই জ্যাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল।
প্রথম সুযোগেই সে লাজোর মনোযোগ আকর্ষণ করতে চেষ্টা করল। লাজো শুধাল, কি চাও?
তোমাদের সর্দার কে? জ্যাসন জানতে চাইল।
সর্দার কেউ নেই। সে আগেই মারা গেছে। তুমি কি চাও?
আমি চাই আমাদের হাতের বাঁধন খুলে ফেলা হোক। আমরা তো পালাতে পারব না। আমরা নিরস্ত্র, আর সংখ্যায় তোমরা অনেক। অথচ এইসব সরীসৃপদের আক্রমণে যদি নৌকাটা ভেঙ্গে যায় বা ডুবে যায়। তাহেল তো হাত-বাঁধা অবস্থায় আমরা একেবারেই অসহায় হয়ে পড়ব।
লাজো ছুরি বের করল। জ্যাসন ও টোয়ারের হাতের বাঁধন কেটে দিল।
আবার চলা শুরু হল। জ্যাসনের মনে হল, এই অজ্ঞাত যাত্রার বুঝি শেষ নেই। তারা অনেকবার খেল, অনেকবার ঘুমাল। সীমাহীন জলাভূমির বুক চিরে নৌকা চলেছে তো চলেইছে। দুই তীরের ঘন। সবুজ বন আর ডালে ডালে নানা রঙের ফুল দেখে দেখে চোখ পচে যাবার উপক্রম হল। তবু চলার শেষ হল না।
এতক্ষণ চুপচাপ বসে কাটালেও এবার জ্যাসন ও টোয়ারকেও কাজে লাগানো হল। তাদের হাতেও তুলে দেয়া হল বৈঠা। বারুদ-ভর্তি গাদা বন্দুক রয়েছে বৈঠাওয়ালাদের পাশে; নৌকার গলুই ও পিছন দিকে সশস্ত্র লোকগুলো চলেছে বাঁ দিকের তীরের দিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখে।
বৈঠা চালাতে চালাতে তাদের দুজনকে খুবই ক্লান্ত হতে দেখে লাজো তাদের কিছুক্ষণের জন্য ছুটি দিল। এমন সময় হঠাৎ নৌকার গলুই থেকে ভয়ার্ত চীৎকার উঠলঃ তারা এসে পড়েছে।
নৌকার মধ্যে সাজ-সাজ রব পড়ে গেল। কোনরকমে ক্লান্ত দেহটাকে টেনে তুলে জ্যাসন তাকিয়ে দেখল বীভৎস সরীসৃপের পিঠে চেয়ে ধেয়ে আসছে মানুষের মতই একপাল জীব। হাতে লম্বা বল্লম। তাদের আঁশওয়ালা বাহনগুলো অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে জলের ভিতর দিয়ে ছুটে আসছে। আর কাছে এলে দেখল, মানুষের মত দেখতে হলেও তারা মানুষ নয়-এক শ্রেণীর বিবিত্র সরীসৃপ-মাথাটা গিরগিটের মত, তাতে সরু কান ও ছোট শিং।
