ফিসফিস্ করে কি বলছ? পিছন থেকে একটা কর্কশ কণ্ঠস্বর ভেসে এল। মুখ ফিরিয়ে তারা দেখল, আভান সর্দার। স্ত্রী মারালকে ডেকে বলল, মেয়েটিকে গুহার মধ্যে নিয়ে যাও। ও কার সঙ্গিনী হবে পরিষদে সেটা স্থির না হওয়া পর্যন্ত ও সেখানেই থাকবে।
জানাকে নিয়ে মারাল চলে যাবার পরে টারজানও উঠে দাঁড়াল। চারদিকে তাকিয়ে দেখল, প্রায় শ’খানেক মানুষ এখানে-ওখানে ছড়িয়ে আছে। আর পালাবার একমাত্র পথ গিরি-নালার মুখের কাছে ঘুরে বেড়াচ্ছে ডজনখানেক যোদ্ধা। একা হলে সে হয় তো ওদের ভিতর দিয়ে পথ করেই চলে যেতে পারত, কিন্তু একটি মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব। সে গুহার মুখের দিকে এগিয়ে চলল। টোয়ারের বোন ও জ্যাসনের বন্ধুকে ফেলে সে নিজে পালাতে পারে না।
উড়ন্ত সরীসৃপটা দ্রুতগতিতে নেমে আসছে একক যোদ্ধাটিকে আক্রমণ করতে। তাকে লক্ষ্য করেই ঝাঁপ দিল জ্যাসন গ্রিডলে। সেই মুহূর্তে তার চোখে ভেসে উঠল একটি লুপ্ত সরীসৃপের ছবি-জুরাসিক পাহাড়ের স্টেগোসরাসের ছবি।
জ্যাসন দেখল, আসন্ন মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও একক যোদ্ধাটির চোখে-মুখে ভয়ের চিহ্নমাত্র নেই। তার এক হাতে ছোট বর্শা, অন্য হাতে পাথরের ছুরি। সে মরবে, কিন্তু বীরত্বের পরিচয় রেখে মরবে।
কিন্তু যোদ্ধাটি বর্শা ছুঁড়বার আগেই জন্তুটা তাদের সামনে এসে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল। নাকটা ঢুকে গেল মাটির মধ্যে। এক পাশে কাত হয়ে পড়ে মরে গেল।
মরে গেল! যোদ্ধাটি অবাক হয়ে বলল। কিসে মরল? আমি তো বর্শা হুঁড়িনি।
কোল্ট রিভলবার দুটো খাপে ভরতে ভরতে জ্যাসন বলল, এরাই মেরেছে।
তার দিকে তাকিয়ে সসম্ভ্রমে যোদ্ধাটি বলল, তুমি কে? জোরামদের দেশে কি করছ?
আমার নাম গ্রিডলে-জ্যাসন গ্রিডলে।
জ্যাসন! হ্যাঁ, জ্যাসন গ্রিডলে, ঠিক বটে। এবার বল, তুমি কি টারজানকে চেন না?
টারজান! তুমি টারজানকে দেখেছ? সে বেঁচে আছে?
আমি তাকে দেখেছি। আমরা এক সঙ্গে শিকার করেছি, তোমাকে ও জানাকে খুঁজেছি; কিন্তু সে বেঁচে নেই, মারা গেছে।
কি করে মারা গেল?
একটা পাহাড়ের মাথায় চড়ে সেটা পার হচ্ছিলাম এমন সময় একটা টিপৃডার ছোঁ মেরে তাকে তুলে নিয়ে গেছে।
টারজান! এ আশংকা তার ছিল, কিন্তু এখন এমন অকাট্য প্রমাণ পাবার পরেও জ্যাসনের মনে হল এ অবিশ্বাস্য। সেই ইস্পাত-কঠিন মানুষটি মরতে পারে না।
জ্যাসনকে চুপ করে থাকতে দেখে যোদ্ধাটি বলল, তাকে তুমি খুব ভালবাসতে, তাই না?
হ্যাঁ, আমরা দুজন এক সঙ্গেই ছিলাম। এখন তো টারজান মারা গেছে, তাই আমি একাই জোরামের লাল ফুলটিকে খুঁজছি।
জ্যাসন বলল, আমিও তো তাকেই খুঁজছি। চল, দুজনে একসঙ্গেই খুঁজব। তোমার নাম কি?
লোকটি বলল, টোয়ার।
বন-জঙ্গল ও জলাভূমিতে ঘেরা অনেক পথ পার হয়ে দু’জন এগিয়ে চলল।
অরণ্য-রাজ নিঃশব্দে গুহার মধ্যে ঢুকে গেল। ভিতরকার স্বল্প আলোয় দৃষ্টি অভ্যস্ত হয়ে এলে সে বুঝতে পারল গুহাটা বেশ বড়। দেয়ালে গা ঘেঁষে খড়ের বিছানায় অনেক যোদ্ধা, কিছু নারী ও শিশু ঘুমিয়ে আছে। টারজান জোরামের মেয়েটির খোঁজে এগিয়ে চলল। সেই তাকে প্রথম চিনতে পেরে নীচু গলায় শিস্ দিয়ে জানিয়ে দিল।
এমন সময় মশাল হাতে একটি ছেলে গুহায় ঢুকল। টারজানকে দেখতে পেয়ে তার কাছে গেল। ছেলেটি ওভান।
সে বলল, পরিষদের সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। তারা তোমাকে মেরে ফেলবে।
টারজান উঠে দাঁড়াল। জানাকে বলল, এস। আর দেরী করা নয়। ওভানের দিকে ফিরে বলল, তুমি নিজেই বলেছ তুমি আমার বন্ধু। আশা করি তুমি চুপ করে থেকে আমাদের পালাবার সুযোগ করে দেবে।
ছেলেটি বলল, আমি তোমার বন্ধু বলেই এখানে এসেছি। বাইরে সশস্ত্র পাহারা। তাদের এড়িয়ে তোমরা পালাতে পারবে না।
কিন্তু এছাড়া আর কোন পথ নেই, টারজান বলল। একটা পথ আছে, আর সেই পথ দেখাতেই আমি এসেছি।
এস আমার সঙ্গে, বলে ছেলেটি গুহার শেষ প্রান্তের দিকে এগিয়ে চলল। তার পিছনে চলল টারজান। ও জানা।
একেবারে শেষপ্রান্তে গিয়ে ওভান থামল। মশালটা মাথার উপরে ধরল। সেই আলোয় দেখা গেল। একটা ছোট ঘরের শেষ প্রান্তে আছে একটা অন্ধকার ফাটল।
ছেলেটি বলল, ওই অন্ধকার গর্তের ভিতর থেকে একটা পথ চলে গেছে পাহাড়ের মাথায়। একমাত্র সর্দার ও তার জ্যেষ্ঠপুত্রই সে পথের খবর জানে। বাবা যদি জানতে পারে যে আমি তোমাদের এই পথটা দেখিয়ে দিয়েছি তাহলে আমাকেও মেরে ফেলবে। রাস্তাটা খুব খাড়া ও এবড়ো-থেবড়ো। তবু এটাই একমাত্র পথ। চলে যাও। আমার জীবন বাঁচিয়েছিলে বলেই তার প্রতিদান দিলাম।
কথা শেষ করেই সে মশালটাকে মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে দিল। গাঢ় অন্ধকারে চারদিকে ঢেকে গেল। ছেলেটি আর কোন কথা বলল না। তার পায়ের শব্দ ধীরে ধীরে দূরে মিলিয়ে গেল।
জানার হাত ধরে টানতে টানতে অনেক কষ্ট করে দু’জনে পাহাড়ের মাথায় উঠে গেল। তখন বলল, এবার? কোন্দিকে জোরাম?
আঙুল দিয়ে দেখিয়ে জানা বলল, ওই দিকে। কিন্তু ও পথে আমরা যাব না। কার্ব ও তার দলবল সবগুলো পাহাড়ি পথের উপরেই নজর রাখবে। কাজেই আমরা সোজা নেমে যাব নিচের সমতল অঞ্চলের দিকে।
নামতে নামতেই যতদূর চোখ যায় ততদূর পর্যন্ত বিস্তৃত একটা সমতলভূমি টারজনের চোখে পড়ল। শেষ পর্যন্ত একটা ঘোরানো গিরি-নালা ধরে চলতে চলতে তার একেবারে মুখে পৌঁছে সেই বিস্তীর্ণ সমতলভূমিতেই পৌঁছে গেল।
