জ্যাসন মারা গেছে! জোরামের লাল ফুলটি মুহূর্তের জন্য নিচে উচ্ছ্বসিত জলস্রোতের দিকে তাকাল। ইচ্ছা হল, ঝাঁপ দিয়ে নিচে পড়ে। তার আর বাঁচবার সাধ নেই। তবু কিসের যেন তাগিদে সে থেমে গেল। আবার সে উপরে উঠতে লাগল।
কালিফোর্নিয়ায় ও আরিজোনায় জ্যাসন গ্রিডলে অনেক ঝড় দেখেছে। খাদের জল তার হাঁটু পর্যন্ত ওঠার আগেই অনেক কষ্টে সে আরও খানিক উপরে একটা নিরাপদ জায়গায় পৌঁছে গেল। সেখানেই। একটা ঝোলানো পাথরের চাইয়ের নিচে সাময়িক আশ্রয় পেয়ে গেল।
পাথরের খাঁজে একটা বাসায় অনেকগুলো ডিম দেখতে পেয়ে তাই খেয়ে আপাতত ক্ষুধার নিবৃত্তি করল। কাছেই একটা বেঁটে গাছ দেখতে পেয়ে পোশাক ছেড়ে সেগুলো শুকোতে দিয়ে তার নিচেই শুয়ে পড়ল।
কতক্ষণ ঘুমিয়েছিল খেয়াল নেই; ঘুম ভাঙলে পোশাকের জন্য হাত বাড়াতেই এ কী! পোশাক তো নেই! চারদিকে তাকাল; কেউ কোথাও নেই। তার ঠিক পাশেই রিভলবার ও গুলির বেল্ট ছিল; সেগুলো যথাস্থানেই রয়েছে।
এক সময় দেখতে পেল, কিছুদূরে একটা গিরি-নালা থেকে ধোঁয়া উঠছে। চুপি চুপি সেখানে পৌঁছে জ্যাসন নিচে উঁকি দিল।
ঝর্ণার ধারে শুয়ে আছে একটি যোদ্ধা। পাশের আগুনে ঝলসানো হচ্ছে একটা মুরগি। যাতে যোদ্ধাটি কোন রকমে সন্দেহ না করে সে জন্য সে স্থির করল সোজাসুজি হেঁটে তার কাছে গিয়ে হাজির হবে। এমন সময় গিরি-নালার অপর দিকের পাহাড়ের মাথায় তার দৃষ্টি পড়ল। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে এমন। একটি প্রাণী যা এর আগে বহিঃপৃথিবীর কেউ কোন দিন দেখেনি-চৰ্মাবৃত একটি বিরাট ডাইনোসর; দৈর্ঘ্যে ষাট-সত্তর ফুট, উচ্চতায় মাটি থেকে পুরো পঁচিশ ফুট। জন্তুটি হাঁটছে টিকটিকির মত চারটে পায়ে ভর রেখে। কিন্তু জ্যাসনকে অবাক করে দিয়ে হঠাৎ বিরাট লেজটাকে নিচে নামিয়ে সেটা সোজা ঝাঁপ দিল পাহাড়ের উপর থেকে।
বাতাসে হিস্-হিস্ শব্দ শুনে নিচের যোদ্ধাটি লাফ দিয়ে উঠে বর্শাটা বাগিয়ে ধরল; আর জ্যাসন গ্রিডলেও এক লাফে ঢালু পাহাড়টার উপর পৌঁছে দুটি বন্দুককেই খাপ থেকে খুলে যোদ্ধাটির দিকে ছুটে গেল।
পথ হারিয়ে পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে টারজান। একটা পাহাড়ের মোড়ে বাক নিতেই একটি ছেলের সঙ্গে একেবারে মুখোমুখি হয়ে গেল। টারজানকে দেখেই ছেলেটি থমকে থেমে গেল। তার হাতে উদ্যত বর্শা ও খাপ-খোলা ছুরি।
অরণ্য-রাজ বলল, আমি টারজান, অরণ্যের রাজা। আমি এসেছি বন্ধুর মত, তোমাকে মারতে নয়।
ছেলেটি বলল, আমি ওভান। কেন তুমি ক্লোভিতে এসেছ?
টারজান পথ হারিয়েছে। সে এসেছে পেলুসিডার থেকে অনেক দূরের এক অন্য জগৎ থেকে। বন্ধুদের হারিয়ে সে তাদেরই খোঁজ করছে। ক্লোভির লোকদের সঙ্গে সে বন্ধুত্ব করতে চায়।
ছেলেটি বলল, খুব ভাল কথা। তুমি আভান সর্দারের সঙ্গে কথা বলতে পার। সে আমার বাবা। তারা যদি তোমাকে মেরে ফেলতে চায় তাহলে আমি তোমাকে সাহায্য করব।
কথা বলতে বলতে দু’জন ক্লোভির দিকে চলতে লাগল।
ক্লোভির লোকজনদের মধ্যে মাত্র অল্প কয়েকজনই টারজানকে ভালবাবে গ্রহণ করল; তাদের মধ্যে আছে ওভানের মা মারাল, আর বোন রেলা।
একদিন মুখে মুখে জয়ধ্বনি শোনা গেল। কার্ব ফিরে এসেছে। জোরামের সর্বশ্রেষ্ঠা সুন্দরীকে নিয়ে ফিরে এসেছে ক্লোভির বিজয়ী যোদ্ধারা। কার্ব মহান! ক্লোভির যোদ্ধারা মহান!
বিশজন যোদ্ধা ফিরল কার্বের নেতৃত্বে। তাদের সঙ্গে একটি মাত্র মেয়ে। তার হাত পিঠমোড়া করে বাঁধা, গলায় একটা চামড়ার ফিতে; তার একটা দিক একজন যোদ্ধার হাতে ধরা।
আভান সর্দার সকলকে স্বাগত জানাল। উপহার স্বরূপ মেয়েটির দিকে তাকিয়ে মনোযোগ দিয়ে কার্বের সব কথা শুনল। তারপর বলল, এখনি পরিষদের একটা বৈঠক বসবে। সেখানেই স্থির হবে এই বন্দিনীকে কে পাবে। আরও একটা জরুরি ব্যাপার এদের জন্য অপেক্ষা করে আছে।
এক সময় বন্দিনী মেয়েটিকে কাছে পেয়ে টারজান তাকে শুধাল, তুমি কি টোয়ারের বোন জানা?
মেয়েটি অবাক হয়ে তাকাল। তাকে ভাল করে দেখে নিয়ে বলে উঠল, ওহো তুমিই সেই নবাগতা?
হ্যাঁ।
আমার দাদা টোয়ার সম্পর্কে তুমি কি জান?
আমরা একসঙ্গে শিকার করেছি। জোরামে ফিরে যাবার পথে আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি। তোমার ও তোমার এক সঙ্গীর পায়ের ছাপ দেখেই আমরা এগোচ্ছিলাম, এমন সময় ঝড় এসে সব মুছে দিল। আমিও তোমার সেই সঙ্গীর খোঁজেই বেরিয়েছি।
যে লোকটি আমার সঙ্গে ছিল তাকে তুমি চেন?
সে আমার বন্ধু! সে কোথায়?
ঝড়ের সময় সে একটা গিরি-নালায় ছিল। নির্ঘাৎ ডুবে গেছে। তুমি তার দেশের মানুষ?
হ্যাঁ।
কি করে জানলে যে সে আমার সঙ্গে ছিল?
আমি চিনতে পেরেছি তার পায়ের ছাপ, আর টোয়ার চিনেছে তোমার পায়ের ছাপ।
মেয়েটি বলল, সে খুব বড় যোদ্ধা আর খুব সাহসী।
তুমি ঠিক জান সে মারা গেছে? টারজান প্রশ্ন করল।
নিশ্চিত জানি, জোরামের লাল ফুলটি বলল।
কিছুক্ষণ দু’জনই চুপ। তাদের মনে জ্যাসন গ্রিডলের চিন্তা। টারজনের খুব কাছে সরে এসে জানা ফিসফিস করে বলতে লাগল তুমি তার বন্ধু। কিন্তু এরা তোমাকে মেরে ফেলবে। কার্বকে আমি ভাল করেই চিনি। তার যা কথা সেই কাজ। আমরা দুজনই জ্যাসনের বন্ধু। যদি এখান থেকে পালাতে পারি আমি তোমাকে জোরামের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাব।
