টোয়ার বলল, সেটা তো খুব পরিষ্কার। ফেলি থেকে আগত এই লোকগুলো তাকে বন্দী করতে চেয়েছিল। তোমার দেশের লোকটি এসে জালোকগুলো ও দুটো ফেলির লোককে মেরে ফেলে এবং বাকি দুটোকে তাড়িয়ে দেয়। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, আমার বোন তার হাত থেকে পালাতে পারেনি, তার হাতেই বন্দী হয়েছে।
টারজান হাসল। পায়ের ছাপ দেখে কিন্তু মনে হচ্ছে না যে সে পালাবার কোনরকম চেষ্টা করেছিল।
টোয়ার মাথা চুলকে বলতে লাগল, তা ঠিক।
টারজান বলল, আমার বন্ধু কদাপি তাকে জোর করে ধরে নিয়ে যায়নি। যদি তার সঙ্গে গিয়ে থাকে তো স্বেচ্ছায়ই গিয়েছে।
টোয়ার বলল, দেখাই যাক; সে যদি জোর করে জানাকে ধরে নিয়ে গিয়ে থাকে তাহলে সে মরবে।
ঠিক সেই সময় একটি ভগ্নমনোরথ মানুষের দল টিপৃডার পর্বতশ্রেণীর শেষ প্রান্ত ঘুরে গাইওর কোর বা সুবৃহৎ গাইওর সমভূমিতে ঢুকেছে। দলের লোকসংখ্যা এগারো-দশটি কৃষ্ণকায় ও একজন শ্বেতকায়। মানুষের ইতিহাসে কেউ কোনদিন এই এগারোটি মানুষের মত সম্পূর্ণভাবে পথ হারিয়ে একান্ত অসহায় হয়ে পড়েনি।
মুভিরো ও তার যোদ্ধারা কুশলী অরণ্যচারী; কিন্তু পথ চিনবার এই অক্ষমতায় তারাও সম্পূর্ণ হতোদ্যম হয়ে পড়েছে।
ওদিকে ও-২২০-এর যাত্রীরা সঙ্গীদের প্রত্যাবর্তনের আশায় অপেক্ষা করে অধৈর্য হয়ে উঠল। শেষ পর্যন্ত জুপনার আর একটি দলের সঙ্গে ডকে পাঠাল তাদের খোঁজে। সত্তর ঘণ্টা পরে তারা ফিরে এসে জানাল যে কারও দেখা মেলেনি।
তখন জুপনার স্থির করল, এমন নিষ্ক্রিয়ভাবে আর এখানে অপেক্ষা করা চলে না; জীবিত বা মৃত যে কোন অবস্থায় সঙ্গীদের খুঁজে বের করতেই হবে।
অতএব আর বিলম্ব নয়। ও-২২০ আকাশে উড়ল। রবার্ট জোন্স তার তেল-চিটচিটে দিনপঞ্জীর পাতায় লিখল : দুপুরবেলা আমরা এখান থেকে যাত্রা করলাম।
জ্যাসন গ্রিডলে বলল, এই দিকে চল।
জানা বলল, না, এই দিকে। আঙুল বাড়িয়ে সে টিল্ডার পর্বতশ্রেণীর উঁচু শিখরগুলো দেখাল।
দু’জনের কেউ কারও ভাষা বোঝে না, তাই কিছু বোঝাতেও পারে না। হতাশ হয়ে গ্রিডলে বোকা বোকা চোখে জানার দিকে তাকিয়ে হাসল। সেই হাসিরই জয় হল। জোরামের ফুলটি জ্যাসনের প্রদর্শিত পথেই পা বাড়াল।
কিন্তু তাদের চলাই সার হল। ও-২২০-এর দেখা মিলল না। তখন জ্যাসন হতাশ ভঙ্গীতে জানার দিকে তাকিয়ে ইঙ্গিতে তাকে বোঝাতে চেষ্টা করল যে এখন থেকে জানা যে পথে যেতে বলবে সেই পথেই সে যাবে।
তারপর শুরু হল নতুন যাত্রা। চড়াই ভেঙ্গে দু’জন এগিয়ে চলল টিপডার পর্বতমালার সানুদেশ লক্ষ্য করে।
হঠাৎ এক সময় মেয়েটি শুধাল, আমার দিকে তুমি এত বেশি তাকাও কেন?
জ্যাসন গ্রিডলের মুখখানা লাল হয়ে উঠল। তাড়াতাড়ি সে চোখ ফিরিয়ে নিল। এই প্রথম সে বুঝতে পারল, সত্যি মেয়েটির দিকে সে বড় ঘন ঘন তাকাতে শুরু করেছে। কি যেন বলতে গিয়েও থেমে গেল।
কথা বলছ না কেন জ্যাসন? মেয়েটি শুধাল।
কি কথা বলব?
আমার দিকে তাকালে যে কথা ফুটে ওঠে তোমার চোখে।
অপার বিস্ময়ে গ্রিডলে তাকাল জানার দিকে। এও কি সম্ভব যে সে–দৃষ্টি ফুটে উঠেছে তার নিজের চোখে।
জ্যাসন তার প্রশ্নের কোন জবাব না দেয়ায় জোরামের লাল ফুলটি নিজের অন্তরের মধ্যে কি যেন খুঁজল। ধীরে ধীরে তার ঠোঁট থেকে মিলিয়ে গেল প্রত্যাশার হাসি।
ধীরে ধীরে সে সোজা হয়ে দাঁড়াল। মুখ ঘুরিয়ে ফিরে চলল সেই খাদটার দিকে যেখানে সে নেমে এসেছিল স্কুকদের তাড়া খেয়ে।
জ্যাসন চেঁচিয়ে ডাকল, জানা, রাগ করো না। কোথায় যাচ্ছ তুমি?
জানা থামল। উদ্ধত চিবুকটি আকাশে তুলে ম্লান হেসে পিছনে তাকিয়ে বলল, তোমার পথে তুমি চলে যাও জালোক; জানা চলল তার নিজের পথে। বলতে বলতেই যেন তার কথাকে প্রমাণ করতেই সে দ্রুতগতিতে খাদের পাড় থেকে নিচে নেমে গেল। জ্যাসন তাকে আর দেখতেই পেল না।
গহ্বরের মুখে ছুটে গিয়ে জ্যাসন গ্রিডলে নিচে তাকিয়ে দেখল, মাত্র কয়েক গজ নিচে খাড়া পাহাড়ের গা বেয়ে জানা ধীরে ধীরে নিচে নেমে যাচ্ছে। জ্যাসন রুদ্ধশ্বাস। এই মাথা ঝিম্-ঝিম্ করা খাড়া পাহাড়ের গা বেয়ে কোন প্রাণী যে নামতে পারে সেটা একেবারেই অবিশ্বাস্য। সে ভয়ে শিউরে উঠল।
জ্যাসন গ্রিডলে উঠে দাঁড়াল। রাইফেল ঝোলাবার চামড়ার ফিতেটাকে পিঠের উপর বাঁধল। দুটো বন্দুকের খাপকেও পিঠের উপর ঝুলিয়ে দিল। পায়ের বুট খুলে নিচের খাদের মধ্যে ফেলে দিল। তারপর উপুর হয়ে শুয়ে পা দুটো খাদের মধ্যে নামিয়ে দিল। হাত বা পা রাখার মত প্রতিটি জায়গা খুঁজে খুঁজে জ্যাসন গ্রিডলেও নামতে লাগল একটু একটু করে।
অনেক উপরে পাহাড় শ্রেণীর মাথায় দেখা দিল ঘন কালো মেঘ। পেলুসিডারে এই গ্রিডলের প্রথম মেঘ দেখা। সে বুঝল, বৃষ্টি আসন্ন; কিন্তু সে বৃষ্টি যে কত ভয়ংকর হতে পারে তা সে স্বপ্নেও ভাবতে পারে নি।
ঝড় উঠল। সঙ্গে সঙ্গে জানার মনে হল, এ ঝড় যে কতখানি বিপজ্জনক হতে পারে সে কথা তো নিচের লোকটি জানে না। কিন্তু সে তো ভাল করেই জানে এই প্রবল বর্ষণের ফলে অচিরেই খাদটা পরিণত হবে একটি উচ্ছ্বসিত তীব্রগতি জলস্রোতে। তার আগেই জ্যাসনকে খাদের দেয়ালের কোন একটা উঁচু জায়গায় এনে আশ্রয় দিতেই হবে।
এখানকার মেয়ে হলেও জানা আগে কখনও এত ভয়ংকর ঝড় দেখেনি। আকাশে বজ্র গর্জন করছে; বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, বাতাস হাহাকার করছে; ধারা-বর্ষণে দৃষ্টি আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছে। তবু তারই মধ্যে প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও করুণার ব্যর্থ প্রেরণায় সে অন্ধের মত নিচে নামছে। নিচে তাকিয়ে দেখল, খাদের জল উঠে এসে তাকে প্রায় দুই-ছুঁই করছে; এ অবস্থায় খাদের নিচে কেউ বেঁচে থাকতে পারে না। লোকটি অনেক আগেই স্রোতের মুখে ভেসে গেছে।
