পালাবার আর একটি মাত্র পথই খোলা আছে। সেদিকে তাকাতেই জানার চোখ পড়ল জ্যাসন গ্রিডলের উপর। ইতস্তত করে সে থেমে গেল। তাকে উৎসাহ দিয়ে গ্রিডলে চীৎকার করে তার দিকেই ছুটে আসতে লাগল।
কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে মুহূর্তমাত্র চুপ করে থেকে জানা মুখ ফিরিয়ে গ্রিডলের দিকেই ছুটে গেল। তার পিছু নিল চারটি জন্তু ও চারটি মানুষ।
৪৫ ক্যালিবারের কোল্ট রিভলবারটা খাপ থেকে বের করে নিয়ে গ্রিডলেও ছুটল মেয়েটির দিকে। বড় হায়েনোডনটা প্রায় কাছে এসে পড়েছে এমন সময় জানা পা হড়কে পড়ে গেল, আর জ্যাসনও তার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে এত কাছে থেকে গুলি করল যে হায়েনোডনের দেহটা মেয়েটির পাশেই লুটিয়ে পড়ল।
গুলির শব্দ শুনে বাকি তিনটে জন্তু ও স্কুকের দল থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। ফেলি দেশের এই স্কুকের দলই মেয়েটিকে তাড়া করেছিল। জালোকের মরা দেহটাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে জ্যাসন মেয়েটিকে তুলে ধরল। আর সেই সুযোগে অরণ্য-মানবীর সহজাত আত্মরক্ষার তাগিদে মেয়েটি খাপ থেকে টেনে বের করল তার পাথরের ছুরিটা। জ্যাসন গ্রিডলে জানতেও পারল না যে সেই মুহূর্তে মৃত্যু তার কত কাছে এসে গেছে। ছুরির ফলাটা বসিয়ে দেবার ঠিক পূর্বক্ষণে এই লোকটির চোখে মেয়েটি এমন কিছু দেখতে পেল, যাতে সে যেন স্পষ্ট বুঝতে পারল, এই মানুষটি তার বন্ধু, শত্রু নয়।
তার হাত থেকে ছুরিটা মাটিতে পড়ে গেল। তা দেখে নবাগতের মুখে দেখা দিল স্মিত হাসি। প্রত্যুত্তরে জোরামের লাল ফুলটির মুখেও হাসি দেখা দিল।
এদিকে দুটো হায়েনোডন তেড়ে গেল ঝুঁকদের আক্রমণ করতে, আর তৃতীয়টা তেড়ে এল জ্যাসন। ও জানাকে লক্ষ্য করে। জ্যাসনের রিভলবারের এক গুলিতে তৃতীয় হায়েনার জীবনান্ত হল। ওদিকে তখন লড়াই চলেছে মানুষে ও জন্তুতে। জ্যাসনের গুলিতে আর একটা হয়েনা লুটিয়ে পড়তেই ঝুঁকদের গদার আঘাতে লুটিয়ে পড়ল আরও একটা। জানার পাথরের বর্শায় মারা পড়ল চতুর্থটা।
হায়েনার আক্রমণ থেকে রক্ষা পেয়ে এবার স্কুকের দলের দৃষ্টি পড়ল জ্যাসন ও জানার দিকে। জানা সভয়ে বলে উঠল, এবার ওরা আমাদের আক্রমণ করবে। তোমাকে মেরে ফেলে আমাকে নিয়ে যাবে। ওদের হাতে আমাকে ছেড়ে দিও না।
গদা ও গুলির যুদ্ধ বেশিক্ষণ চলল না। কোল্টের দুটি গুলিতে দু’জন ঘায়েল হতেই ভ্রুক ও তার সঙ্গী পালিয়ে প্রাণে বাঁচল।
চারটি হায়েনা ও দু’টো মানুষের মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে জ্যাসন বলল, তোমাদের এই ছোট দেশটা বেশ সুন্দর; তবু এখানে মানুষ কি করে বেঁচে থাকে তা তো ভেবে পাই না।
জোরামের ফুলটি তার কথা বুঝল না, মুখে কিছু বললও না; শুধু সপ্রশংস দৃষ্টি মেলে জ্যাসনকে দেখতে লাগল। সে দৃষ্টিতে ফুটে উঠল মুগ্ধতা, বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা। এক কথায়, এবার সে আর পালাতে চেষ্টা করল না। জ্যাসন গ্রিডলেও বুঝি এবার পুরোপুরি পথ হারিয়ে ফেলল এই বিচিত্র জগতে।
একটা নিচু পাহাড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে টারজান নিচে একটা বিধ্বস্ত বিমানকে দেখতে পেল। তাড়াতাড়ি নিচে নেমে এসে খুঁজতে লাগল চালকের মৃতদেহ। যখন দেখল ভিতরে কোন দেহ নেই তখন সে যেন একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বাঁচল। একটু পরেই বিমানের পাশে বুট-পরা পায়ের ছাপ দেখেই চিনতে পারল সেগুলো জ্যাসন গ্রিডলের বুটের ছাপ। তাতেই বোঝা গেল তার কোনরকম গুরুতর আঘাত লাগে নি। কিন্তু গ্রিডলের পায়ের ছাপের সঙ্গেই যে মিশে আছে ছোট পায়ের স্যান্ডেলের ছাপ! এটা কি ব্যাপার! এই সঙ্গীটিকে গ্রিডলে জোটাল কোথা থেকে?
গ্রিডলে ও জানার পায়ের ছাপ ধরে কিছুদূর এগিয়েই একটা প্রকাণ্ড টেরানোডনের মৃতদেহ তারা দেখতে পেল।
আরও আধ মাইল চলার পরে দেখতে পেল, একটা ভোলা প্যারাসুট মাটির উপর পড়ে আছে আর তারই অনতিদূরে পড়ে আছে চারটি হায়েনোডন ও দুটি লোমশ মানুষের মৃতদেহ। ভাল করে পরীক্ষা করে টারজান বুঝল যে দুটি মানুষ এবং দুটি হায়েনোডন মারা পড়েছে বুলেটবিদ্ধ হয়ে। সর্বত্রই রয়েছে জ্যাসনের সঙ্গীর স্যান্ডেলের ছাপ।
প্রথম কথা বলল টারজান, লোক ছিল মোট চারজন এবং আমার বন্ধুর সঙ্গে কোন নারী অথবা যুবক।
এবার তার সঙ্গী স্থানীয় আদিবাসী টোয়ার মুখ খুলল, চারজন এসেছিল নিচু অঞ্চল ফেলি থেকে, আর অপরটি জোরামের মেয়ে।
কি করে জানলে? টারজান জানতে চাইল।
টোয়ার বলল, নিচু অঞ্চলের স্যান্ডেল আর পাহাড়ি অঞ্চলের স্যান্ডেল একরকম নয়। নিচু ঘাস বা শেওলা ঢাকা জলাভূমির উপর দিয়ে হাঁটতে হয় বলে নিচু অঞ্চলের হ্যাঁন্ডেলের সোল হয় পাতলা, আর পাহাড়ি অঞ্চলের স্যান্ডেলের সোল হয় মোটা।
আমরা কি জোরামের কাছে এসে পড়েছি? টারজনের প্রশ্ন।
টোয়ার জবাব দিল, না, আমাদের সামনে সবচাইতে উঁচু পাহাড়টার ওপারে জোরাম।
প্রথম সাক্ষাতেই তুমি বলেছিলে যে তুমি জোরামের লোক।
হ্যাঁ, ওটাই আমাদের দেশ। তাহলে তো এই মেয়েটিকে তুমি নিশ্চয় চেন?
সে আমার বোন, টোয়ার জবাব দিল।
টারজান অবাক চোখে তাকাল। বলল, কি করে বুঝলে?
ঘাসবিহীন নরম মাটির উপর পায়ের ছাপ এত স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে যে তার স্যান্ডেলের ছাপ চিনতে আমার কোন অসুবিধা হয়নি।
নিজের দেশ থেকে এতটা দূরে তোমার বোন কি করছিল? আর আমার বন্ধুর সঙ্গেই বা সে জুটল কেমন করে?
