জ্যাসন গ্রিডলে জীবনে কখনও এত ব্যর্থ ও অসহায় বোধ করেনি। অন্তহীন পথ ধরে অনন্তকাল এই পথ চলা; অথচ তিলমাত্র ধারণা নেই সে ও-২২০-এর দিকে এগোচ্ছে না তার বিপরীত দিকে চলেছে। অথচ আর কিই বা সে করতে পারে।
ওদিকে সময় যত পার হচ্ছে ও-২২০-এর যাত্রীদের মন ততই আশংকায় ভরে উঠছে।
জুপনার বলল, প্রায় বাহাত্তর, ঘণ্টা হয়ে গেল তারা বাইরে গেছে। জীবনে কখনও আমি এত অসহায় বোধ করিনি। অথচ কি যে করব তাও বুঝতে পারছি না।
চোখে একটা শক্তিশালী দূরবীন লাগিয়ে হল হাইন্স চারদিকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছে। পেলুসিডারের বন্য প্রাণী দেখার ব্যাপারে এই তিনটি প্রাণীর এখন আর কোন আগ্রহ নেই। হঠাৎ সে বিস্ময়ে চীৎকার। করে উঠল।
কি হল? জুপনার বলল। কিছু দেখতে পেলে?
ডর্ফ বলল, দেখতে পেয়েছি। হয় গ্রিডলে, নয়তো ভন হস্ট। কিন্তু যেই হোক সে একা।
জুপনার আদেশের ভঙ্গীতে বলল, লেফটেন্যান্ট, দশজনকে সঙ্গে নিয়ে এখনি চলে যাও। সকলেই যেন সশস্ত্র হয়ে যায়। সময় নষ্ট করো না।
ডর্ফ ততক্ষণে নিচে নেমে গেছে। ও-২২০-এর মাথায় বসে দুই অফিসার তাদের দিকেই চোখ রাখল। দেখল, তারা পরস্পরের দিকেই এগিয়ে চলেছে। জমিটা ঢেউ খেলানো বলে কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছে না। শ’খানেক গজ দূরে আসতেই লেফটেন্যান্ট চিনতে পারল যে লোকটি জ্যাসন গ্রিডলে।
দ্রুত ছুটে এসে পরস্পরের হাত চেপে ধরল। গ্রিডলে প্রথমেই হারানো লোকদের কথা জানতে চাইল।
ডর্ফ মাথা নেড়ে বলল, একমাত্র তুমিই ফিরে এসেছ।
গ্রিডলের চোখ থেকে সব আগ্রহের আলো নিভে গেল। হঠাৎ সে যেন অনেক ক্লান্ত, অনেক বুড়ো হয়ে পড়ল।
সকলেই তার এই কয়েক ঘণ্টার অভিজ্ঞতার কথা শুনতে চাইলে গ্রিডলে বলল, সকলের আগে আমার চাই একটু স্নান। তারপর একপেট খাবার। তারপর হবে গল্প-গুজব।
আধ ঘণ্টা পরে স্নান করে, দাড়ি কামিয়ে নতুন পোশাক বদলে তাজা হয়ে খেতে খেতেই শুরু করল তার অভিযানের বিবরণ।
সব কথা শুনে জুপনার বলল, যে খোলা জায়গা থেকে তুমি ভন হর্স্ট ও ওয়াজিরিদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলে, আর একটা অনুসন্ধানকারী দল নিয়ে সেখানে যেতে পারবে কি?
গ্রিডলে উত্তর দিল, তা নিশ্চয় পারব। বরং এমনভাবে পথটা বুঝিয়ে দিতে পারব যে আমাকে কোন দরকারই হবে না। যদি আর একটা দল পাঠানোই স্থির হয়, তাহলেও আমি, সে দলের সঙ্গে যাচ্ছি না।
অফিসাররা সকলেই অবাক হয়ে মুখ তুলে তাকাল।
দলের সঙ্গে যাচ্ছি না, তবে আমি যাচ্ছি একা স্কাউট-প্লেনটায় চেপে। আর আমার প্রস্তাব হচ্ছে, আমি যাত্রা করার অন্তত চব্বিশ ঘণ্টা পরে অনুসন্ধানকারী দলটাকে পাঠানো হোক, কারণ সেই সময়ের মধ্যেই আমি হয় হারানো বন্ধুদের অবস্থান জানতে পারব, না হয় একেবারেই বিফল হব।
প্লেনটাকে ভাল করে দেখে নিয়ে গ্রিডলে বাকি তিনজন অফিসারের সঙ্গে করমর্দন করল, জাহাজের সকলের কাছ থেকে বিদায় নিল, তারপর ভোলা কক-পিটে চড়ে বসল।
গ্রিডলে আকাশে উড়ল।
প্রায় দু’ঘণ্টা ধরে জ্যাসন গ্রিডলে একটানা সোজা উড়ে চলল জঙ্গল, সমভূমি ও উঁচু-নিচু পাহাড়ি অঞ্চলের উপর দিয়ে।
এক সময় অনেক দূর আকাশে এমন একটা কিছু তার চোখে পড়ল যাতে চরম বিস্ময়ে তার নিঃশ্বাস আটকে এল।
ঠিক তার মাথার উপরে ঘুরছে একটা বিরাটকায় প্রাণী। তার দুই উড়ন্ত ডানার বিস্তার তার প্লেনের প্রায় দ্বিগুণ। বিরাট দুই চোয়ালে বড় বড় দাঁতগুলো ঝকঝক করছে। সহসা তার মনে হল, প্রাণীটি তাকেই আক্রমণ করতে উদ্যত।
গ্রিডলে তখন উড়ে চলেছে প্রায় তিন হাজার ফুট উঁচুতে। বিরাট টেরানোডনটি সোজা নামতে লাগল তার প্লেন লক্ষ্য করে। জ্যাসন ডাইভ দিয়ে সেটাকে এড়িয়ে যেতে চাইল। তার পরেই প্রচণ্ড সংঘর্ষ, বিরাট গর্জন, কাঠ ভাঙার ও ধাতুতে ঘষা লাগার শব্দ ও টেরানোডনটি সোজা এসে আছড়ে পড়ল প্লেনের প্রপেলারের ভিতরে।
তারপর যা ঘটল সেটা এত দ্রুত ঘটে গেল যে আর পাঁচ সেকেন্ড দেরী করলে জ্যাসন গ্রিডলেকে আর সে দৃশ্য দেখতে হত না।
প্লেনটা সম্পূর্ণ উল্টে গেল, আর ঠিক সেই মুহূর্তে গ্রিডলেও লাফিয়ে পড়ল। প্যারাসুটের সুতোটা ধরে টান দিল। মাথায় কিসের যেন আঘাত লেগে সে জ্ঞান হারাল।
যে মুহূর্তে জ্যাসন গ্রিডলে তার প্যারাসুটের দড়িটা ধরে টেনেছিল ঠিক তখনই তার প্লেনের ভাঙা প্রপেলারের একটা অংশ এসে প্রচণ্ড জোরে আঘাত করেছিল তার মাথায়। জ্ঞান ফিরে এলে সে দেখল সে একটা উপত্যকার মাথায় ঘন ঘাসের বিছানায় শুয়ে আছে। উঁচু পাহাড়ের ভিতর দিয়ে এঁকে-বেঁকে এসে একটা গিরি নালা সেখানেই সমতল ভূমিতে পড়েছে।
সঙ্গীদের খোঁজে এসে এই বিপদ ঘটায় গ্রিডলের খুব মন খারাপ হয়ে গেল। উঠে দাঁড়িয়ে প্যারাসুটের বাঁধন খুলে ফেলল। তবু ভাল যে কপালের খানিকটা ছড়ে যাওয়া ছাড়া বিশেষ কোন ক্ষত হয়নি।
প্রথমেই তার মনে পড়ল জাহাজটার কথা। সে জানে, সেটা নিশ্চয়ই ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে, তবু তার আশা যে খোঁজ করলে তার ভিতর থেকে রাইফেল ও গুলিগুলো হয়তো পাওয়া যেতে পারে। এমন সময় একটা সম্মিলিত তর্জন-গর্জন কানে আসতেই সে ডান দিকে চোখ ফেরাল। কিছুটা দূরে একটা ছোট ঢিপির মাথায় দেখতে পেল, পেলুসিডারের চারটি হিংস্র নেকড়ে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। এই সব নেকড়েকে বহিঃপৃথিবীর প্রাণীবিজ্ঞানীরা বলে হায়েনোডন, আর এই ভিতর-পৃথিবীর লোকরা বলে জালোক। দেখেই জ্যাসন বুঝতে পারল যে নেকড়েগুলো তাকে দেখে চেঁচাচ্ছে না; তাদের দৃষ্টিকে অনুসরণ করে দেখতে পেল, একটি মেয়ে তাদের দিকেই ছুটে চলেছে, আর তাকে তাড়া করে চলেছে চারটে পুরুষ মানুষ। ভয়বিহ্বল মেয়েটি একবার নেকড়েদের দিকে, একবার লোক চারটির দিকে তাকাচ্ছে।
