জুন মাসের এক পরিষ্কার সকালে ভোর হবার আগেই ও-২২০ ধীরে ধীরে যাত্রা শুরু করল।
মূল অভিযানের জন্য ক্যাপ্টেন হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে জুপনারকে; তার পরিচালনায়ই বায়ু যানটি নির্মিত হয়েছে। আর আছে রাজকীয় বিমানবাহিনীর দুই প্রাক্তন অফিসার ভন হক্ট ও ডর্ফ এবং জাহাজ-চালক লেফটেন্যান্ট হাইন্স। এ ছাড়া আছে বারোজন ইঞ্জিনীয়ার, আটজন যন্ত্রকুশলী, একটি নিগ্রো পাঁচক ও দুটি ফিলিপিনো কেবিন-বয়।
অভিযানের দলপতি স্বয়ং টারজান। জ্যাসন গ্রিডলে তার সহকারী। তার যোদ্ধা হিসেবে আছে মুভিরো ও তার ন’জন ওয়াজিরি যোদ্ধা।
বায়ুানটি যখন স্বচ্ছন্দ গতিতে শহরের উপর উঠে গেল তখন জুপনার তার উৎসাহকে চেপে রাখতে পারল না। বলে উঠল, এমন সুন্দর যান আমি কখনও দেখিনি। হাত ছোঁয়ালেই এ সাড়া দেয়।
মোটামুটিভাবে ঘণ্টায় ৭৫ মাইল গতিতে চলে দ্বিতীয় দিন মাঝরাত নাগাদ ও-২২০ উত্তর মেরুতে পৌঁছে গেল। হাইন্স যখন ঘোষণা করল যে তার হিসেবমত তারা উত্তর মেরুর খাড়া উপরে পৌঁছে গেছে, তখন সকলের মধ্যেই উত্তেজনা দেখা দিল।
আরও পাঁচ ঘণ্টা দক্ষিণ দিকে উড়ে যাবার পরে হাইন্স চীৎকার করে উঠল, দেখ, দেখ। আমাদের ঠিক সামনেই জল দেখা যাচ্ছে।
হঠাৎ টেলিফোনটা বেজে উঠল। হাইন্স সিরিভারটা কানে লাগাল। খুব ভাল স্যার, বলে রিসিভারটা ঝুলিয়ে রেখে বলল, পর্যবেক্ষণ-কেবিন থেকে ভন হার্স্ট কথা বলল। নিচে একটা জন প্রাণীহীন প্রান্তর সে দেখতে পেয়েছে।
গ্রিডলে বলল, উত্তর কোসারের যে বিবরণ ইনেস দিয়েছে এটা তো তার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।
সকলেরই মনে বিশ্বাস হল, তাদের নিচের স্থলভাগটাই পেলুসিডার।
ও-২২০ ক্রমেই দক্ষিণ দিকে এগোতে লাগল। আর যে মুহূর্তে মধ্যরাতের সূর্য-বয়লটা দৃষ্টিপথের আড়ালে চলে গেল অমনি সম্মুখে দেখা দিল পেলুসিডারের সূর্য-দীপ্তি।
এই তো সেই পেলুসিডার যার স্বপ্ন দেখেছে জ্যাসন গ্রিডলে।
অরণ্য ছাড়িয়ে একটা ঢেউ-খেলানো প্রান্তর। মাঝে মাঝে কিছু গাছ-গাছালি। প্রান্তরের বুক চিরে অসংখ্য নদী গিয়ে মিশেছে বিপরীত দিকের একটা বড় নদীতে। দলে দলে চরে বেড়াচ্ছে নানা ধরনের পশু। কিন্তু কোথাও মানুষের দেখা নেই।
টারজান বলল, এ দেশ তো আমার কাছে স্বর্গ বলে মনে হচ্ছে। এখানে নামা যাক ক্যাপ্টেন।
জাহাজটা ধীরে ধীরে মাটিতে নেমে এল। একজন অফিসার ও দুটি লোককে পাহারায় রেখে অন্য সব যাত্রী পেলুসিডারের হাঁটু-সমান উঁচু সবুজ ঘাসের মধ্যে নেমে পড়ল।
চারদিকে তাকিয়ে টারজান বলল, এখন আমাদের সবচাইতে বেশি দরকার বিশ্রাম। পরিপূর্ণ বিশ্রামের জন্য আপাতত আমরা এখনেই থাকি, তারপর কোর্সার শহর খুঁজতে বের হওয়া যাবে।
এ প্রস্তাব সকলেই সমর্থন করল।
প্রতি চার ঘণ্টা অন্তর পাহারা বদলের ব্যবস্থা করা হল, আর অফিসার ও অন্য সকলেই ঘড়ির কাঁটা ধরে ঘুমোতে লাগল।
অরণ্যরাজ টারজনের ঘুমই প্রথম ভাঙল। সেই প্রথম জাহাজ থেকে বেরিয়ে পড়ল।
তখন পাহারায় ছিল লেঃ ডর্ফ। সে অবাক বিস্ময়ে দেখল, মাথাভর্তি কালো চুল জঙ্গলের রাজা খোলা প্রান্তর পার হয়ে বনের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল।
ও-২২০-এর ছোট বার্থে শুয়ে অফিসার্স মেসের পাঁচক রবার্ট জোন্স হাই তুলল, শরীরটাকে টানটান করল; তারপর চোখ খুলে তাকিয়ে বিস্ময়ে চেঁচিয়ে উঠে বসল। বলল, হায় ভগবান! মশাইরা সকলেই এখনও ঘুমে অচেতন!
মধ্যাহ্ন সূর্যের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে তাড়াতাড়ি পোশাক পরে নেমে গেল।
জ্যাসন গ্রিডলে কেবিন থেকে বেরিয়ে বলল, সুপ্রভাত!
জুপনার ও ডর্ফ সুপ্রভাত বলে তাকে স্বাগত জানাল।
জুপনার বলল, সুপ্রভাত বলব কি শুভ সন্ধ্যা বলব ঠিক বুঝতে পারছি না।
ডর্ফ বলল, বারো ঘণ্টা হল আমরা এখানে এসেছি, অথচ এর মধ্যে সময়ের কোন হেরফের ঘটল না। চার ঘণ্টা ধরে পাহারায় আছি, কিন্তু ঘড়ি সঙ্গে না থাকলে বুঝতেই পারতাম না সময়টা পনেরো মিনিটি না এক সপ্তাহ।
জুপনার বলল, গ্রেস্টোক কোথায়? সে তো খুব সকালেই ওঠে।
গ্রিডলে বলল, আমিও তো রবকে সেই কথাই জিজ্ঞেস করছিলাম; সেও তাকে দেখেনি।
ডর্ফ বলল, আমি পাহারায় আসার পরেই সে বেরিয়ে গেছে। তারপর প্রায় ঘণ্টা তিনেক হয়ে গেল। বেশিও হতে পারে। দেখলাম, সে মাঠটা পেরিয়ে বনের মধ্যে ঢুকে গেল।
ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করে গ্রিডলে ও ভন হস্টের নেতৃত্বে ওয়াজিরি যোদ্ধাদের দলটাকে পাঠানো হল টারজনের খোঁজে।
মুভিরোর উপর পথ চিনে এগিয়ে যাবার ভার দেয়া হল। গন্ধ শুঁকে শুঁকে মুভিরো ঠিকই এগিয়ে যেতে লাগল। বনের মধ্যে কিছুদূর গিয়ে একটা বড় গাছের নিচে সে থেমে গেল। বলল, এইখনে এসে বড় বাওয়ানা গাছে চড়েছে; কাজেই এর পর থেকে তার খোঁজ করা খুব শক্ত হবে।
তবু তারা এগিয়ে চলল।
ক্রমে অরণ্যের চেহারা বদলাতে লাগল। বড় বড় গাছগুলো এখন আর ততটা ঘনসন্নিবদ্ধ নয়। ঝোপ-ঝাড়ও ততটা ঘন নয়। ফলে পথ চলা কিছুটা সহজসাধ্য হয়েছে। ওয়াজিরি যোদ্ধাদের চলার গতি বাড়ল। মাইলের পর মাইল পার হয়ে গেল। মধ্যাহ্ন সূর্যের মায়ায় সময়ের হিসেব রাখতেও তারা বুঝি। ভুলে গেল।
ক্রমে চারদিক থেকে ভেসে আসতে লাগল বিচিত্র ধ্বনি–কখনও গরু-গর শব্দ, কখনও গর্জন, কখনও আর্তনাদ।
জ্যাসন গ্রিডলে অসহায়ভাবে সেই মধ্যাহ্ন সূর্যের দিকে তাকাল। সূর্যের হাসি বুঝি বা তাকেই ঠাট্টা করতে লাগল। অগত্যা যে কোন একটা পথ ধরেই সে এগোতে শুরু করল।
