পৃথিবীর ঠিক কেন্দ্র থেকে ঝুলছে পেলুসিডারের সূর্য; সেখানকার সূর্য সব সময়ই শীর্ষস্থানে থাকে বলে পেলুসিডারে রাত বলে কিছু নেই, সেখানে বিরাজ করে অনন্ত শাশ্বত মধ্যাহ্ন।
কোন তারা না থাকায় এবং সূর্যের কোন আপাত গতি না থাকায় পেলুসিডারে কোন দিকনির্ণয় যন্ত্র নেই; দিকচক্ররেখা বলেও কিছু সেখানে নেই, কারণ যেখান থেকেই দেখা যাক সেখানকার ভূ-পৃষ্ঠ সব। সময়ই উপরের দিকেই উঠে যায়। আবার সে পৃথিবীতে সূর্য, তারা ও চন্দ্র না থাকায় আমাদের পৃথিবীর মত সময়ের হিসেবও সেখানে নেই। আর তার ফলে পেলুসিডার এমন এক সময়হীন পৃথিবী যেখানে ব্যস্ত মৌমাছি এবং সময়ই সম্পদ এই ধরনের কোন কথাই প্রচলিত নেই।
বহিঃপৃথিবীর মানুষ আমরা অতীতে পেলুসিডার থেকে প্রেরিত যে খবরটি ধরতে পেরেছিলাম তার মর্মার্থ হলঃ পেলুসিডারের প্রথম সম্রাট ডেভিড ইনেস তার প্রিয় জন্মভূমি লুরাজ এজ-এর অদূরবর্তী বৃহৎ উপত্যকায় অবস্থিত সারি নামক শহর থেকে মহাদেশ ও মহাসাগর পার হয়ে অনেক দূরের কোরসারদের দেশে এক অন্ধকার কারাগারে চরম দুঃখে দিন কাটাচ্ছে।
টারজান থেমে গেল। কান পাতল। বাতাস শুকল।
যে শব্দ টারজান শুনতে পেয়েছে সেটা এসেছে অনেক দূর থেকে। প্রথমে স্পষ্ট করে তার অর্থ বুঝতে না পারলেও সে এটা বুঝতে পেরেছে যে অনেক দূর থেকে একদল মানুষ আসছে।
কিছুদূর এগোতেই খালি পায়ের শব্দ আর আদিবাসীদের বোঝা বইবার গান তার কানে এল। তার পরেই তার নাকে এল কালো মানুষের গায়ের গন্ধ। আর সেই সঙ্গে এমন আর একটা আবছা গন্ধ নাকে এল যাতে টারজান বুঝতে পারল যে একটি সাদা মানুষ দলবল ও লটবহর নিয়ে শিকারে এসেছে।
মুখ ঘুরিয়ে টারজান নিঃশব্দে অতি দ্রুতগতিতে গাছপালার ভিতর দিয়ে এগিয়ে শিকারীদলের কিছুটা সামনে গিয়ে গাছ থেকে নেমে পথের উপর অপেক্ষা করতে লাগল।
একটা মোড় ঘুরেই শিকারীর দলটা তাকে দেখতে পেয়েই থেমে গিয়ে উত্তেজিতভাবে কথাবার্তা বলতে লাগল।
টারজান বলল, আমি টারজান। টারজনের দেশে তোমরা কি করতে এসেছ?
সঙ্গে সঙ্গে যে যুবকটি দলের একেবারে সামনে ছিল সে এগিয়ে এল। তার মুখে দেখা দিল হাসির রেখা। বলল, তুমিই লর্ড গ্রেস্টোক?
কালার পালিত পুত্র জবাব দিল, এখানে আমি অরণ্যরাজ টারজান।
তাহলে তো আমার ভাগ্য ভাল বলতে হবে, যুবকটি বলল, কারণ সুদূর দক্ষিণ কালিফোর্নিয়া থেকে আমি তোমার খোঁজেই এসেছি।
তুমি কে? টারজনের কাছে তোমার কিসের দরকার?
আমার নাম জ্যাসন গ্রিডলে। আর যে বিষয় নিয়ে কথা বলতে আমি তোমার কাছে এসেছি সে এক দীর্ঘ কাহিনী। আশা করি আমার সঙ্গে আমার পরবর্তী শিবিরে গিয়ে আমার এখানে আসার উদ্দেশ্যটা মন দিয়ে শুনবার মত সময় ও ধৈর্য তোমার হবে।
টারজান মাথা নাড়ল। এই জঙ্গলের রাজ্যে আমাদের সময়ের অভাব হয় না।
সেদিন সন্ধ্যায় জ্যাসন ও টারজান একত্রে বসে কফি খেতে খেতে টারজান বলল, এবার বল, দক্ষিণ কালিফোর্নিয়া থেকে এত পথ পেরিয়ে কেন তুমি আফ্রিকার একেবারে অভ্যন্তরে এসে ঢুকেছ?
গ্রিডলে হেসে বলল, কি জান, এখন সশরীরে এখানে হাজির হয়ে তোমার মুখোমুখি বসে হঠাৎ আমার কেমন যেন ভয় হচ্ছে যে আমার কথা শুনে তুমি না আমাকে পাগল ঠাউরে বস।
আমাকে সব ব্যাপারটা বুঝিয়ে বল।
পৃথিবীটা একটা ফাঁকা গোলক এবং তার ভিতরে আর একটা পৃথিবী আছে-এই মতটা তুমি কখনও শুনেছ কি?
এ মতটা তো বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলে অনেক আগেই খণ্ডন করা হয়েছে, টারজান জবাবে জানাল।
মার্কিন ভদ্রলোক বলল, কিন্তু সম্প্রতি সেই আভ্যন্তরীণ জগৎ থেকে একটা সংবাদ সরাসরি আমার কাছে এসেছে।
তুমি আমাকে অবাক করে দিচ্ছ, টারজান বলল।
অবাক আমিও হয়েছিলাম, কিন্তু এ কথা সত্য যে পৃথিবীর অভ্যন্তরস্থ পেলুসিডার পৃথিবীর একূনের পেরির সঙ্গে আমার বেতার-সংযোগ ঘটেছিল, আর সংবাদের একটা অনুলিপি আমি সঙ্গে করেই এনেছি। সংবাদটি যে যথার্থ তার একটি প্রমাণপত্র আমি একজনের কাছ থেকে নিয়ে এসেছি যার নামের সঙ্গে তোমার পরিচয় আছে। আমি যখন সংবাদটি পাই তখন সে লোক আমার পাশেই ছিল; এই সে সব কাগজপত্র।
আধ ঘণ্টা ধরে জ্যাসন গ্রিডলে পাণ্ডুলিপিটা খুলে তার বিশেষ বিশেষ সংখ্যাগুলো পড়ে শোনাল। পড়া শেষ করে বলল, এর থেকেই পেলুসিডারের অস্তিত্ব সম্পর্কে আমার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে, আর ডেভিড ইনেসের দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতিই আমাকে বাধ্য করেছে এই প্রস্তাব নিয়ে তোমার কাছে আসতে যাতে আমরা এমন একটা অভিযান চালাই যার প্রথম উদ্দেশ্যই হবে কোর্সারদের কারাগার থেকে তার উদ্ধার সাধন।
টারজান বলল, আচ্ছা, যদি ধরেই নি যে একটি আভ্যন্তরীণ জগৎ আছে তাহলেই বা সে পৃথিবী আবিষ্কারের কি উপায়ের কথা তুমি ভেবেছ?
আমার মনে হয়, আধুনিক জেপেলিন ধরনের কোন বিশেষভাবে তৈরি বায়ু-যানেই আমার পরিকল্পনা অনুযায়ী অভিযান চালানো যেতে পারে। হিলিয়াম গ্যাস ব্যবহারের ফলে সে বায়ু-যান নিরাপত্তার দিক থেকেও যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য হবে।
খুব সংগোপনে কাজ চলল ছ’মাস ধরে। ছ’মাস পরে ও-২২০ নামে পরিচিত বায়ু-যানটি আকাশে উড়বার জন্য প্রস্তুত হল। বড় সিগার-আকৃতির ও-২২০ যানটির বডি দৈর্ঘ্যে ৯৯৭ ফুট এবং তার পরিধি ১৫০ ফুট। গোটা যানটি ছ’টি বড় বড় বায়ু-নিরোধক ঘরে বিভক্ত। ইঞ্জিনগুলো ৬৫০০ অশ্ব শক্তিবিশিষ্ট; তার গতি ঘণ্টায় ১০৫ মাইল। এই হচ্ছে বায়ু-যানের বিবরণ।
