প্রাতরাশের পরে আগুনকে ঘিরে বসে গল্প করতে করতে এক সময় সকলের খেয়াল হল লুপিঙ্গু সেখানে নেই। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তাকে পাওয়া গেল না। তখন সকলেই ধরে নিল যে শত্রুর কাছাকাছি এসে সে ভয়ে পালিয়ে গেছে। সেই ফাঁকে মুজিমো ও নিয়ামওয়েগির আত্মা নিঃশব্দে গাছের ডালে ডালে ঝুলে চিতা-মানুষদের গ্রামের দিকে এগিয়ে চলল।
গলায় দড়ি বেঁধে মেয়েটাকে টানতে টানতে নিয়ে চলেছে জঙ্গলের ভিতর দিয়ে। দড়ির অপর প্রান্ত ধরে আছে একটি বলিষ্ঠ আদিবাসী যুবক; তার আগে আগে পথ দেখিয়ে চলেছে একটি বুড়ো, তার পিছনে আছে আর একটি যুবক। তিনজনেরই শরীর চিতাবাঘের চামড়ায় ঢাকা; মাথায় বেশ ভাল করে বসানো চিতাবাঘের মাথা; ইস্পাতের বাঁকা নখ বসানো তাদের আঙুলের ডগায়; দাঁতগুলো ঘসে ঘসে ধারালো করা হয়েছে; আর সারা মুখ চিত্র-বিচিত্র করে আঁকা। তিনজনের মধ্যে বুড়োটাই সর্দার; দেখতেও ভয়ংকর। যুবক তার দুটি কথায় উঠছে-বসছে।
সকলের কুটিল, কঠোর দৃষ্টির সম্মুখ দিয়ে আদিবাসীরা মেয়েটিকে নিয়ে হাজির হল একটা বড় কুটিরের সামনে। বাড়ির সামনে বসে আছে একটি পেটমোটা বুড়ো নিগ্রো; তার সারা মুখে বলিরেখায় ভরা। চিতা-মানুষদের সর্দার গাটো মুঙ্গু। চোখ তুলে তাকাতেই সাদা মেয়েটিকে দেখে তার রক্ত-রাঙা চোখ দুটো জ্বল জ্বল করে উঠল। বুড়ো লোকটিকে লক্ষ্য করে বলল, তুমি আমার জন্য উপহার এনেছ, লুলিমি?
বুড়ো জবাব দিল, উপহার এনেছি, তবে কেবলমাত্র গাটো মুঙ্গুর জন্য নয়।
তার মানে? সর্দার ভেংচে উঠল।
উপহার এনেছি গোটা জাতির জন্য-চিতা-দেবতার জন্য।
মেয়েটিকে মন্দিরে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা চলতে লাগল। এমন সময় একটি সৈনিক ঘর্মাক্ত দেহে রুদ্ধশ্বাসে এসে হাজির হল।
গাটো মুঙ্গু বলল, তুমি কি সংবাদ এনেছ?
উটেঙ্গাদের সর্দার লোবোঙ্গোর ছেলে ওরান্ডোর নেতৃত্বে একশ’ সৈনিক এখান থেকে কয়েক ঘণ্টার পথ দূরে হাজির হয়েছে। তারা আক্রমণ করবে তোমার গ্রাম। এখনই যদি কিছু সৈনিক পাঠিয়ে তাদের পথের পাশে লুকিয়ে রাখতে পার তাহলে অতর্কিকে আক্রমণ করে তার সব উটেঙ্গাকে মেরে ফেলতে পারবে।
কোথায় তাঁবু ফেলেছে তারা?
বার্তাবহ সে স্থানের বিস্তারিত বিবরণ দিল। গাটো মুঙ্গু একজন উপ-প্রধানকে হুকুম দিল, তিনশ’ সৈনিক নিয়ে সে আক্রমণকারীদের উদ্দেশ্যে যাত্র করুক। তারপর বলল, আজ রাতে আমাদের মহাভোজ হবে, আর এই অতিথি সেখানে আমার পাশে বসে পানাহার করবে।
বার্তাবহ বলল, আমি তো থাকতে পারব না। এখনই আমাকে ফিরে যেতে হবে, নইলে সকলে আমাকে সন্দেহ করবে।
তুমি কে? গাটো মুঙ্গু প্রশ্ন করল।
বার্তাবহ জবাব দিল, আমি ওয়াটেঙ্গা দেশের কিস্তু গ্রামের লুপিঙ্গু।
রাত নামছে। সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে। বনের পথ ধরে ছিন্ন বসন একটি সাদা মানুষ এসে দাঁড়াল একটা ফসলের ক্ষেতের শেষ প্রান্তে। ক্ষেতের ওপারে একটা বেড়া দিয়ে ঘেরা গ্রামের দীর্ঘ ছায়া পড়েছে মাঠের উপরে। লোকটির সঙ্গে দুটি কালো মানুষ।
তাদের একজন বলল, আর যেয়ো না বাওয়ানা। ওটা চিতা-মানুষদের গ্রাম।
বুড়ো টাইমার বলল, ওটা গাটো মুঙ্গুর গ্রাম। আগেও আমি তার সঙ্গে ব্যবসা করেছি।
তখন তুমি এসেছিলে অনেক লোকজন ও বন্দুক নিয়ে। আর তখন গাটো মুঙ্গু ছিল ব্যবসাদার। আজ তুমি এসেছ মাত্র দুটি চাকর নিয়ে; আর আজ তুমি দেখবে বুড়ো গাটো মুঙ্গু চিতা-মানুষ হয়ে গেছে।
বাজে কথা! সাদা মানুষটি চেঁচিয়ে বলল। একজন সাদা মানুষের কোন ক্ষতি করার সাহস তার হবে না। তাছাড়া, সব কিছু দেখে মনে হচ্ছে যে মেয়েটিকে এখানেই আনা হয়েছে। আমি ঐ গ্রামে যাবই।
নিগ্রোরা মাথা নাড়ল। তুমি যেয়ো না বাওয়ানা। সাদা মেয়েটি তোমার স্ত্রী নয়, মা নয়, বোন নয়। তাহলে তার জন্য তুমি কেন জীবনটা দেবে।
বুড়ো টাইমারও মাথা নাড়ল। সে তোমরা বুঝবে না। সে নিজেই কি বুঝেছে। হাত নেড়ে বলল, তাহলে সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করো।
বুড়ো টাইমার মাঠ পেরিয়ে ফটকের দিকে এগিয়ে চলল। নিগ্রো দুটির চোখ জলে ভরে এল।
বুড়ো টাইমারকে দেখে গাটো মুঙ্গু উদ্ধত ভঙ্গীতে বলল, এখানে কি করতে এসেছ?
বুড়ো টাইমার বুঝল, অবস্থা সুবিধার নয়। এখানে নরম কথায় কোন কাজ হবে না। সে সরাসরি বলল, আমি এসেছি সাদা মেয়েটিকে নিয়ে যেতে।
কোন্ সাদা মেয়ে?
মিথ্যা প্রশ্ন করে আমাকে ভোলাতে চেষ্টা করো না। মেয়েটি এখানেই আছে। তাকে আমার হাতে তুলে দাও।
গাটো মুঙ্গু হুংকার দিয়ে উঠল, এ গায়ে কোন সাদা মেয়ে নেই। আর আমি সর্দার গাটো মুঙ্গু, হুকুম করি, কারও হুকুম শুনি না।
হুকুম তোমাকে শুনতে হবে বদমাশ। অন্যথায় একদল সৈন্য নিয়ে এসে তোমার গ্রামটাকে আমি মানচিত্রের বুক থেকে মুছে ফেলব।
গাটো মুঙ্গু ঘৃণাভরে বলল, তোমাদের আমি চিনি। তোমরা তো মাত্র দু’জন, আর বাকি পাঁচজন তো এখানকার মানুষ। তোমরা তো গরিব। হাতির দাঁত চুরি করে বেড়াও। মুখেই শুধু বড় বড় কথা বল। গাটো মুঙ্গু তোমার কথায় ভয় পায় না। তুমি তো এখন আমার বন্দী। একে এখান থেকে নিয়ে যাও। দেখো যেন পালিয়ে না যায়।
দু’জন সৈনিক এসে তাকে টানতে টানতে নিয়ে গেল। গোটা নোংরা ছোট ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে তার অস্ত্রশস্ত্র কেড়ে নিল। হাত-পা শক্ত করে বেঁধে রেখে চলে গেল। একজন মাত্র শাস্ত্রী রইল দরজার পাশে। পাহারায়। কিন্তু লোকটির পাজামার পকেটে যে একটা ছোট ছুরি ছিল সেটা খেয়ালই করল না।
