বার্থা কিরচার বিমানে ওঠার আগে টারজনের সঙ্গে তার আর দেখা হয়নি। স্মিথ-ওল্ডউইকের সঙ্গেও সেখানেই দেখা হল। যথারীতি বিদায় সম্ভাষণ জানিয়ে সে তাকে বার বার ধন্যবাদ দিল। ছোট হতে হতে। তাদের বিমান পূর্ব দিগন্তের পথে অদৃশ্য হয়ে গেল।
মালপত্র কাঁধে ফেলে অস্ত্রশস্ত্র ঝুলিয়ে টমিরা যাত্রার জন্য প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কর্নেল ক্যাপেলও স্থির করেছে তাদের সঙ্গেই যাবে। টারজনের দিকে মুখ ফিরিয়ে সে বলল, তুমিও আমাদের সঙ্গে গেলে খুব খুশি হতাম গ্রেস্টোক। আমার কথায় মন না গললেও হয়তো স্মিথ-ওল্ডউইক ও তরুণীটির। কথা তুমি রাখবে। তারা আমাকে বার বার তোমাকে সভ্যজগতে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে বলে গেছে।
টারজান বলল, না, আমি আমার পথেই যাব। মিস্ কিরচার ও লেফটেন্যান্ট স্মিথ-ওল্ডউইক আমার প্রতি কৃতজ্ঞতাবশতই আমার ভালর জন্যে ওকথা বলেছে।
মিস কিরচার? ক্যাপেলের বিস্মিত প্রশ্ন। পরক্ষণেই হেসে ওঠে সে বলল, তাহলে তুমি তাকে জার্মান গুপ্তচর বার্থা কিরচার বলেই জান?
টারজান এক মুহূর্ত নীরবে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, হ্যাঁ, আমি জানি সে বার্থা কিরচার একজন জার্মান গুপ্তচর।
বাস্- শুধু এইটুকুই জান? ক্যাপেলের প্রশ্ন।
হা-এইটুকুই, টারজনের উত্তর।
তিনি হচ্ছেন মাননীয়া প্যাট্রিসিয়া ক্যানবি; পূর্ব আফ্রিকা বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত ব্রিটিশ গোয়েন্দা বিভাগের একজন মূল্যবান কর্মী। ওর বাবা ও আমি ভারতবর্ষে একসঙ্গে কাজ করেছি। জন্মের পর থেকেই ওকে। আমি চিনি। আরে! এই তো দেখ এক বান্ডিল কাগজপত্র যা সে জনৈক জার্মান অফিসারের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছিল আর অনেক বিপর্যয়ের মধ্যেও হাতছাড়া করেনি-এমনি অবিচল তার কর্তব্যবোধ। এগুলো ভাল করে দেখার মত সময় এখনও পাইনি, কিন্তু এর মধ্যে আছে একখানা সামরিক মানচিত্র, এক বান্ডিল প্রতিবেদন, আর কে এক হাউটম্যান ফ্রিজ স্নাইডারের দিনপঞ্জি।
চাপা গলায় টারজান বলল, হাউটম্যান ফ্রিজ স্নাইডারের দিনপঞ্জি। একবার ওটা দেখতে পারি ক্যাপেল? সেই তো লেডি গ্রেস্টোককে খুন করেছে।
ক্যাপেল বিনা বাক্য ব্যয়ে একটা ছোট বই টারজনের হাতে দিল। খুব দ্রুত পাতা উল্টে টারজান একটা বিশেষ তারিখ খুঁজতে লাগল- যে তারিখে ঘটেছিল একটি ভয়ঙ্কর ঘটনা। সেই তারিখটা পেয়েই পড়তে শুরু করে দিল। হঠাৎ অবিশ্বাসের একটা অস্ফুট শব্দ বেরিয়ে এল তার ঠোঁট থেকে। ক্যাপেল জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল।
টারজান বলে উঠল, ঈশ্বর! এ কি সত্যি? শোন। ঠাসাঠাসি লেখা একটা পাতা থেকে সে পড়তে লাগলঃ
ইংরেজ শুয়োরটার সঙ্গে একটু মস্করা করা গেল। বাড়ি ফিরে স্ত্রীর শোবার ঘরে তার অগ্নিদগ্ধ দেহটাই। সে দেখতে পাবে-কিন্তু তাকে সে স্ত্রী বলেই ভুল করবে। আসলে একটা নিগ্রো রমণীর মৃতদেহকে পুড়িয়ে। ভন গস তার আঙুলে পরিয়ে দিয়েছিল লেডি গ্রেস্টোকের আংটি-জার্মান হাই কমান্ডের কাছে মৃত অপেক্ষা জীবিত লেডি জি-র মূল্য অনেক বেশি।
সে বেঁচে আছে? টারজান চীৎকার করে বলল।
ক্যাপেল বলল, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ। এখন তুমি কি করবে?
অবশ্যই তোমার সঙ্গে ফিরে যাব। মিস্ ক্যাবির প্রতি কী অবিচারই না করেছি। কিন্তু আমি জানব কেমন করে? স্মিথ-ওল্ডউইক তাকে ভালবাসে। তাকেও তো আমি বলেছি যে সে একটি জার্মান গুপ্তচর। স্ত্রীর খোঁজে আমাকে তো ফিরে যেতেই হবে। মিস্ ক্যাবির প্রতি এই অবিচারের প্রতিকারও আমাকে করতেই হবে।
ক্যাপেল বলল, ও নিয়ে মাথা ঘামিও না। মিস্ ক্যান্বি নিশ্চয়ই তার প্রেমিককে বোঝাতে পেরেছে যে সে শত্রুর গুপ্তচর নয়, কারণ আজ সকালে আকাশে উড়বার আগে স্মিথ-ওল্ডউইক আমাকে বলে গেছে, মেয়েটি তাকে বিয়ে করবে বলে কথা দিয়েছে।
ধরিত্রীর গর্ভে টারজান (টারজান অ্যাঁট দি আর্থস কোর)
যে কোন স্কুলের ছেলেও জানে, পেলুসিডার পৃথিবীর ভিতরে আর একটা পৃথিবী; যে ফাঁকা গোলককে আমরা ধরিত্রী বলি তার আভ্যন্তরীণ তলেই এর অবস্থান।
ডেভিড ইনেস এবং এনার পেরি যখন নিধূম কয়লার নতুন স্তর আবিষ্কারের আশায় যন্ত্র-যানে চেপে একটা পরীক্ষামূলক অভিযাত্রায় বেরিয়েছিল তখনই ঘটনাক্রমে তারা এই পেলুসিডার আবিষ্কার করে। কিন্তু যন্ত্র-যানটা ভূ-গর্ভের দিকে চলতে শুরু করার পরে তার মুখটাকে যথাসময়ে ঘুরিয়ে দিতে না পারায় পাঁচ শ’ মাইল সোজা এগিয়ে তৃতীয় দিনে যন্ত্র-যানের মুখটা যখন ভিতরকার জগতের খোলসটাকে ভেঙ্গে বেরিয়ে গেল তখন এক ঝলক তাজা বাতাসে কেবিনটা ভরে গেল, যদিও অক্সিজেনের অভাবে পেরি ততক্ষণে অজ্ঞান হয়ে গেছে আর ডেভিডও দ্রুত জ্ঞান হারাতে বসেছে।
তারপর অনেক বছর কেটে গেল। দুই আবিষ্কারের জীবনে অনেক ঝড় বয়ে গেল। পেরি আর কোন দিনই ভূ-পৃষ্ঠে ফিরে আসেনি, আর ইনেস এসেছে মাত্র একবার। অবশ্য সেই একই যন্ত্র-যানে সে ফিরে গিয়েছিল পৃথিবী থেকে।
কিন্তু কিছুটা আদিম অধিবাসীদের সঙ্গে যুদ্ধ বিগ্রহের ফলে, আর বেশ কিছুটা আদিম জীবজন্তু ও সরীসৃপের সঙ্গে সংঘর্ষের ফলে সভ্যতার পথে পেলুসিডার সাম্রাজ্যের অগ্রগতি খুব সামান্যই হয়েছে। তাছাড়া, এতদিন পরে ডেভিড ইনেস এবং এবৃনার পেরির অস্তিত্বের কোন হদিসই হয় তো আজ আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।
