কিন্তু এক্সুজার লোকরা? বার্থা প্রশ্ন করল, তারা কি আমাদের তাড়া করে এখানে আসতে পারে না?
টারজান বলল, তা আসতে পারে। সে যখন আসে তখন দেখা যাবে।
প্রায় ঘন্টাখানেক বিশ্রামের পরে টারজান হঠাৎ উঠে বসল। ইশারায় সকলকে চুপ করতে বলে কান পাতল।
বার্থা বলল, কি হল?
ওরা আসছে। এখনও অনেক দূরে আছে। কিন্তু তাদের স্যান্ডেল-পরা পায়ের শব্দ ও সিংহের চলার শব্দ আমার কানে আসছে।
স্মিথ-ওল্ডউইক বলল, আমরা কি করব? আরও এগোব? মনে হচ্ছে এবার আমি কিছুক্ষণ হাঁটতে পারব।
বার্থা বলল, আমিও পারব।
টারজান বুঝল এরা কেউই সত্যি কথা বলছে না। এত তাড়াতাড়ি এত বেশি ক্লান্তি কাটতে পারে না।
তবু বলল, ওটোবু, তুমি লেফটেন্যান্টকে ধর। আমি মিস কিরচারের ভার নিলাম।
তার আপত্তি সত্ত্বেও টারজান মেয়েটিকে বগলদাবা করে হাঁটতে শুরু করল। পিছনে চলল ওটোবু ও ইংরেজ যুবক।
সামনেই বালির পথ থেকে কয়েক ফুট উঁচুতে একটা পাথরের চাঙর ভেঙে পড়ে গুহার মত সৃষ্টি হয়েছে। তার ভিতর দিয়ে একটা সংকীর্ণ সুড়ঙ্গ চলে গেছে পিছনের পাহাড় পর্যন্ত। গুহাটার দু’দিক খোলা হলেও ওরা সকলে একসঙ্গে আক্রমণ করতে পারবে না।
সকলে সেখানে উঠে দেখল গুহাটা দু’ফুট চওড়া আর দশ ফুট লম্বা। তাড়াতাড়ি সকলে সেখানে লুকিয়ে পড়ল।
টারজান পিস্তলসহ স্মিথ-ওল্ডউইককে রাখল গুহার উত্তর মুখে। ওটোবুকে বলল বর্শা হাতে তার পাশে দাঁড়াতে। নিজের দক্ষিণ মুখের দায়িত্ব। দু’য়ের মাঝখানে মেয়েটিকে শুইয়ে দিয়ে বলল, ওরা বর্শা ছুঁড়লেও এখানে তুমি নিরাপদে থাকবে।
মিনিটের পর মিনিট কাটতে লাগল। বার্থা কিচারের মনে হল, এ প্রতীক্ষা বুঝি অনন্তকালের।
প্রথম আক্রমণে এক্সজার লোকরা সুবিধা করতে পারল না। স্মিথ-ওল্ডউইকের গুলির মুখে তারা পিছু হটল। কিন্তু একটু পরেই তারা আবার এল। এবার আধা ডজন মানুষ আর আধা ডজন সিংহ।
মেয়েটি বলল, এই কি আমাদের শেষ?
না, টারজান চীৎকার করে বলল, এখনও আমরা বেঁচে আছি!
আক্রমণকারীরা এবার দু’দিক থেকে বর্শা ছুঁড়তে লাগল। মেয়েটিকে আড়াল করতে গিয়ে একটা বর্শা সজোরে এসে বিধল টারজনের কাঁধে। তার প্রচণ্ড ধাক্কায় সে সপাটে মাটিতে পড়ে গেল। স্মিথ ওল্ডউইক দু’বার গুলি ছুঁড়ল; কিন্তু একটা বর্শা এসে বিধল তার উরুতে। সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। হাতের পিস্তলটা খসে পড়ল। শত্রুর মোকাবিলা করতে রইল শুধু ওটোবু।
টারজান ওঠার চেষ্টা করতেই একটি সৈনিক ঝাঁপিয়ে পড়ল তার বুকের উপর। তার হাতের খোলা তলোয়ার ঝিলিক দিয়ে উঠল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে বার্তা কিরচার পিস্তলটা তুলে নিয়ে শয়তানটার বুক লক্ষ্য করে ঘোড়া টিপল।
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আক্রমণকারী ও আক্রান্ত উভয় দলের কানেই ভেসে এল গুলির শব্দ-গিরিখাতের দিক থেকে। আকাশ থেকে বুঝি ভেসে এল দেবদূতের মধুর কণ্ঠস্বর- শ্বেতাঙ্গদের কানে বাজল একজন নন- কমিশন্ড ইংরেজ-অফিসারের হুকুমের চীৎকার।
টারজান অতি কষ্টে উঠে দাঁড়াল। বর্শাটা তখনও তার কাঁধে বিঁধে রয়েছে। এক টানে সেটাকে খুলে ফেলে টারজান বাইরে এসে দাঁড়াল। পিছনে বার্থা কিরচার।
গিরিখাতের ভিতরে যে খণ্ড-যুদ্ধ বেঁধেছিল তা শেষ হয়েছে। এক্সজার সৈনিকরা সবাই মারা পড়েছে। টারজান ও বার্থাকে ভাল করে দেখে নিয়ে একটি ব্রিটিশ টমি হাতের রাইফেলটা তাক করল টারজনের দিকে। চোখের পলকে বার্থা বুঝে নিল, টারজরেন গায়ের পীতবসনই এই বিভ্রান্তির কারণ। এক লাফে দু’জনের মাঝখানে পৌঁছে সে হাত তুলে চীৎকার করে বলল, গুলি করো না; আমরা দু’জনই বন্ধু।
টমি তখন টারজানকে হুকুম করল, তাহলে হাত তুলে দাঁড়াও। হলুদ তমাধারীদের বিশ্বাস নেই।
এই সময় টমি দলের অধিনায়ক ব্রিটিশ সার্জেন্টটি সেখানে হাজির হল। টারজান ও বার্থা ইংরেজিতে তাকে বুঝিয়ে বলল তাদের ছদ্মবেশের কারণ ও অন্য সব বিবরণ। সার্জেন্ট সহজেই তাদের কথা বিশ্বাস করল। স্মিথ-ওল্ডউইক ও টারজনের ক্ষতস্থান বেঁধে দেয়া হল। আধ ঘণ্টার মধ্যেই সকলে যাত্রা করল উদ্ধারকারী দলের শিবিরের দিকে।
রাতে স্থির হল, পরদিন স্মিথ-ওল্ডউইক ও বার্থা কিরচারকে বিমানযোগে পাঠানো হবে উপকূলবর্তী ব্রিটিশ হেডকোয়ার্টারে। সেজন্য দুটো বিমানের ব্যবস্থাও করা হল। ব্রিটিশ ক্যাপ্টেন প্রস্তাব করল, ফিরতি-যাত্রায় তার বাহিনীর সঙ্গে স্থলপথেই যাবে টারজান ও ওটোবু। কিন্তু টারজান আপত্তি জানিয়ে বলল, তার ও ওটোবুর দেশ পশ্চিম দিকে; কাজেই তারা দুজন একসঙ্গে সেইদিকেই যাবে।
বার্থা বলল, তাহলে তুমি আমাদের সঙ্গে যাচ্ছ না?
না। আমার বাড়ি পশ্চিম উপকূলে। আমি সেখানেই যাব।
মিনতি-ভরা চোখ তুলে মেয়েটি বলল, সেই ভয়ঙ্কর জঙ্গলেই ফিরে যাবে? আর কোনদিন তোমার দেখা পাব না?
নীরবে তার দিকে তাকিয়ে থেকে টারজান বলল, কোন দিন না। আর একটি কথাও না বলে সেখান থেকে চলে গেল।
সকালে কর্নেল ক্যাপেল বেস-ক্যাম্প থেকে বিমানযোগে এসে নামল। টারজান একটু দূরেই দাঁড়িয়েছিল। সে দেখল, হাসিমুখে দুই হাত বাড়িয়ে কর্নেল বার্থা কিচারের দিকে এগিয়ে গেল। টারজান তো অবাক। একটি জার্মান গুপ্তচরের সঙ্গে এত মাখামাখি কেন? দূর থেকে তাদের কথাবার্তা কানে না। এলেও বুঝতে পারল, দু’জনের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব।
